দেশের সবচেয়ে ভাল পিঁয়াজ জন্মে পাবনায়। জেলার সুজানগর ও সাঁথিয়া উপজেলায় তুলনামূলক সবচেয়ে বেশি পিঁয়াজ উৎপাদিত হয়। পিঁয়াজের মাঠ দুটি উপজেলাকে এক করে একটি গ্রামে পরিণত করে। এখন পিঁয়াজের মৌসুমে এ দুটি উপজেলা শুধুই একটি পিঁয়াজের গ্রাম বা পিঁয়াজ পল্লীতে পরিণত হয়েছে। এ অঞ্চলের পিঁয়াজ সারা দেশে বিক্রি হয়।
গাজনা পাড়ের পিঁয়াজ
.png)
দেশের অন্যতম বৃহত্তম একটি বিল গাজনা। সুজানগর উপজেলার আত্রাই ও পদ্মা নদীর সংযোগে সৃষ্ট বিল গাজনার (গ-হস্তী বলেও পরিচিত) আয়তন প্রায় ছয় বর্গমাইল। বর্ষা শেষে কার্যত: এই বিশাল বিলপাড়টি পিঁয়াজ চাষে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে এক সময় পিছিয়ে থাকা এ অভাবী জনপদে এখন সমৃদ্ধির ছোঁয়া লেগেছে। বিল গাজনা সন্নিহিত বামন্দি, দুলাই, চরদুলাই, পাইকপাড়া, শান্তিপুর, মধুপুর, খয়রান, মথুরাপুর, বগাজানি, রাইশিমুল, উলাট, বনকোলা, দূর্গাপুর প্রভৃতি গ্রামের চাষিরা শুধু এই এক ফসল চাষেই সংসারের চেহারা পাল্টে ফেলেছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব মতে দেশের এক-তৃতীয়াংশ পিয়াজ আবাদ হয় পাবনা জেলায়। তার মধ্যে এ বিলাঞ্চলই হচ্ছে সবচেয়ে বড় পিঁয়াজের মাঠ।
বামন্দি দেশের বৃহত্তম পিঁয়াজের মাঠ
সুজানগর উপজেলার নিভৃত পল্লী বামন্দি। এ গ্রামটি বিশাল বর্ষায় ডোবে। বর্ষা শেষে এর মাটি জেগে ওঠে এক বিশাল পাললিক স্তর নিয়ে। যে মাটিতে ফলে সোনালী ফসল, সোনার ডিম খ্যাত ‘গোল্ডেন বল’ পিঁয়াজ। বামন্দি গ্রামের হাজার বিঘার দুটি মাঠের এতটুকু অংশ ফাঁকা নেই যেখানে পিঁয়াজের চাষ হয় না। চাষির বাড়ি থেকে মাঠের গহীন ভিতর পর্যন্ত পিঁয়াজের ক্ষেত দেখে মনে হয় যেন আদিগন্ত পিঁয়াজেরই মাঠ। রূপসীর বিল, গ্যারকার বিল, ঘুঘুদহ বিল, গাঙভাঙা বিল, জিয়লগাড়ির বিল, সোনাপাতিল বিল পাড়সহ সাঁথিয়া সুজানগর এলাকায় মাঠের পর মাঠ পাড়ি দিলে এখন শুধু পিঁয়াজ আর পিঁয়াজ।
ফলন ও মুনাফা
মুড়ি পিঁয়াজ বিঘা প্রতি ৪০-৬০ মন, চারার পিঁয়াজ বিঘা প্রতি ৪০-৮০ মন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। মুড়ি পিঁয়াজ, চারার পিঁয়াজ এর মাস দুয়েক আগে বিক্রি করে চাষি অসময়ে কিছু টাকা পায়।
বদলে যাচ্ছে বহু গ্রাম
পিঁয়াজ চাষে পাবনায় শতাধিক গ্রামের হাজার- হাজার পরিবার স্বনির্ভর, সচ্ছল ও অর্থ বিত্তের মালিক হয়েছে। গড়ে উঠছে উন্নত জনপদ। যাপিত জীবনে আসছে গুণগত পরিবর্তন।
দিন মজুর থেকে লাখপতি
সুজানগরের বামন্দি গ্রামের জামাল উদ্দিন এই পাঁচ বছর আগেও ছিল ভ্যান চালক, নিঃস্ব ভূমিহীন। এখন সংসারে তার সচ্ছলতা, দু’লাখ টাকা দামের দু’বিঘা জমির মালিক। পিঁয়াজের চাষে তার সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। শুধু জামাল উদ্দিন নয়, ঐ গ্রামের রায়হান খাঁ, মতি বিশ্বাস, বজলু শেখ, মতলেব শেখ, দায়েন মোল্লা, হান্নান মোল্লা আজ সচ্ছল।
