হিংসা ও তার প্রতিকার (পর্ব-১)
হিংসা অত্যন্ত মন্দ ব্যাধি। আবার তা সমাজে অত্যন্ত ব্যাপক। মানুষজন ব্যাপকভাবে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এ জন্য গুরুত্বের সঙ্গে এর চিকিৎসা করা কর্তব্য।
তিনটি বিষয় এবং সেগুলোর বিধান:
হজরত থানবি (রহ.) বলেন, হিংসা তো হলো স্বভাবের প্রবণতা। এতে মানুষ মাজুর বা অপারগ। দ্বিতীয় বিষয় ওই প্রবণতার বশবর্তী হয়ে কাজ করা। এ ক্ষেত্রে মানুষ মা’যূর বা গুনাহগার। আর তৃতীয়টি হলো ওই প্রেরণার বিপরীত কাজ করা। এ ক্ষেত্রে মানুষ মা’জূর (সাওয়াবপ্রাপ্ত)। অর্থাৎ, হিংসা ও হাসাদের কারণে কারো নিন্দা করতে ইচ্ছা হলে তার প্রশংসা করবে। মুখ ফিরিয়ে রাখতে ইচ্ছা হলে মেলামেশা করবে এবং তাজিম ও সম্মান করবে। তাকে সালাম দেবে এবং তার প্রতি অনুগ্রহ করবে। (আনফাসে ইসা ১৭৩)।
হিংসা বা হাসাদ কাকে বলে?
হাসাদ হলো, কারো উন্নতি দেখে অন্তর্জ্বালায় ভুগতে থাকা এবং তার ওই বিষয়টা বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার কামনা করা।
হাসাদের উদাহরণ:
এর দৃষ্টান্ত এই যে, আমার একজন সহপাঠী আছে। সে পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে। এতে আমার মনটা জ্বলতে লাগল এবং আমি ভাবতে লাগলাম যে, সে কেন বেশি নাম্বার পেল? কেন সে আমার চেয়ে অগ্রসর হয়ে গেল? এরপর কামনা করতে লাগলাম, তার পরীক্ষা খারাপ হোক, নম্বর কম পাক, আগামী পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার না করুক, আমি প্রথম হতে পারি কী না পারি, সে যেন প্রথম না হয়। এই যে অকল্যাণ কামনা এটাই হাসাদ।
কিংবা একব্যক্তি খুব সম্পদশালী। তার উন্নতি দেখে আপনার অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি হলো এবং আপনি কামনা করতে লাগলেন, তার সম্পদ শেষ হয়ে যাক। উপার্জন কমে যাক। মনের এই মন্দ আকাক্সক্ষাই হাসাদ।
কিংবা ধরুন, সমাজে কারো সুনাম রয়েছে। লোকেরা তাকে সম্মান করে এবং পরামর্শ সহযোগিতা ইত্যাদির জন্য তার শরণাপন্ন হয়। এখন কারো অন্তরে মর্মজ্বালা উপস্থিত হলো যে, কেন লোকেরা তার কাছে যায়, কেন তাকে ভালোবাসে, এরপর এই আকাক্সক্ষাও জাগল যে, তার মান সম্মান নষ্ট হয়ে যাক। এটা হাসাদ।
ঈর্ষা অবৈধ নয়:
আরবিতে একটি শব্দ আছে ‘গিবতা’। এর অর্থ হলো, কারো উন্নতি দেখে এই কামনা করা যে, এই নেয়ামত আল্লাহ তায়ালা আমাকেও দান করুন। এখানে উন্নতির আগ্রহ আছে তবে অন্যের অকল্যাণ কামনা নেই। যেমন, অমুকের স্বাস্থ্য ভালো। আল্লাহ তায়ালা আমাকেও ভালো স্বাস্থ্য দান করুন। অমুকের কাছে সম্পদ আছে। আল্লাহ তায়ালা আমাকেও সম্পদ দান করুন। কিংবা অমুক আলেম গভীর ইলমের অধিকারী, আল্লাহ তায়ালা আমাকেও এমন ইলম দান করুন। একে বলে গিবতা বা ঈর্ষা। এটা নিষিদ্ধ নয়, বৈধ। অন্যদিকে হাসাদ নিষিদ্ধ, যার অর্থ হলো, আমি ওই নেয়ামত পাই বা না পাই তারটা যেন নষ্ট হয়ে যায়।
শুধু অন্তর্জ্বালায় গোনাহ নেই:
