৩ বছর বিদেশ বিভুয়ে আসল টাকা খুইয়ে পথ না পেয়ে দেশে ফেরেন তিনি। এরইমধ্যে বাবাকেও হারান আবুল।
দেশে ফিরে প্রবাসী কালাম হলেন বেকার। একেতো মানুষের ঋণ, অন্যদিকে অভাব-অনটনের সংসারে দেখা দিল অশান্তি। নগদ টাকাও নেই যে, কিছু করবে। চোখে মুখে যখন সর্ষের ফুল, ঠিক তখন বুদ্ধি আর জেদ চাপে-বসে বসে আর, নয় চাকরির সন্ধান। কৃষিতেই গড়বো নিজের ভবিষ্যত। এমন পণ করার পর, হোচট খেল নেই তো জমি। উপায় কি? দমবার পাত্র নন, আবুল কালাম। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ১ নম্বর কাশিনগর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হিলাল নগর গ্রামের মৃত সোনা মিয়ার ছেলে আবুল কালাম (৩২)।
.png)
মহাজনদের কাছ থেকে জমি বর্গা নিয়ে শুরু করল বেগুন চাষ। ব্যাস, আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আবুলের। কয়েক বছরের মধ্যেই বেগুন চাষে ভাগ্য ফিরল কালামের। হয়ে উঠল স্বাবলম্বী। এমনই এক অনুপম গল্পের কথাই জানা গেল কালামের সঙ্গে অল্পস্বল্প কথায়।
বর্তমানে হিলাল নগর গ্রামে অন্যের ২৮ শতক জমিতে বেগুন চাষ করেছেন তিনি। গেলো কয়েক বছর ধরে করছেনও তাই। বেগুন চাষই তাকে দিয়েছে সফলতা ও স্বাবলম্বীতা। বেগুনে একটু কষ্ট করে করতে পারলে, মুনাফা অন্য সবজির তুলনায় অনেক বেশি বলে জানায় কালাম। তিনি নিজেই বীজ থেকে চারা করেন, রোপন করেন সেই চারা। বীজ থেকে চারা হয় ২৮ দিনে। আর চাড়া রোপন থেকে বেগুন বিক্রি উপযোগী করতে সময় লাগে ৯০ দিন। মাত্র চার প্যাকেট বীজই শুরুতে তার বড় বিনিয়োগ। ২৮ শতকের জমিতে সবকিছু মিলিয়ে খরচ পড়ে প্রায় সাড়ে ২৯ হাজার টাকা। এর বিনিময়ে মুনাফা আসে প্রায় লাখ টাকার মতো।
বেগুনের মৌসুম শেষে একই জমিতে কড়লা বা উইস্তা চাষও করেন কালাম। তবে বেগুনের মতো সাফল্য অন্য চাষে তেমনটা পান না বলেই বেগুন চাষই এখন আবুলের প্রধান পেশা। কালামের বেগুন গুনে মানে ভাল বলে পাইকাররা জমি থেকেই কিনে নেন সব। বর্তমানে প্রতি কেজি বেগুন পাইকারে ২০/২২ টাকায় বিক্রি করেন তিনি।
বর্তমানে বেগুনের জমিতে এক ধরনের পোকা আক্রমনে কালামের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। বেগুনের ডগায় জন্মায় পোকা। ডগায় ছাড়া ডিম থেকেই লেদা পোকার জন্ম। বেগুনের গোড়ার দিকে আক্রমনে নামে এই পোকা। কালাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতা চেয়েছেন লেদা পোকার আক্রমন থেকে বেগুনকে রক্ষায়।
সফল বেগুন চাষি মো.আবুল কালাম বলেন, লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশ গিয়ে সফল হতে পারিনি, সেখানে বেগুন চাষে আল্লাহর রহমতে সফল হয়েছি। বেগুন চাষে চলছে সংসার।তিন ছেলেকে পড়ালেখা করাচ্ছি। বড় জন ৮ম শ্রেণি, দ্বিতীয় ছেলে মাদরাসায় আর ছোট জন প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। তবে বেগুন চাষি কালাম দু:খ করে বলেন, সরকার যদি সুদ মুক্ত ঋণ দেয় কিংবা সহজ শর্তে ঋণ দেয় এবং বিনা পয়সায় ঔষধ পাওয়া যায়, তাহলে আরো সফলতা আসবে বেগুন চাষে। দেশের কৃষিতে বড় ভুমিকা রাখা সম্ভব হবে বেগুনে।
চৌদ্দগ্রামে সবচেয়ে বেশি বেগুন চাষ হয়কাশিনগর ইউনিয়নে। স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ইউনিয়নের মোট ২১৭৮ হেক্টর আবাদি জমির ৩.৫০ হেক্টরে চাষ হয় বেগুন। চলতি মৌসুমে এখানে বেগুন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৭০ মেট্রিক টন।
বেগুন জমিতে লেদা পোকার আক্রমন সম্পর্কে জানতে চাইলে কাশিনগর ইউনিয়নের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. অহিদুর রহমান জানান, এটি আসলে লেদা পোকা নয়।স্থানীয়ভাবে ডিগকাটা পোকা বলে। পোকা সম্পর্কে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, কৃষক আবুল কালামের জমির খবর পেয়ে একাধিকবার পরির্দশন করেছি। অন্যান্য বেগুনের জমিতে যাতে পোকার সংক্রমন না হয়, সে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এ সম্পর্কে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা কৃষি অফিসার শাহনাজ বেগম জানান, শুধু বেগুন চাষে সমস্যা নয়, যে কোন ফসলের সমস্যা শুনা মাত্রই কর্মকর্তারা সরেজমিনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোশারেফ হোসেন কৃষক আবুল কালাম সম্পর্কে জানান, সে বর্তমানে বেগুন চাষ করে জীবন ধারণ করছে। আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাকেসহ অন্যান্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছি। তিনি আরো বলেন, এলজিএসপি প্রকল্পের আওতায় আমার ইউনিয়নের কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছি। বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অর্থ অভাবে কৃষক যদি কোন ফসল চাষ করতে না পারে, তাকেও সহযোগিতা করা হচ্ছে। বলতে পারেন কুমিল্লার মধ্যে কাশিনগর কৃষি বান্ধব ইউনিয়ন হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।
ডেইলি বাংলাদেশ/এলকে