ঢাকা,  শুক্রবার   ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ ধর্ম ]

হিংসা ও তার প্রতিকার (পর্ব-২)

মাওলানা ওমর ফারুক
প্রকাশিত: ১৬:৪৫, ২০ এপ্রিল ২০১৯
হিংসা ও তার প্রতিকার (পর্ব-২)
ফাইল ছবি

হিংসুক নিজেই হিংসার আগুনে জ্বলে: হিংসা অত্যন্ত ভয়াবহ ব্যাধি। সুফিয়ায়ে কেরাম ‘হাসাদ’কে তুলনা করেছেন আগুনের সঙ্গে। 

কেননা হাসাদের কারণে মানুষের অন্তরে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি হয়। কারো কোনো উন্নতি চোখে পড়লে, কাউকে অগ্রগামী হয়ে যেতে দেখলে তো অন্তরে জ্বালাপোড়া শুরু হয়ে যায়। জনৈক আরব কবি বলেন, ‘হাসাদ হলো প্রকৃত আগুনের মতো। আগুন যেমন, জ্বালানোর মত কিছু পেলে তা তো জ্বালাবেই। যেমন, শুকনা কাঠে আগুন লাগল তো আগুন তা জ্বালিয়ে ভস্ম করে ফেলবে। কিন্তু জ্বালানোর মত কিছু না পেলে সে নিজেকেই গ্রাস করতে থাকে এবং এক সময় সে নিঃশেষ হয়ে যায়। তদ্রুপ হিংসুক প্রথমে অন্যের ক্ষতির চেষ্ট করতে থাকে কিন্তু এতে সফল না হলে নিজেই ওই আগুনে জ্বলতে থাকে এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে। এভাবে কত মানুষ হিংসার আগুনে জ্বলে নিঃশেষ হয়ে গেছে।’

হিংসুক আল্লাহ তায়ালার ফয়সালায় অসন্তুষ্ট: ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, হিংসা অনেক বড় গুনাহ। কেননা চিন্তা করলে দেখা যায় যে, হিংসুক আল্লাহ তায়ালার ফয়সালায় সন্তুষ্ট নয়। কারো উন্নতি দেখলে তার মনে আপত্তি জাগে যে, কেন সে আমার চেয়ে অগ্রগামী হয়ে গেল? অমুককে আল্লাহ তায়ালা কেন এই নেয়ামত দান করলেন? অথচ আল্লাহ তায়ালা যাকে যা দিয়েছেন এবং যে পরিমাণ দিয়েছেন সবই তাঁর হেকমত ও কুদরতের ফলাফল। অতএব এতে আপত্তি করার অর্থ হলো আল্লাহ তায়ালার ফয়সালায় আপত্তি করা। কোরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে- আল্লাহ তায়ালা তোমাদের একের ওপর অন্যকে যে সব বিষয়ে প্রাধান্য দিয়েছেন তা কামনা করো না। (সূরা নিসা- ৩৩)।

কেননা এগুলো অর্জনের বিষয় নয়। অতএব এমন আকাক্সক্ষা প্রকাশ করো না যে, এই বৈশিষ্ট্য তাকে কেন দেয়া হলো, আমাকে কেন দেয়া হলো না?

আরো পড়ুন>>> হিংসা ও তার প্রতিকার (পর্ব-১)

এটা আল্লাহ তায়ালার ব্যবস্থা: এটা তো আল্লাহ তায়ালার ব্যবস্থা। কাউকে সুস্থতা দিয়েছেন, কিন্তু বিত্ত দেননি। কাউকে অর্থ বিত্ত দিয়েছেন কিন্তু সুস্থতা দেননি। কাউকে ইলম দিয়েছেন কিন্তু মাল-দৌলত দেননি। কাউকে মর্যাদা ও প্রসিদ্ধি দিয়েছেন কিন্তু সন্তান-সন্ততি দেননি। এগুলো আল্লাহ তায়ালার ফয়সালা। এখানে বান্দার আপত্তি করার অধিকার নেই।

