ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ ফিচার ]

মেগালোডন: সাগর অতলের অতিকায় সম্রাট

আহনাফ তাহমিদ
প্রকাশিত: ১৯:৫৯, ২১ আগস্ট ২০১৮
মেগালোডন: সাগর অতলের অতিকায় সম্রাট

আজ থেকে প্রায় ২৩ মিলিয়ন বছর আগে সাগরের অতলে বাস করত মেগালোডন নামক এক অতিকায় প্রাণী, বৈজ্ঞানিক নাম কারচারোকলস। অনেকে আবার ‘আদর’ করে ডাকেন দ্য মেগ। 

প্রচণ্ড শক্তিশালী ও ভয়ংকর শিকারী প্রাণী বলতে যা বোঝায়, মেগ ছিল ঠিক তাই। সাগর একাই রাজত্ব করত সে, চলার পথে কোনো বাঁধা সহ্য করত না। সামনে যা থাকত, দুমড়ে মুচড়ে নিজের জায়গা করে নিত সাগরের এই অতিকায় সম্রাট। আলটিমেট কিলিং মেশিন বলতে যা বোঝায়, মেগ ছিল তাই। 

মেগালোডনের ফসিল পাবার পর গবেষণা করে যেসব ফলাফল পাওয়া গিয়েছে, তা যে খুব সুখকর কিছু নয়, এটা বলাই বাহুল্য। কেউ কেউ তো এটাও বিশ্বাস করেন যে মেগালোডন শুধুমাত্র চলচ্চিত্রেই পাওয়া সম্ভব। বাস্তবে এমন অতিকায় প্রাণী সাগরের বুকে ছিলই না। সাগরের অবিসংবাদিত সম্রাট মেগালোডন নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা। 

ড্রাগন ভাবা হতো মেগকে:

১৭শ’ শতাব্দীতে ড্যানিশ প্রকৃতিবিদ নিকোলাস স্টেনো মেগালোডনের একটি দাঁত খুঁজে পেয়েছিলেন। এর আগে কেউ যদি এতবড় আকারের কোনো ফসিলাইজড দাঁত খুঁজে পেত, তাহলে সেটিকে ‘টাং স্টোন’ বলে অভিহিত করা হতো। ড্রাগন কিংবা সরীসৃপ প্রজাতির বড় কোনো প্রাণীর দাঁত হিসেবেই ভুল করা হতো মেগালোডনের দাঁতকে। বিশ্বাস করা হতো, কোনো যুদ্ধে ড্রাগনের দাঁত পড়ে যাবার পর সেটি ফসিলাইজড হয়ে পাথরে রুপান্তরিত হয়। কেউ কেউ এই দাঁতগুলোকে খুব পবিত্র মনে করে সম্মানের সাথে আগলে রাখত। 

পরবর্তীতে স্টেনো বলেন যে, এই দাঁতগুলোর সাথে ড্রাগনের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এগুলো যে অতিকায় মেগালোডনের দাঁত, সেটিও তিনি প্রকাশ করেন। পৃথিবীতে একসময় ড্রাগনের আবাস ছিল এবং তাদের প্রমাণ হিসেবেই এই দাঁতগুলোকে ধারণা করে নেয়া হতো। তবে ড্রাগনের চাইতেও যে বিশাল অতিকায় কোনো প্রাণী মাথাব্যথার কারণ হতে পারে, সেটি প্রমাণ করে দিয়েছে স্বয়ং মেগালোডন।
 
প্রচণ্ড ক্ষুধাই মেগদের মৃত্যুর কারণ?

মেগালোডনদের বিলুপ্ত হবার কারণ কী, সেটি নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, রাক্ষুসে ক্ষিধেই ছিল অতিকায় এই প্রাণীদের বিলুপ্তির কারণ। ২.৬ মিলিয়ন বছর আগে সমুদ্রের খুব দ্রুত পরিবর্তন হতে শুরু করে এবং স্বাভাবিক খাদ্যের যে রসদটা মেগালোডনদের দরকার ছিল, তা তারা পায়নি। অন্তত এক তৃতীয়াংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিলুপ্তির কারণ ছিল এটি এবং মেগালোডনদের খাবার প্রাপ্তির জন্যও সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

