ঢাকা,  রোববার   ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]
আন্তর্জাতিক চকলেট দিবস আজ

চকলেট কেবল মিষ্টি নয়, বৈশ্বিক শিল্প ও সংস্কৃতির অংশ

আহনাফ আদ্রিক
প্রকাশিত: ১৪:০৬, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চকলেট কেবল মিষ্টি নয়, বৈশ্বিক শিল্প ও সংস্কৃতির অংশ
বাংলাদেশি সমাজে খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। উৎসব এবং বিশেষ অনুষ্ঠানে চকলেট একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। যেমন, ঈদ, জন্মদিন এবং বিবাহের অনুষ্ঠানে চকলেটের উপস্থিতি প্রায় আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। এটি শুধু একটি মিষ্টান্ন নয়, বরং

চকোলেটের নাম শুনলেই অনেকের মুখে পানি চলে আসে। ডার্ক চকোলেট, হোয়াইট চকোলেট, মিল্ক চকলেট আরও নানা স্বাদে এর দেখা পাওয়া যায়। বর্তমান বাজারে চকলেট দিয়ে বানানো নানা ডেজার্ট পাওয়া যায়। চকলেট মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।

চকলেটের মধ্যে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েডস এবং ক্যাফেইন মস্তিষ্কের রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি করতে এবং মানসিক সক্রিয়তা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে নিয়মিত চকলেট গ্রহণ বয়সজনিত মস্তিষ্কের অবক্ষয় কমাতে সহায়ক হতে পারে।

Advertisement

চকলেট আজ কেবল একটি মিষ্টি খাদ্য নয়, বরং এক বৈশ্বিক শিল্প ও সংস্কৃতির অংশ। প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলারের চকলেট বিক্রি হয়, যা সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষের কাছে আবেগ, উদযাপন এবং ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। 

Chocolate-Stuffed Dates — Easy Halal Ramadan Treat with Nuts and Sea Salt

চকলেটের আবিষ্কার প্রায় ৪০০০ বছর আগে হয়েছিল। জানা গিয়েছে, বর্তমান মেক্সিকোর মেসোআমেরিকাতে এর উদ্ভূত হয়েছিল। ‘চকোলেট’ শব্দটি নাহুয়াটল শব্দ ‘চোকোলাটল’ এবং অ্যাজটেক শব্দ ‘জোকোটল’, থেকে এসেছে।  

যাদের অর্থ যথাক্রমে ‘গরম পানি’ ও ‘তেতো পানি’। ৪০০০ বছর আগে ওলমেকরা (মেক্সিকোর প্রথম প্রধান সভ্যতা) কোকোবিন থেকে চকোলেটে বানানো শুরু করেছিল। যা তারা ওষুধ হিসেবে খেত। কয়েক শতাব্দী পরে, চকোলেট একটি পানীয় হিসেবে ব্যবহার হতে শুরু করে।

আজ ১৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক চকলেট দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে চকলেট দিবস পালিত হওয়ায় বছরে একাধিকবার আসে ‘চকলেট ডে’। ১৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ‘ইন্টারন্যাশনাল চকলেট ডে’ হিসেবে পরিচিত। দিনটি চকলেট উদ্যোক্তা মিল্টন এস. হার্শের জন্মদিনের সঙ্গেও মিলে যায়। তিনি ১৮৫৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।

এক সময় চকলেট কেবল ধনী ব্যক্তিদের জন্যই ছিল। কারণ এটি বানাতে প্রয়োজনীয় সময় সাপেক্ষ প্রক্রিয়াটি বেশ ব্যয়বহুল ছিল। ১৮২৮ সালে, ভ্যান হাউটেন নামে একজন ডাচ রসায়নবিদ চকোলেট প্রেস মেশিন উদ্ভাবন করেন। এই মেশিনটি দিয়ে চকলেট বানানো বেশ সহজ হয়ে ওঠেছিল। যার ফলে চকলেট সাধারণ মানুষের আওতায় আসে।

Tahini Stuffed Dates Dipped in Chocolate

  • 'বিশ্ব চকলেট দিবস', কখনও কখনও 'আন্তর্জাতিক চকলেট দিবস' হিসেবে পালন করা হয়, বা শুধু 'চকলেট দিবস', চকলেটের একটি বার্ষিক উদযাপন, বিশ্বব্যাপী ৭ জুলাই, যাকে কেউ কেউ ১৫৫০ সালে ইউরোপে চকলেট প্রবর্তনের বার্ষিকী হওয়ার পরামর্শ দেন। 'বিশ্ব চকলেট দিবস' ২০০৯ সাল থেকে পালন করা হয়।