নিজ নেয়ামতের দিকে তাকাও: হিংসুক তার প্রতি আল্লাহ তায়ালার যে নেয়ামত রয়েছে তা লক্ষ্য করে না। অন্যের নেয়ামতগুলো নষ্ট হওয়ার আকাক্সক্ষা পোষণ করে। সে যদি এভাবে চিন্তা করে যে, অমুককে আল্লাহ তায়ালা ওই নেয়ামত দান করেছেন কিন্তু আমাকেও তো এই এই নেয়ামত দান করেছেন, তা হলে তার অন্তর থেকে হাসাদ দূর হয়ে যাবে। যেমন, অমুক ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা অর্থ বিত্তের নেয়ামত দান করেছেন আর আমাকে ইলম দান করেছেন। জনৈক কবি বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমাদের মধ্যে যেভাবে বণ্টন করেছেন আমরা তাতে সন্তুষ্ট। আল্লাহ তায়ালা মূর্খদেরকে সম্পদ দিয়েছেন আর আমাদেরকে দান করেছেন ইলম। তা হলে মানুষ কেন দুঃখিত হবে? সর্বাবস্থায় আল্লাহ তায়ালার ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকাই মানুষের কর্তব্য। মোটকথা হাসাদের সবচেয়ে গুরুতর দিক এই যে, এতে আল্লাহ তায়ালার ফয়সালা সম্পর্কে আপত্তি ও অসন্তুষ্টি বিদ্যমান রয়েছে। এ জন্য এটা পরিহার করা উচিত।’

এই চিন্তাকে খারাপ মনে করুন: অনেক ক্ষেত্রেইে হাসাদ একটি স্বভাবজাত প্রবণতা। এটি সৃষ্টি হওয়ার পেছনে মানুষের ইচ্ছার প্রভাব থাকে না। এ ধরনের ক্ষেত্রে মানুষ একটা পর্যায় পর্যন্ত অপারগ এবং এতে তার গুনাহও হয় না। কিন্তু এই মনোবৃত্তিটাও অত্যন্ত ভয়াবহ। কেননা যে কোনো সময় এটা মানুষকে গুনাহ লিপ্ত করে দিতে পারে। এ জন্য এর চিকিৎসা করা জরুরি। প্রথমে সচেতন হতে হবে যে, এই মনোবৃত্তিটা ভালো নয়, এরপর সতর্ক থাকতে হবে যেন একে কাজে পরিণত না করা হয়। হজরত থানবি (রহ.) বলেন, যে কাজটা মানুষের ইচ্ছাধীন তার বিপরীতটাও ইচ্ছাধীন। তাই হাসাদের কারণে যে সব কাজের প্রেরণা জাগছে তার বিপরীত কাজগুলো করো। যেমন, গিবত-শেকায়েতের স্থলে প্রশংসা কর, যদিও কাজটা মনের ইচ্ছার বিরোধী কিন্তু মুখ তো তোমার ইচ্ছার অধীন। তার ক্ষতিতে মৌখিকভাবে সহানুভূতি প্রকাশ কর। তার সামনেও এবং অন্যদের সামনেও। তার সঙ্গে সাক্ষাত হলে তার সম্মান করো। মাঝে মাঝে হাদিয়া প্রদান কর। একটা উল্লেখযোগ্য সময় পর্যন্ত এই কাজগুলো করতে থাকলে হাসাদ দূর হয়ে যাবে। অন্তত বিশবার এই কাজগুলো করা উচিত। (আনফাসে ইসা ১৭৪)।

