ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ জাতীয় ]

হামে মৃত শিশুদের ৯১ শতাংশই নেয়নি এমআর টিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:১২, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হামে মৃত শিশুদের ৯১ শতাংশই নেয়নি এমআর টিকা
ছবি: সংগৃহীত

হামের সংক্রমণে মারা যাওয়া শিশুদের ৯১ দশমিক ৪ শতাংশই কোনো এমআর (হাম-রুবেলা) টিকা নেয়নি। আর নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত শিশুদের ৮০ শতাংশেরও কোনো এমআর টিকা নেওয়ার তথ্য নেই। স্বাস্থ্য খাতের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) পরিচালিত এক সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

সমীক্ষার বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণেও শিশুদের ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্তের হার ১০ শতাংশ হলেও মৃত্যুর হার ২০ শতাংশ। ছয় থেকে নয় মাস বয়সী শিশুদের আক্রান্তের হার ১৮ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ ৩১ শতাংশ।

Advertisement

নয় থেকে ১২ মাস বয়সীদের মধ্যে আক্রান্তের হার ১২ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে, এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের আক্রান্তের হার সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১৮ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে দুই লাখ চার হাজার ৩০০ শিশু। এ সময়ে মারা গেছে এক হাজার ৭৬ জন।

এর সঙ্গে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত শিশুদের হিসাব যোগ করলে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দুই রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ১৫ হাজার ২২৭। মৃত্যু হয়েছে এক হাজার ১০৩ শিশুর।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানে ঘাটতি, দুই ডোজের মধ্যে ইমিউনিটি গ্যাপ, নিয়মিত টিকাদানের কাভারেজ কমে যাওয়া এবং টিকার আওতায় আসা শিশুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। প্রথম ঢেউ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই হামের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে বলেও মনে করছেন তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বুধবার হামের উপসর্গ নিয়ে ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ২৭০ জন।

চলতি সেপ্টেম্বরে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১০৩ শিশু। আক্রান্ত হয়েছে ২৬ হাজার ৯৯৭ জন।

এর আগে এপ্রিল পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত ছিল ৪০ হাজার ৭০৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ২৭৬ জনের। মে মাসে আক্রান্ত হয় ৩৯ হাজার ২৭৭ ও মৃত্যু ৩০৯ জনের। জুনে আক্রান্ত ৩৩ হাজার ৫৭ এবং মৃত্যু ১৩৩ জনের। জুলাইয়ে আক্রান্ত ৩১ হাজার ৩২৭ ও মৃত্যু ১১৯ জনের এবং আগস্টে আক্রান্ত ৩২ হাজার ৯৩৪ ও মৃত্যু ১৩৬ জনের। অর্থাৎ কয়েক মাসে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমলেও মৃত্যুর প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

ইপিআইয়ের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ সাব্বির হায়দার বলেন, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা সাধারণত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমানে টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে অনেক শিশুর ক্ষেত্রে মাতৃ-অ্যান্টিবডিও পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারছে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনায় হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অন্তত ১০টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে টিকাদানে ঘাটতি, দুই ডোজের মধ্যে ইমিউনিটি গ্যাপ, শিশুর সংখ্যা নির্ধারণে তথ্যগত অসঙ্গতি, টিকার সরবরাহ সংকট, আগাম সতর্কতার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে ভাটা, মাঠকর্মীদের অসন্তোষ, টিকাদানের কাভারেজ যাচাইয়ে দুর্বল নজরদারি, টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্তদের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ঘাটতি এবং অপুষ্টি ও চিকিৎসায় বিলম্ব।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হামের প্রথম ঢেউ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখন টিকাদানকে প্রধান সমাধান হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে।

তার মতে, শুধু ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু নয়, ছয় মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী সব শিশু-কিশোরকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। মহামারি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়ার প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

চলতি বছরের মার্চে হাম ছড়িয়ে পড়ার পর উচ্চঝুঁকিতে থাকা ৩০টি উপজেলায় জরুরি টিকাদান শুরু করে সরকার। পরে ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত সারাদেশে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের গণটিকা দেওয়া হয়। এর লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ওই কর্মসূচিতে এক কোটি ৯৬ লাখ ৬১ হাজারের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

তবে একই বয়সী শিশুদের গত জুনে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচিতে অংশ নেয় প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ শিশু। টিকাদানের হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে থাকা শিশুর সংখ্যার এত বড় পার্থক্য কেন—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। এ কর্মসূচিতে ৩৪ লাখ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুও শিশুদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বুধবার পর্যন্ত চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৬৭ হাজার ৩৬৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং মারা গেছে ২০১ জন। এর মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী আক্রান্ত ১০ হাজার ৯২৭ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২৭ জনের। মোট ডেঙ্গু মৃত্যুর ১৩ শতাংশই শিশু।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!