অন্যান্য চকলেট দিবস উদ্‌যাপন বিদ্যমান, যেমন ২৮ অক্টোবর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় চকলেট দিবস। ইউএস ন্যাশনাল কনফেকশনার্স অ্যাসোসিয়েশন ১৩ সেপ্টেম্বরকে 'আন্তর্জাতিক চকলেট দিবস' হিসাবে তালিকাভুক্ত করে, যা কাকতালীয়ভাবে চকলেট উৎপাদক মিল্টন এস. হার্শে (জন্ম : ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৮৫৭) এর জন্মতারিখের সাথে মিলে যায়। ঘানা, কোকোর দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক, ১৪ ফেব্রুয়ারি 'চকলেট দিবস' উদ্‌যাপন করে। লাটভিয়ায়, ১১ জুলাই, 'বিশ্ব চকোলেট দিবস' পালিত হয়। 


চকলেট দিবসের শুরু যেভাবে

চকলেটের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। প্রায় চার হাজার বছর আগে বর্তমান মেক্সিকো অঞ্চলের প্রাচীন জনগোষ্ঠী কোকো বীজ থেকে পানীয় তৈরি করত। সে সময় চকলেট ছিল বিশেষ ও মূল্যবান খাবার। বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় আচারেও এর ব্যবহার ছিল।

পরবর্তী সময়ে মায়া ও আজটেকদের মধ্যে কোকো বীজের ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়। একসময় কোকো বীজ বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। মায়ারা চকলেটকে দেবতাদের পানীয় হিসেবে দেখত।

প্রায় ষোড়শ শতকে চকলেট ইউরোপে পৌঁছায়। পরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চকলেটের দোকান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। চকলেট তৈরির প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছেও এটি সহজলভ্য হতে শুরু করে।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শেষভাগে ইউরোপে চকলেটের বার তৈরি ও বিক্রি শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে কেক, বিস্কুট, মিষ্টি, পানীয়সহ নানা খাবারে চকলেটের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে।

Chocolate Covered Dates


বিশ্ববাজার ও সংস্কৃতি

বিংশ শতাব্দীতে চকলেট একটি বিশাল বৈশ্বিক বাণিজ্যে পরিণত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈনিকদের রেশন হিসেবে চকলেট সরবরাহ করা হয়, যা এর জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে তোলে। পরবর্তীতে, বিভিন্ন ব্র্যান্ড নতুন নতুন স্বাদ, আকৃতি এবং মোড়কের চকলেট বাজারে নিয়ে আসে। আজ, প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলারের চকলেট বিক্রি হয়।

বিশ্বের মোট কাকাও উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশই আসে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে, বিশেষ করে আইভরি কোস্ট, ঘানা, ক্যামেরুন এবং নাইজেরিয়া। এই দেশগুলোর অর্থনীতিতে কাকাও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং জার্মানির মতো ইউরোপীয় দেশগুলো উন্নতমানের চকলেট উৎপাদনে নেতৃত্ব দেয়।

বর্তমানে চকলেট বিভিন্ন রূপে পাওয়া যায় : ডার্ক চকলেট, মিল্ক চকলেট, হোয়াইট চকলেট, অর্গানিক চকলেট এবং আর্টিজানাল চকলেট। এ ছাড়াও বিভিন্ন উৎসবে যেমন ভালোবাসা দিবস, ক্রিসমাস, বা ঈদে চকলেট উপহার দেওয়া একটি বৈশ্বিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে চকলেট

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকেই বাংলাদেশে চকলেটের পরিচিতি ছিল, তবে তা ছিল মূলত সীমিত পরিসরে। স্বাধীনতার পর, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড যেমন ক্যাডবেরি, মার্স, নেসলে এবং হার্শিস-এর মতো কোম্পানিগুলো এদেশের বাজারে প্রবেশ করে এবং দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। 

বৈশ্বিকরণের ফলে বাংলাদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের চকলেট সহজলভ্য হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিদেশি ব্র্যান্ডের চকলেটের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এগুলি শুধুমাত্র সুস্বাদুই নয়, উপহারের জন্যও জনপ্রিয়।

বাংলাদেশি সমাজে খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। উৎসব এবং বিশেষ অনুষ্ঠানে চকলেট একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। যেমন, ঈদ, জন্মদিন এবং বিবাহের অনুষ্ঠানে চকলেটের উপস্থিতি প্রায় আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। এটি শুধু একটি মিষ্টান্ন নয়, বরং সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক মানের প্রতীকও হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও চকলেট উৎপাদনে এগিয়ে এসেছে। প্রাণ, ইফাদ, কোকো-আকো, অলিম্পিক-এর মতো কোম্পানিগুলো এখন নিজস্ব ব্র্যান্ডের চকলেট তৈরি করছে, যা ভোক্তাদের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

নগরজীবন থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদেও চকলেট এখন একটি অতি পরিচিত এবং প্রিয় খাদ্য। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কাছে এটি এক অপরিহার্য খাদ্য এবং বিশেষ উপলক্ষ্যে উপহার হিসেবে এর ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!