যে কাজ করা মানুষের ইচ্ছা ও সামর্থ্যরে ভেতরে তা না করাও ইচ্ছা ও সামর্থ্যরে ভেতরে। এ জন্য হাসাদের কারণে মানুষের মনে যে ইচ্ছাগুলো জাগ্রত হয়, যেমন, ইচ্ছা হয় যে, তাকে মারব, গালমন্দ করব, অপমান করব, লোকের সামনে তাকে লাঞ্ছিত করব ইত্যাদি। এগুলো মানুষের ইচ্ছাধীন কর্ম ও হারাম। অর্থাৎ, এই অবৈধ কাজগুলো মানুষ নিজ ইচ্ছায় করতে পারে। তা হলে তার বিপরীত কাজগুলোও মানুষের ইচ্ছাধীন।

যার প্রতি হিংসা রয়েছে তার প্রশংসা করো: ইচ্ছা হচ্ছে তার সমালোচনা করি, কিন্তু প্রশংসা করুন। এই কাজটা আপনার সাধ্যের ভেতরে। অতএব তা করুন। এ জন্য হজরত থানবি (রহ.) বলেছেন যে, হিংসা হাসাদের কারণে যে ইচ্ছাগুলো মনে জাগে তার বিপরীত কাজগুলো করো, যেমন, গিবত-শেকায়েতের পরিবর্তে প্রশংসা কর।
যদিও তার করতে ইচ্ছা হবে না তবু জোড় করে তা করুন। আর প্রশংসা করার অর্থ অবাস্তব প্রশংসা করা নয়; বরং প্রকৃতপক্ষে তার যে বিষয়টি প্রশংসনীয় তাই উল্লেখ করুন। পৃথিবীতে এমন কোনো বস্তু নেই যাতে প্রশংসনীয় কোনো দিক নেই। অতএব তার ভালো গুণ খুঁজে বের করে তা আলোচনা করুন।

জুনায়েদ বাগদাদি (রহ.) চোরের পা চুম্বন করেন: হজরত থানবি (রহ.) লিখেছেন, হজরত জুনায়েদ বাগদাদি (রহ.) একবার কোথাও যাচ্ছিলেন। দেখলেন যে একব্যক্তিকে শূলে চড়ানো হয়েছে। তার ডান হাত ও বাম পা কর্তিত। হজরত জুনায়েদ বাগদাদি (রহ.) লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ অবস্থা কেন? লোকেরা বলল, সে যখন প্রথমবার চুরি করেছে, তখন তার ডান হাত কেটে দেয়া হয়। দ্বিতীয়বার চুরি করার পর বাম পা কেটে দেয়া হয়। কিন্তু এরপরও সে চুরি পরিত্যাগ করেনি। পুনরায় চুরি করার কারণে তাকে শূলে চড়ানো হয়েছে। হজরত জুনায়েদ বাগদাদি (রহ.) তার কাছে গেলেন এবং তার ঝুলন্ত পায়ে চুম্বন করলেন। লোকেরা অবাক হয়ে বলল, হজরত আপনার মত মানুষ এত বড় চোর ও ডাকাতের পায়ে চুম্বন করলেন? এটা তো বুঝে আসল না, কেন এ কাজটা আপনি করলেন? হজরত জুনায়েদ বাগদাদি (রহ.) বললেন, এর মধ্যে একটা মূল্যবান গুণ আছে। তা হচ্ছে অবিচলতা। আমি তার এই গুণটাকে চুম্বন করেছি। যদিও সে এই গুণটা মন্দ কাজে ব্যবহার করেছে এটা তার ভুল। কিন্তু এ গুণটা বড় মূল্যবান। যদি সে এটা ভালো কাজে লাগাত তা হলে তার মরতবা কোথায় পৌঁছে যেত।

প্রত্যেকের মধ্যেই কোনো না কোনো গুণ রয়েছে:  প্রত্যেকের মানুষের মাঝেই কোনো না কোনো গুণ রয়েছে। ড. ইকবাল কখনো কখনো অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বলেন। শিশুদের কবিতায় অত্যন্ত সুন্দর কথা বলেছেন, জমানার কোনো কিছুই নির্গুণ নয়। কুদরতের সৃষ্টি কোনোটাই মন্দ নয়। অতএব পৃথিবীতে যা কিছুই আছে সব আল্লাহ তায়ালা নিজ হেকমত অনুযায়ী পয়দা করেছেন। অতএব যার প্রতি আপনার মনে হিংসা সৃষ্টি হয়েছে তার ভালো গুণ তালাশ করুন এবং মানুষের কাছে তা আলোচনা করুন। এতে আপনার অন্তর ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকবে। কিন্তু হতে দিন। এই ব্যাধির চিকিৎসাই হল অন্তরকে ক্ষত-বিক্ষত করা। এ জন্য হজরত থানবি (রহ.) বলেছেন, গিবত-শেকায়েতের পরিবর্তে তার প্রশংসা করতে থাকুন। যদিও তা মনের ওপর কষ্টকর, কিন্তু আপনার জবানের ওপর তো আপনার কর্তৃত্ব রয়েছে।’ এটা হলো এক কাজ। 

বিনয়ের সঙ্গে মেলামেশা করুন: দ্বিতীয় কাজ হলো তার সঙ্গে বিনয়ের সাথে কথা বলুন ও মেলামেশা করুন।’ যেমন, যদিও ইচ্ছা হচ্ছে যে তার চেহারা থেকে গোশত তুলে আনি কিন্তু যখন তার সঙ্গে সাক্ষাত হয় তখন তার সঙ্গে বিনয়ী আচরণ করুন এবং নম্রস্বরে কথা বলুন।

তার দুঃখ কষ্টে সহানুভূতি প্রকাশ করুন: তৃতীয় কাজ হলো ‘তার কষ্টে সহানুভূতি প্রকাশ করুন।’ অর্থাৎ, তার দুঃখ কষ্ট ও বিপদাপদে সহানুভূতি প্রকাশ করুন। তার সামনেও করুন এবং অন্যদের সামনেও করুন।

হাদিয়া দিন: প্রথম কাজ এই যে, মাঝে মাঝে তাকে হাদিয়া দিন। তা হলে তার অন্তরেও আপনার প্রতি মুহাব্বত সৃষ্টি হবে এবং আপনার অন্তরেও তার প্রতি মুহাব্বত সৃষ্টি হবে। কিছু মানুষ এমন আছে যাদের পক্ষে সব কাজ করা সহজ, কিন্তু পয়সা খরচ করা অত্যন্ত কঠিন। যেন ‘প্রাণ চাইলে তাও হাজির কিন্তু অর্থ চাইলে কথা আছে।’ অতএব পকেট থেকে পয়সা বের করা খুব কঠিন। কিন্তু এই তিক্ত ওষুধটাও সেবন করুন। আপনি যখন তাকে হাদিয়া দিলেন তখন বিষয়টা এই দাঁড়াল যে, পকেট থেকে পয়সা বের হলো এবং এমন লোকের কাছে পৌঁছল যার প্রতি আপনার অন্তরে বিদ্বেষ রয়েছে। মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আপনি যখন এই কাজটা করবেন তখন এই ওসিলায় হাসাদের ব্যাধি থেকে নিষ্কৃতি পাবেন।

এই কাজ বারবার করুন:  এরপর হজরত থানবি (রহ.) বলেছেন, একটা উল্লেখযোগ্য সময় পর্যন্ত এ কাজগুলো করুন। হাসাদ দূর হয়ে যাবে। অন্তত বিশবার এই বিষয়টা প্রকাশ অর্থাৎ, বিশবার কাজগুলো করুন। একব্যক্তি হযরত থানবি (রহ.) এর কাছে চিঠি লিখল যে, অমুকের প্রতি আমার মনে হাসাদ রয়েছে। হজরত থানবি (রহ.) বললেন যে, তার প্রশংসা কর, সম্মান কর এবং হাদিয়া দাও। অন্তত বিশবার যদি এই কাজগুলো কর তা হলে ইনশাআল্লাহ হাসাদ দূর হয়ে যাবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!