পিঁয়াজ উৎসব
দেশের এ বিশাল পিঁয়াজ পল্লীতে পিঁয়াজ উৎসব বছরের ছয়-সাত মাস পর্যন্ত চলে।বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর কার্তিক অগ্রহায়ণ মাসে মুড়ি (রেটুন) পিঁয়াজ লাগানো থেকে শুরু করে ক্ষেতের চারা পিঁয়াজ উত্তোলনের সময় বৈশাখ পর্যন্ত গ্রামগুলি ভিন্ন এক আমেজে ভরপুর থাকে। এসব গ্রামে এত শ্রমিক না থাকায় দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে শ্রমিক নিয়ে আসা হয় কিম্বা শ্রমিকেরা আসে।
পিঁয়াজ কেটে স্বাবলম্বী
পিঁয়াজ চাষাবাদ করে বহু প্রান্তিক চাষি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এটা হতে পারে। তবে পিঁয়াজ মৌসুমে শুধু পিঁয়াজ কেটে কেটে স্বাবলম্বী অর্জন করার কথা শুনতে একটু অবাক লাগে বৈকি! প্রতিমন ২৫ টাকা পিঁয়াজ কেটে কেটে জমানো টাকা দিয়ে অনেকে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছে। তারা প্রতি মৌসুমে অন্ততঃ ২০-২৫ হাজার টাকা পান পিঁয়াজ কেটে। এছাড়া যে পিঁয়াজ পাওয়া যায় তাতে সারা বছরের খাওয়ার পিঁয়াজ হয়ে যায়।
কুঁড়ে ঘরেও শত মন পিঁয়াজ মজুদ
গ্রামের মানুষ পিঁয়াজের প্রতি এমনভাবে ঝুঁকেছে যে, একটি প্রান্তিক চাষির কুঁড়ে ঘরেও শত মন পিঁয়াজ ষ্টক করা থাকে। যে ঘরে এই এক যুগ আগেও হা-অন্ন হা-ভাত ছিল এখন সে সব ঘরে সমৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। পিঁয়াজ মৌসুমে গেলে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষ এর বাড়ির চেহারা
পিঁয়াজের বৃহত্তম হাট
দেশের বৃহত্তম পিঁয়াজ পল্লীর পিঁয়াজ রাজধানীসহ সারাদেশে যায়। পিঁয়াজ বিকিকিনির বৃহত্তম হাট সাঁথিয়ার বনগ্রামে। সারা বছরই কেনাবেচা হয়। মৌসুমে প্রতিদিন ১০,০০০-১২,০০০ মন কেনাবেচা হয়।
বাংলাদেশ ফামার্স এসোসিয়েশন (বিএফএ) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও চাষি আলহাজ্ব শাহজাহান আলী বাদশা জানান, দেশের চাহিদাও পূরণ করতে হবে, কৃষকের স্বার্থও দেখতে হবে। কৃষকের লোকসান করে চাহিদা পূরণের নীতি সুষ্ঠু কোনো নীতি হতে পারে না। বিষয়টি সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভেবে দেখা দরকার।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পাবনার উপ- পরিচালক বিভুতিভূষণ সরকার জানান, লাভজনক হওয়ায় এ অঞ্চলের চাষিরা পিঁয়াজ আবাদে ব্যাপকভাবে ঝুঁকেছে। কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের সহেযাগিতা করা হচ্ছে।
ডেইলি বাংলাদেশ/আজ/আরআর