হাসাদ মানবমনের অত্যন্ত দুষ্টু প্রবণতা। যদি মনের এই দুঃখটা মনের মধ্যেই চেপে রাখা যায়, কথায় বা কাজে এর প্রভাব না পড়ে তা হলে মনের দুখের কারণে এই ব্যক্তি অপরাধী হবে না। কেননা এটা মানুষের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় নয়। এ সম্পর্কে হজরত থানবি (রহ.) বলেছেন যে, এটা মানব স্বভাবের একটা প্রবণতা। মানুষ এ ক্ষেত্রে অপারগ বলে গণ্য। তবে শর্ত এই যে বিষয়টা মনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কথায় বা কাজে তা প্রকাশিত হতে দেবে না আর মনে যে ইচ্ছাগুলো জাগ্রত হচ্ছে তা পূরণ করবে না। এমন হলে কারো উন্নতিতে কষ্ট জাগার দ্বারা গুনাহ হবে না।
অন্তরের প্রবণতা অনুযায়ী কাজ করা গুনাহ:
হ্যাঁ, গুনাহ তখনই হবে যখন এই অন্তর্জ্বালার কারণে তার কোনো ক্ষতি করবে। যেমন, সমালোচনার মাধ্যমে তার মর্যাদা নষ্ট করা এবং অপমান করার চেষ্টা করা, দেখা সাক্ষাত হলে বিমুখতা প্রদর্শন করা, কিংবা এমন কোনো কৌশল করা যার দ্বারা তার উপার্জন হ্রাস পায়, স্বাস্থ্য নষ্ট হয়, ইলম কমে যায়, মানুষের মাঝে তার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয় ইত্যাদি। কিংবা তার জন্য বদ দোয়া করা, ইয়া আল্লাহ, তার ওই গুণটা নষ্ট করে দিন। এভাবে হিংসা-বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে যখন এই কাজগুলো করা হবে তখন তা গুনাহ ও পাপপচারে পরিণত হবে। এর আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ, শুধু মনের জ্বালা মনেই চেপে রাখা হলে তা গুনাহ নয়। কেননা এটা সৃষ্টি হওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ অপারগ।
তবে মনের ইচ্ছাও ভয়াবহ:
‘এহইয়াউল উলুম’ গ্রন্থে ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, অন্যের ভালো দেখে মনোকষ্ট হলে তা বিনা এখতিয়ারে হওয়ার কারণে যদিও সে অপরাধী হবে না কিন্তু মনের এই অবস্থাটাও অত্যন্ত ক্ষতিকর। কেননা তা বিদ্যমান থাকলে এক সময় তা মানুষকে গুনাহ লিপ্ত করে দেবে। ওই ব্যক্তির কোনো না কোনো ক্ষতির চেষ্টা সে করেই বসবে। এ জন্য বিনা ইচ্ছায় সৃষ্টি হলেও তা পুষে রাখা মোটেই উচিত নয়। এটা খুবই ভয়াবহ।
চিকিৎসার জন্য তিনটি কাজ করুন:
এ অবস্থায় তিনটি কাজ করুন। ১. ভাবুন যে এ চিন্তাটা খুবই মন্দ। কোনো মুসলিমের ব্যাপারে এমন ধারণা পোষণ করা ভালো না। এভাবে চিন্তাটা যে মন্দ তা স্মরণ করুন। দ্বিতীয় কাজ এই যে, যার প্রতি হিংসা হচ্ছে তার গুণাবলী স্মরণ করুন। বিশেষত যে বিষয়গুলো আপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেমন, তার মাধ্যমে যদি কখনো আপনার কোনো উপকার হয়ে থাকে তা হলে তা স্মরণ করুন। ভাবুন যে, আমার তো তার প্রতি কৃতজ্ঞতাপূর্ণ মানসিকতা থাকা উচিত। তৃতীয় কাজ এই যে, যদিও তার প্রতি আপনার হিংসা হচ্ছে, যার কারণে ইচ্ছে হচ্ছে তাকে কষ্ট দিই, অপমান করি