তাছাড়া পর্যাপ্ত খাবার পাবার পর হঠাৎ করে যদি সেখানে টান পড়ে, সেটি সহ্য করা অতিকায় এই প্রাণীদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাছাড়া নিজের খাবার যোগানোর জন্য একটি মেগের লড়াই করতে হতো আরেকটি মেগের সাথে। শুধুমাত্র বেঁচে থাকবার জন্যই নয়, সাগরের তাপমাত্রার সাথে নিজের শরীরের তাপমাত্রা মানানসই করে রাখবার জন্যও তাদের বিপুল পরিমাণে খাবারের প্রয়োজন ছিল। 

ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা এবং ভারতীয় সমুদ্রগুলোর কাছে মেগালোডনদের দেখা মিলত। তবে প্লাইওসিন যুগে এসে হঠাত করেই তাদের আনাগোনা একটু বেশি বেরে যায় এবং আস্তে আস্তে তারা খাবারের খোঁজে উত্তর আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ান উপকূলগুলোতে এসে ভিড় জমানো শুরু করে।
 
মেগালোডন ছিল দ্রুতগতিসম্পন্ন: 

শুধুমাত্র আকারেই অতিকায় নয়, মেগালোডনরা ছিল দ্রুতগতিসম্পন্ন প্রাণী। ১৯২৬ সালে এম লেরিশ নামক একজন গবেষক মেগালোডনদের সম্পর্কে একটি চমৎকার গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। একটি মেগালোডনের ভার্টেব্রাল কলাম থেকে তিনি প্রায় ১৫০টি ভার্টেব্রাল সেন্ট্রা আবিষ্কার করেন। অতিকায় এই হাঙর সম্পর্কিত আরো কিছু তথ্যের উন্মোচন হলো গবেষকদের কাছে। চোয়ালের বিশালত্বের কারণে শিকারকে খুব সহজেই আঁকড়ে ধরতে পারত মেগালোডন। মেগদের এই বিষয়টিই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। শিকারকে একবার ধরে ফেলতে পারলে তাদের আর কোনো নিস্তার থাকত না।
 
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, প্রতি ঘণ্টায় মেগালোডন প্রায় ৩২ কিলোমিটার পর্যন্ত সাঁতরাতে পারত। বিশালাকার অনেক প্রাণীই মেগালোডনদের মতো এভাবে ছুটতে পারত না। লন্ডনের জুওলজিক্যাল সোসাইটির ডক্টর ডেভিড জ্যাকোবি বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘বর্তমান পৃথিবীতে টিকে থাকা অন্যান্য অনেক প্রাণীদের চাইতেই মেগালোডনদের আকার অনেক বড় ছিল। বিশালাকার এই প্রাণী নিজের শরীরের তুলনায় অনেক প্রাণীদের থেকেই জোরে ছুটতে পারত, যা তাকে করে তুলেছে অনন্য।’

বিগ টুথ মেগালোডন নামের কারণ: 

মেগালোডন নামের অর্থ হচ্ছে বিগ টুথ বা বিশালাকৃতির দাঁত। নামের মাহাত্ম্য মেগালোডনদের ফসিলের দিকে তাকালেই বেশ ভালো করে বোঝা যায়। এক একটি দাঁতের আকার প্রায় ৭-১৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতো এবং দন্তশিকারীরা প্রায়ই তক্কে তক্কে থাকেন কীভাবে মেগালডনের একটি দাঁত উদ্ধার করা যায়। ১৮ সেন্টিমিটার দাঁত পাওয়া রীতিমতো ভাগ্যের বিষয়। এই পর্যন্ত খুব বেশি একটা পাওয়াও যায়নি। তবে এই আকৃতির একটি দাঁত পেলে শূন্যের সংখ্যাটা যে অনেক বেশি বেড়ে যায়, তা বলাই বাহুল্য।

গ্রেট হোয়াইট শার্কের একটি দাঁত লম্বায় হয় মাত্র ৩ সেন্টিমিটার। মেগালোডনের দাঁতের কাছে এটি যে নিতান্তই শিশু, তা আর বুঝতে বাকি নেই কারও। মেগালোডনরা তাদের দাঁত হারাত শিকারের ওপর আক্রমণ করতে গিয়েই। এত জোরে হতভাগ্য প্রাণীটির ওপর তারা কামড় বসাত যে প্রচণ্ড চাপের কারণে নিজেদের দাঁতই খুইয়ে বসতে হতো তাদের। 

