মেয়ের খুনিদের ধরতে ছদ্মবেশে মা, ভরসা নকল বন্দুক
অপরাধীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন মেয়ে। অপহরণের ২ বছর পরে পাওয়া যায় মেয়ের দেহাবশেষ। মেয়ের হত্যা মেনে নিতে পারেননি মা। আর তাই অপরাধীদের খুঁজে বের করতে দেশের আইন ব্যবস্থার অপেক্ষায় না থেকে নিজেই মাঠে নামেন। ঠিক করলেন যেখান থেকে হোক, যেভাবেই হোক খুনিদের খুঁজে বের করবেনই।
ডেইলি মেইল’র এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রায় ১ বছর ধরে ছদ্মবেশ ও নকল পরিচয়ে মেয়েদের খুনিদের ধাওয়া করে গিয়েছেন মেয়ের মা মরিয়ম। তার জন্যই ফাঁদে পড়ে ১০ জন অপরাধী। আর জীবন দিয়ে এই সত্য অনুসন্ধানের মাশুল দিয়েছিলেন মা। নিজের বাড়ির সামনেই ১২টি বুলেট বিদ্ধ করেছিল তাকে।
সরকারের দরজায় দরজায় সাহায্যের জন্য ঘুরেছিলেন মরিয়ম। কিন্তু সকলে তার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই তিনি নিজেই লড়াইয়ে নেমেছিলেন নারী পাচারকারীদের বিরুদ্ধে।
দুঃসাহসিক অভিযানে মরিয়মের হাতিয়ার ছিল ছদ্মবেশ। নিজের চুলের রং পরিবর্তন করতে ঘন ঘন। এক সময় কাজ করতেন স্বাস্থ্য বিভাগে। সেখানকার পুরনো ইউনিফর্ম পরে স্বাস্থ্যকর্মী সেজে ঘুরে বেড়াতেন পথে পথে। একমাত্র মেয়ের হত্যাকারীদের সন্ধানে।

অনেক রকম ছদ্মবেশ ব্যবহার করেছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিল নকল বন্দুক এবং পরিচয়। তিনি ধীরে ধীরে খুঁজে বার করলেন লস জেটাস কার্টেলের সদস্যদের। তাদের খোঁজে পাড়ি দিয়েছিলেন সীমান্ত পেরিয়ে আমেরিকার টেক্সাস শহরেও।
মরিয়মের মূল নিশানা ছিল অল্পবয়সি এক ফ্লোরিস্ট। মরিয়ম জানতে পেরেছিলেন দুষ্কৃতি চক্রে যোগ দেয়ার আগে সে রাস্তায় ফুল বিক্রি করত। খবর পেয়ে মরিয়ম তাকে চিহ্নিত করে মেক্সিকো আমেরিকা সীমান্তে। সেখানে সে রোদচশমা বিক্রি করছিল।
মরিয়ম পরে জানিয়েছিলেন, তাকে দেখে চিনতে পেরে গিয়েছিল ওই খুনি। কিন্তু পালাতে পারেনি তার হাত থেকে। ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছানো পর্যন্ত ১ ঘণ্টা তার দিকে নকল বন্দুক তাক করে পাহারা দিয়েছিলেন মরিয়ম। প্রাণভয়ে পালাতে পারেনি সেই খুনি।

মরিয়মের অক্লান্ত পরিশ্রমে ১০ জন খুনিকে চিহ্নিত করা গিয়েছিল। তাদের মধ্যে ক্রিস্টিয়ান গঞ্জালেজ নামে এক জনের বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর।
একটা সময়ে নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে চক্রের খুনিদের সঙ্গে দীর্ঘ কথা চালিয়ে যেতেন মরিয়ম। সে ভাবেই ‘সামা’ বলে এক জনের নাম জানতে পারেন মরিয়ম।
এর পর অনলাইনে চিরুনি তল্লাশি করে সামা’র খোঁজ পান মরিয়ম। জানতে পারেন তার বাড়ি থেকে গাড়িতে ২ ঘণ্টার দূরত্বে একটি আইসক্রিমের দোকানের মহিলা কর্মীর সঙ্গে সামা’র সখ্যের কথা।
সেই দোকানে দিনের পর দিন গিয়ে অবশেষে এক দিন সামা’র দেখা পান মরিয়ম। তার পিছু নিয়ে চিনে ফেলেন বাড়িও। কিন্তু যত দিনে পুলিশ তার গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরি করল, তত দিনে সামা উধাও।

এর পর সামাকে আবিষ্কার করেন মরিয়মের ছেলে লুইস। ঘটনাচক্রে লুইসের দোকানেই টুপি পছন্দ করতে এসেছিল সামা। এবার আর গ্রেফতার এড়াতে পারেনি সে।
পরে সামাকে জেরা করে বাকি খুনিদের খোঁজ পায় পুলিশ। মেয়ের হত্যাকারীদের হাজতে পাঠাতে পেরে শান্তি পান মরিয়ম।
মরিয়ম জানতেন তিনি নিজেও অপরাধীদের নিশানা হয়ে গিয়েছেন। তার পরেও পিছিয়ে আসেননি। স্থানীয় এক পুলিশ অফিসার তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তার প্রত্যক্ষ সাহায্য নেননি। তবে নানা ভাবে মরিয়মের পাশে ছিলেন সেই অফিসার।
অবশেষে ২০১৭ সালে মাদার্স ডে-তে নিজের বাড়ির সামনে ১২বার গুলিবিদ্ধ হন মরিয়ম। রক্তাক্ত অবস্থায় মরিয়মকে রাস্তার ধারে দেখতে পান তার স্বামী। নিথর মরিয়মের ডান হাত ঢোকানো ছিল তার পার্সে। হাতের পাশেই ছিল নকল পিস্তল। চেষ্টা করেও আত্মরক্ষা করতে পারেননি।

মেক্সিকোর এই সত্যি ঘটনা থেকেই পরে ২০০৮ সালে তৈরি হয়েছিল ফরাসি-আমেরিকান উদ্যোগে ছবি ‘টেকন’। যার কেন্দ্রীয় উপজীব্য ছিল মরিয়ম এলিজাবেথ রডরিগেজ মার্টিনেজের সংগ্রাম।
মরিয়ম ছিলেন মেক্সিকোর সান ফার্নান্দোর বাসিন্দা। অভিযোগ, তার মেয়েকে ২০১২ সালের ২৩ জানুয়ারি উত্তর পূর্ব মেক্সিকোর ট্যামৌলিপাস শহরের রাজপথে অপহরণ করা হয়।
কুখ্যাত অপরাধ গোষ্ঠী লস জেটা কার্টেলের দুষ্কৃতীদের নাম এই কাণ্ডে উঠে আসে। জানা যায়, তারা চলন্ত গাড়িতে করে অপহরণ করে নিয়ে যায় ক্যারেনকে। এর পর কয়েক হাজার ডলার মুক্তিপণ চাওয়া হয়।
অপহৃতার পরিবারের দাবি, দুষ্কৃতীদের চাহিদামতো মুক্তিপণ মেটানোর পরেও তার ফিরে পাননি মেয়েকে। পরিবর্তে ২ বছর পরে ক্যারেনের মৃতদেহ পাওয়া যায় পরিত্যক্ত জায়গায়।