কিন্তু মনের ইচ্ছার বিপরীতে কষ্ট করে হলেও তার জন্য এই দোয়া করুন যে, ইয়া আল্লাহ, তাকে আরো উন্নতি দিন। এটা অত্যন্ত তিক্ত ওষুধ। মন তার ক্ষতির জন্য লালায়িত, সে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হোক, তার গ্রহণযোগ্যতা শেষ হয়ে যাক, তার উন্নতি ও সাফল্য থেমে যাক, কিন্তু মনের সকল অশুভ ইচ্ছার বিপরীতে আপনি দোয়া করছেন, ইয়া আল্লাহ, তাকে আরো উন্নতি দান করুন। তার ইলম বাড়িয়ে দিন, সহায়-সম্পদে বরকত দিন, সুস্থতা দান করুন। এতে আপনার মনের চিকিৎসা হবে। যখন তার সঙ্গে সাক্ষাত হবে ইচ্ছার বিপরীতে হলেও তাকে সালাম দিন। তাকে সম্মান করুন এবং মানুষের সামনে তার প্রশংসা করুন। বলা বাহুল্য যে, এ কাজগুলো করতে গিয়ে আপনার অন্তর কষ্টে নীল হয়ে যাবে, তবু করুন। এটাই হাসাদ’র চিকিৎসা।
উপরের এই কাজ তিনটি করুন। মনের মধ্যে যখন হাসাদের ভাব সৃষ্টি হয়েছে তখন যদি উপর্যুক্ত পন্থায় তা নির্মূল না করা হয় তা হলে একপর্যায়ে তা গুনাহর দিকে টেনে নিয়ে যাবে এবং আপনাকে ধ্বংস করে ছাড়বে। কিন্তু যদি ওই কাজগুলো করেন তা হলে স্বভাবগতভাবে যে হাসাদের ভাব মনে সৃষ্টি হয়েছিল তা মাফ হয়ে যাবে।
হজরত থানবি (রহ.) বলেছেন যে, একটি হলো মানুষের মনের স্বাভাবিক অবস্থা। স্বাভাবিক ভাব বলতে মনের ওই অবস্থাটুকু বোঝানো হয়েছে যা বিনা এখতিয়ারে সৃষ্টি হয়েছে। যেমন, কেউ আপনার চেয়ে অগ্রগামী হয়েছে- এটা লক্ষ্য করে আপনার মনে কষ্ট লাগল। এই কষ্ট লাগাটা স্বাভাবিক। এখানে মানুষ অক্ষম ও অপারগ। আল্লাহ তায়ালার কাছে এ সম্পর্কে তাকে জবাবদিহি করতে হবে না।
দ্বিতীয় অবস্থা এই যে, মনের ওই জ্বালা কোনো কাজের মাধ্যমে চরিতার্থ করা। যেমন, তাকে কষ্ট দিতে চেষ্ট করা, তার সম্পর্কে চোগলখোরি করা, গিবত-শেকায়েত করা, তাকে অপমান করার উপায় খুঁজতে থাকা। এ পর্যায়ে মানুষ অপরাধী ও গুনাহগার। তৃতীয় অবস্থা এই যে, মনের ইচ্ছার উল্টো কাজ করা। যেমন, ইচ্ছা হচ্ছে তাকে লাঞ্ছিত করি, কিন্তু উল্টো তার প্রশংসা করলাম, তার জন্য দোয়া করলাম। এটা সাওয়াবের কাজ। এর মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সাওয়াব পায়।
মনের ইচ্ছার বিরোধিতা করার সুফল:
শয়তান আপনার মনে হাসাদ সৃষ্টি করেছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল সে আপনাকে গুনাহ লিপ্ত করবে এবং জাহান্নামে পৌঁছে দেবে। আপনি যদি হাসাদের বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করতেন তা হলে তার উদ্দেশ্য পূর্ণ হত, কিন্তু আপনি কী করলেন? আপনি মনের ইচ্ছার বিরোধিতা করে ওই ব্যক্তির জন্য দোয়া করলেন এবং তার প্রশংসা করলেন। যে মানসিক অবস্থাটা আপনাকে গুনাহতে লিপ্ত করার জন্য এসেছিল তার বিরোধিতা করার কারণে আপনি অসংখ্য সাওয়াব লাভ করলেন। এটা হলো ওই ইচ্ছার বিরোধিতার সুফল। চলবে...
ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে