ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

অপ্রতিরোধ্য বেজাল কারবারিরা

বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫:০০, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অপ্রতিরোধ্য বেজাল কারবারিরা
খাদ্যপণ্যে ভেজালের উপস্থিতি

দেশের বাজারে ফলমূল, শাকসবজি, মাছ-মাংস, দুধ, তেল, মসলা ও শিশুখাদ্যসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যে ভেজালের উপস্থিতি এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতু মিশিয়ে অতিমুনাফার কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকার সম্প্রতি নতুন আইন জারি করে খাদ্য ব্যবসায় সনদ বাধ্যতামূলক করেছে। সনদ ছাড়া কেউ খাদ্য উৎপাদন বা বিক্রি করতে পারবেন না। তবুও মাঠপর্যায়ে এই আইনের প্রয়োগ ধীর হওয়ায় বেজাল কারবারিরা এখনো অপ্রতিরোধ্য। ডেইলি বাংলাদেশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব তথ্য।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ মোট ১ হাজার ৭৫৬টি খাদ্যনমুনা পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৫৮৬টি নমুনায় অর্থাৎ ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ খাবারে ভেজাল বা দূষণ ধরা পড়েছে। সরাসরি ভেজাল উপাদান শনাক্ত হয়েছে ১১২টি নমুনায়। আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের রস, শিশুদের জুস, চানাচুর, মরিচ-হলুদের গুঁড়া, ঘি, পাউডার দুধ, সরিষার তেল, মাখন, সয়াবিন তেল, ডালডা ও মধুসহ নানা পণ্যে পটাশিয়াম অ্যালুমিনিয়াম সালফেট, সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট ও সারফেস অ্যাকটিভের মতো নিষিদ্ধ রাসায়নিক পাওয়া গেছে। এসব উপাদান মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং আন্তর্জাতিকভাবে খাদ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

Advertisement

চিপস ও ভাজা খাবারে সবচেয়ে বেশি বিপদ দেখা গেছে। পরীক্ষিত চিপসের ৬৫ শতাংশ নমুনায় অ্যাক্রিলামাইড পাওয়া গেছে। এটি ভাজা বা পোড়ানোর সময় তৈরি হওয়া একটি ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. নাজরিনা খাতুন বলেন, “অ্যাক্রিলামাইড দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। শিশুরা বেশি চিপস ও ভাজা খাবার খায় বলে তাদের শরীরে এর প্রভাব আরও গুরুতর। আমরা দেখছি তরুণ বয়সেও ক্যানসারের রোগী বাড়ছে। নতুন আইন বাস্তবায়ন না হলে এই প্রবণতা কমবে না। সরকারকে দ্রুত সনদ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে এবং নিয়মিত পরীক্ষা বাড়াতে হবে।”

ফল ও শাকসবজিতেও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ৩৫ শতাংশ ফলে এবং ৫০ শতাংশ শাকসবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ ধরা পড়েছে। অনেক ফল চকচকে দেখানোর জন্য নিষিদ্ধ রং ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। কাওরান বাজারের ক্রেতা রোকেয়া বেগম বলেন, “প্রতিদিন বাজার করি। আপেল, আম, টমেটো সব চকচকে দেখায়। কিন্তু বাসায় এনে ধুলে রং উঠে যায়। শিশুদের জুস কিনলেও ভয় হয়। এখন আর বিশ্বাস থাকে না কোনটা খাওয়া যায়। সরকার সনদ বাধ্যতামূলক করেছে শুনেছি, কিন্তু বাজারে তো কোনো পরিবর্তন দেখি না। ক্রেতা হিসেবে আমরা অসহায়।”

মসলায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি আরও ভয়ংকর। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসাসহ ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সিসা শনাক্ত হয়েছে। মসলা বিক্রেতা নুরুল ইসলাম বলেন, “হলুদ-মরিচে রং মেশানোর অভিযোগ আসে। কিন্তু ক্রেতারা চকচকে পণ্য চায়। আমরা যদি না দিই, ব্যবসা মরে যায়। সরকার যদি কঠোর হয় এবং সনদ ব্যবস্থা সঠিকভাবে চালু করে, তাহলে সবাই মানবে। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য সনদ নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা উচিত।”

চালেও বিপদের ঘণ্টা বেজেছে। ১৩টি নমুনায় অতিরিক্ত আর্সেনিক এবং পাঁচটিতে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। মাছ ও মুরগিতে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক মো. কামরুল ইসলাম বলেন, “বাইরের খাবারে রং, প্রিজারভেটিভ, ফরমালিন ও অতিরিক্ত তেল মেশানো হয়। এসব উপাদান কিডনি ও যকৃতের ক্ষতি করে। দীর্ঘমেয়াদে দুরারোগ্য রোগ সৃষ্টি হয়। আমরা হাসপাতালে প্রতিদিন এমন রোগী দেখছি যাদের কিডনি বিকল হয়ে যাচ্ছে। মানুষকে বাড়িতে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে। নতুন আইন বাস্তবায়িত হলে অন্তত বাজারের খাবার কিছুটা নিরাপদ হবে।”

দুধ, ঘি, তেল ও আচারে পটাশিয়াম অ্যালুমিনিয়াম সালফেটসহ নিষিদ্ধ রাসায়নিক শনাক্ত হয়েছে। পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. ফারহানা আক্তার বলেন, “মায়েরা অজান্তেই শিশুদের ভেজালযুক্ত জুস, চিপস ও পাউডার দুধ খাওয়াচ্ছেন। এতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। সনদ বাধ্যতামূলক হওয়ায় অভিভাবকরা নিরাপদ পণ্য চিনতে পারবেন। সরকারকে সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। পাশাপাশি ভোক্তা সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে।”

এসব ক্ষতিকর উপাদান মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে ধীরে ধীরে বিকল করে দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস, হেপাটাইটিস, যকৃত ও ফুসফুসের রোগ বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতি বছর দেশে প্রায় তিন লাখ মানুষ ক্যানসারে, দুই লাখ কিডনি রোগে এবং দেড় লাখ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন। গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ—বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম বাড়ছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, “বেজাল কারবারিরা এখনো অপ্রতিরোধ্য। সরকার নতুন আইন করেছে—খাদ্য ব্যবসা করতে হলে সনদ বাধ্যতামূলক। সনদ ছাড়া কেউ ব্যবসা করতে পারবে না। যারা অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কোনো ছাড় নেই। আমরা মাঠপর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করছি এবং জনবল সংকট দূর করতে পদক্ষেপ নিচ্ছি।”

স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ জানান, “নতুন আইনে সনদ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এখন থেকে উৎপাদন ও বিক্রির পুরো চেইন নজরদারির আওতায় আসবে। বিএফএসএ ও বিএসটিআই-কে শক্তিশালী করা হচ্ছে। জনবল সংকট দূর করতে নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। জেলা পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে যাতে বেজাল কারবারিরা আর সহজে পার না পায়।”

বাজার মনিটরিং কমিটির আহ্বায়ক মো. শফিকুল আলম বলেন, “আমরা নিয়মিত বাজার পরিদর্শন করি। অনেক দোকানে সনদ নেই। নতুন আইন অনুযায়ী সনদ না থাকলে সিলগালা করার ক্ষমতা আমাদের আছে। তবে জনবল কম থাকায় সব জায়গায় পৌঁছানো যায় না। ব্যবসায়ীদের সচেতন করতে হবে এবং সনদ নেওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে হবে।”

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম (অতিরিক্ত সচিব) বলেন, “প্রতিদিন ভেজাল খাদ্য নিয়ে অভিযোগ আসছে। নতুন আইনে সনদ বাধ্যতামূলক হওয়ায় ভোক্তাদের অভিযোগের ভিত্তি শক্তিশালী হয়েছে। সনদ না থাকলে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আমরা গণশুনানি ও অভিযান অব্যাহত রাখব যাতে ভোক্তারা সুরক্ষা পায়।”

বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ শফিকুল ইসলাম (অতিরিক্ত সচিব) বলেন, “আমরা নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা অব্যাহত রেখেছি। কিন্তু জনবল সংকট বড় বাধা। প্রতি জেলায় মাত্র কয়েকজন কর্মী দিয়ে পুরো কার্যক্রম চালাতে হয়। নতুন আইনের আওতায় সনদ প্রদান শুরু হয়েছে। সনদ না থাকলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমরা চাই ব্যবসায়ীরা স্বেচ্ছায় সনদ নিন এবং মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করুন।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতি বছর লাখো মানুষ ক্যানসার, কিডনি ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন। গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম বাড়ছে। বেজাল কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। সরকারকে দ্রুত সনদ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে এবং নিয়মিত তদারকি বাড়াতে হবে।”

অনুসন্ধানে জানা যায়, অসাধু ব্যবসায়ীরা উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে অতিমুনাফা করছেন। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকির অভাবে ভেজালের পরিধি বাড়ছে। নতুন আইনে সনদ বাধ্যতামূলক করা হলেও এখনো অনেক ব্যবসায়ী সনদ ছাড়াই কারবার চালাচ্ছেন। সনদ না থাকলে দোকান বা কারখানা সিলগালা করা ছাড়াও কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন করেই হবে না। জনবল সংকট দূর করতে হবে, নিজস্ব ল্যাব স্থাপন করতে হবে এবং জেলা পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। বাজার থেকে কেনা খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে এবং বাড়িতে তৈরি খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে।

বেজাল কারবারিরা এখনো অপ্রতিরোধ্য। নতুন আইনের সফল বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে কোটি মানুষের স্বাস্থ্য। সরকার যদি কঠোরভাবে সনদ ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারে এবং মনিটরিং জোরদার করে, তাহলে এই অন্ধকার থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি মিলবে।
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস/এমএ
স্পটলাইট জনপ্রিয় খবর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!