ঢাকা,  বুধবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

প্রাথমিকে ৩৬ হাজার প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য

বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪:১৮, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রাথমিকে ৩৬ হাজার প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্যের সংখ্যা এখন ৩৬ হাজার ২৩৫টিতে পৌঁছেছে। ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক নেই। আর সহকারী শিক্ষক পদেও প্রায় ২০ হাজার শূন্যতা রয়েছে। মোট ৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৩১টি শিক্ষক পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র ৩ লাখ ৭৩ হাজার ১৩৬ জন। শূন্য পদের হার প্রায় ১৩ শতাংশ। গত এক বছরেই প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ বেড়েছে আরও দুই হাজার ১২৯টি। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, বগুড়ায় ৮০৯টি, খুলনায় ৬০৫টি, গাজীপুরে ২৯৩টি, নারায়ণগঞ্জে ৩৪৩টি, ফরিদপুরে ৫১৫টি, রাজবাড়ীতে ২৭৯টি, বান্দরবানে ১৭৪টি, রাজশাহীতে ৫৮৯টি এবং রংপুরে ৬৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। বরিশাল বিভাগেই ৬ হাজার ২৪৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৫৯৯টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সহকারী শিক্ষকেরও তিন হাজারের বেশি পদ ফাঁকা। দেশের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই একই চিত্র বিরাজ করছে। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককেই একাধিক শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে। কোথাও ভবন আছে কিন্তু শিক্ষক নেই, আবার কোথাও শিক্ষক থাকলেও শিক্ষার্থী সংখ্যা অত্যন্ত কম। এ অবস্থায় স্বাভাবিক শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

Advertisement

অনেক বিদ্যালয়ে বছরের পর বছর বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় না। বৃত্তি বরাদ্দের ৮০ শতাংশ কোটা সরকারি স্কুলের জন্য থাকলেও অনেক স্কুল থেকে কেউ বৃত্তি পায় না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারে। প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত প্রধান শিক্ষক পদ ৬৫ হাজার ৫০২টি এবং সহকারী শিক্ষক পদ ৩ লাখ ৬৪ হাজার ২৯টি। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের অভাবে সহকারী শিক্ষকদেরই ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে তাদের নিজস্ব পাঠদানের মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একজন শিক্ষক একই সময়ে দুই বা তিনটি শ্রেণির দায়িত্ব পালন করলে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে পাঠের গুণগত মান কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক স্তরই শিক্ষার মূল ভিত্তি। এখানে দুর্বলতা থাকলে পরবর্তী স্তরে তার প্রভাব অনেক গভীর হয়।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এ বিষয়ে বলেন, প্রায় সাড়ে ৩৪ হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় সাড়ে ৩২ হাজার পদ আটকে ছিল। সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতিও দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। গত জুলাইয়ে আইনি জটিলতা দূর হয়েছে। এখন শূন্যপদ পূরণে দ্রুত নিয়োগের জন্য সরকারি কর্ম কমিশনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আশা করছি আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে অগ্রগতি হবে। সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির পর দ্রুত সেই শূন্যপদগুলোও পূরণ করা হবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়) মো. লাল হোসেন জানান, সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য মাঠপর্যায়ে গ্রেডেশন তালিকা তৈরির কাজ চলছে। প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ পিএসসির মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হবে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধু বয়স নয়, অভিজ্ঞতাসহ একাধিক বিষয় বিবেচনা করা হবে। এখন থেকে নিয়মিতভাবে শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অতিরিক্ত সচিব শাহীনা ফেরদৌসী এ প্রসঙ্গে বলেন, ইতোমধ্যে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে। তারা শিগগিরই যোগদান করবেন। নতুন শিক্ষকদের পদায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের বদলি স্থগিত রাখা হয়েছে। পদায়ন সম্পন্ন হলে বদলি কার্যক্রম আবার চালু করা হবে। পদোন্নতির পর সহকারী শিক্ষকের শূন্যতা পূরণেও দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই প্রতিটি বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত হোক যাতে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

শিক্ষাবিদ ও প্রাথমিক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. নাজমা আক্তার বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক আকৃষ্ট করতে হলে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা আকর্ষণীয় করতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা না থাকলে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ে না। বর্তমান সংকট শুধু পদ শূন্যতার সমস্যা নয়, এটি ব্যবস্থাপনা ও তদারকির দুর্বলতারও ফল। অনেক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণি সামলাতে হচ্ছে—এটা অন্যায়।

অন্য এক শিক্ষা বিশ্লেষক মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, শূন্য পদের কারণে অনেক স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় না। এতে শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বৃত্তি না পাওয়া স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়ে। সরকারকে দ্রুত পদোন্নতি ও নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মনিটরিং জোরদার করতে হবে। 

শিক্ষা গবেষক ড. ফারহানা ইয়াসমিন যোগ করেন, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক সংকট দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অযোগ্য বা অপর্যাপ্ত শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চললে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা যায় না। সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে ঝরে পড়ার হার বাড়ছে—এটা উদ্বেগের বিষয়। মেধাবীদের প্রাথমিক শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা এবং ক্যারিয়ার প্রগ্রেশন সুস্পষ্ট করতে হবে। 

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু নিয়োগ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নিয়োগের পর প্রশিক্ষণ, তদারকি এবং শিক্ষকদের কাজের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় শিক্ষক থাকলেও কার্যক্রম পুরোপুরি চালানো যায় না। কোথাও শিক্ষার্থী সংখ্যা কম থাকায় শিক্ষক নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এসব বিষয় বিবেচনা করে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রাথমিক শিক্ষা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। এই ভিত্তি যদি দুর্বল থাকে, তাহলে উপরের স্তরগুলোতেও তার প্রভাব পড়বে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। শূন্য পদের অন্ধকার দূর না হলে প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে—এটাই সময়ের দাবি।
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস/এসআই
স্পটলাইট জনপ্রিয় খবর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!