মেগালোডনদের দাঁতের সারি ছিল পাঁচটি, তাই একটি দুইটি দাঁত হারালে খুব বেশি চিন্তাও করতে হতো না তাদের। অনলাইনে বিক্রি হওয়া মেগালোডনদের দাঁত পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে যে বেশিরভাগ সময়েই তাদের দাঁত ভেঙে গিয়েছে শিকারের ওপর প্রচণ্ড কামড় বসানোর ফলে।
 
শেষ কবে দেখা গিয়েছে মেগালোডন:

পৃথিবীর পাঁচটি বড় সমুদ্র প্রায় ৭১ শতাংশ স্থলভাগ দখল করে রেখেছে এবং সেখানে পানির পরিমাণ প্রায় ১.৩ বিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার। আধুনিক সোনার প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা খুব বেশি অংশ জানতে পারিনি। সাগরতলের অতলে কী রয়েছে, তা এখনও সব জেনে উঠতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। ১৯২৮ এবং ১৯৩৩ সালে নিউজিল্যান্ডের নজিওরা নামক স্থানে প্রায় ৪০ ফিট দীর্ঘ একটি হাঙর দেখা গিয়েছিল। বর্ণনা অনুযায়ী মনে হয় যে এটি একটি মেগালোডন ছিল।
 
১৯১৮ সালের দিকে অস্ট্রেলিয়ান প্রকৃতিবিদ ডেভিড জি স্টিড নিউ সাউথ ওয়েলসের ব্রাউটন দ্বীপের কাছে কিছু জেলেদের সাথে কথা বলেছিলেন। জেলেদের মতামত অনুযায়ী, নীল তিমির আকৃতির একটি অতিকায় হাঙর হঠাত করে আবির্ভুত হয় এবং সকল টোপ এক নিমিষেই সাবাড় করে চলে যায়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাছটি যখন পানিতে এসে তাদের নৌকার সামনে ঘুরপাক খাচ্ছিল, দেখে মনে হচ্ছিল যেন বিশাল বড় এক পেল্লায় কিছু একটা ফোটানো হচ্ছে। এতটাই ভয় তারা পেয়েছিল যে পরবর্তীতে আর পানির কাছে যায়নি। তবে এসব প্রমাণ পাবার পরেও বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে আজ থেকে প্রায় ২.৬ মিলিয়ন বছর আগেই পৃথিবী থেকে মেগালোডন বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

মেগালোডন খুব অপরিচিত ছিল না:

সমুদ্রের প্রায় সর্বত্রই মেগালোডনদের দেখা মিলত। উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, পুয়ের্টো রিকো, কিউবা, জ্যামাইকা, ক্যানারি দ্বীপ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান, মালটা, গ্রেনাডা, ভারত ইত্যাদি অঞ্চলের সমুদ্রগুলোতে পাওয়া ফসিলগুলো থেকে অন্তত এই ধারণাটিই হয় যে মেগালোডনরা পৃথিবীর সর্বত্রই বিচরণ করত। সমুদ্রের অতলে যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার থাকত, তাহলে আপনি বাজি ধরতে পারেন যে সেখানে মেগালোডনের অস্তিত্ব ছিল। সাধারণত তাদের আয়ুষ্কাল ২০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে তবে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার থাকলে এরচেয়েও বেশি বছর বাঁচত তারা।
 
হোমিওথার্মিক প্রাণী হবার কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রার সাথে তারা নিজেদের শরীরের তাপমাত্রা মিলিয়ে নিতে পারত ফলে যেখানে খুশি সেখানে বিচরণ করতে কোনো সমস্যা হতো না মেগদের।
 
পৃথিবীর বুকে বিচরণ করা এই প্রাণী বিজ্ঞানীদের মতে বিলুপ্ত হয়েছে আরো হাজার বছর আগেই। তবে কোনো কথাকেই শেষ হিসেবে ধরে থাকা উচিত হবে না হয়ত। ২০০৫ সালেও ইয়েতি কাঁকড়া পাওয়া গিয়েছিল সর্বশেষ। এই ফিচারটি যখন আপনি পড়ছেন, তখনও হয়ত সমুদ্রের গহীন অতলে বিশালাকার একটি মেগালোডন শিকারের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কে জানে! 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

ডেইলি-বাংলাদেশ/এম ইউ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!