নজরুলের স্মৃতিমাখা সেই বটগাছটি আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে, এতদিনেও কবির স্মৃতিধন্য সেই বটগাছটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাও আনতে দৃশ্যমান কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। অযত্নে-অনাদরে পড়ে থাকা সেই বটগাছটি দেখলে যে-কেউই ভাববে, হয়ত এই প্রতিষ্ঠান নজরুলের ব্যাপারে উদাসীন। বস্তুত তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির পরতে-পারতে মিশে আছে নজরুলের স্মৃতি, বিদ্রোহী কবির ছোঁয়া। অবকাঠামো থেকে শুরু করে সিলেবাস, গবেষণা কিংবা পরিবহন, কোথাও বিস্মৃত হয়নি নজরুল।

.png)
অবকাঠামো:
সবার শুরুতে বলতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণই হয়েছে কবির নামে। এই কাজই কবির স্মৃতিকে চির জাগরূক রাখার অনন্য প্রচেষ্টা। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দুটি আবাসিক হলের নামকরণ হয়েছে কবির দুইটি কাব্যগ্রন্থ থেকে। অগ্নিবীণা ও দোলনচাঁপা। বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মেডিকেল সেন্টারটির নাম ‘ব্যথার দান’। যেটি নজরুলের একটি গল্পগ্রন্থ। সবুজে ঘেরা মনোরম পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র যে ক্যাফেটেরিয়াটি রয়েছে, তার নাম ‘চক্রবাক’। এটি তার একটি অমর কাব্যগ্রন্থ। বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন করা অতিথিদের থাকার জন্য সম্প্রতি নির্মিত হয়েছে ‘সেতুবন্ধ’ নামের একটি গেস্টহাউস। যেটি নজরুল রচিত একটি নাটিকার নাম। এছাড়াও রয়েছে ‘চন্দ্রবিন্দু ক্যাফে’, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ পঙ্ক্তি থেকে নির্মিত হয়েছে জয়ধ্বনি মঞ্চ। যেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ও সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের মাঝামাঝি অবস্থিত।
পরিবহন:
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ময়মনসিংহ শহরের দূরত্ব প্রায় ২৪ কি.মি। অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ময়মনসিংহ শহর থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করেন নিয়মিত। এজন্য ব্যবহৃত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাস ও মিনিবাস। এই বাসগুলোর নামকরণেও রয়েছে নজরুল স্মৃতির ছোঁয়া। ঝিলিমিলি, বিষের বাঁশি, বিদ্রোহী, প্রলয়শিখা, রণভেরি, নতুন পথিক, দূরের বন্ধু- ইত্যাদি হচ্ছে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের নাম৷
সিলেবাস:
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি বিভাগে নজরুল বিষয়ক বাধ্যতামূলক একটি কোর্স পড়ানো হয়। এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ থেকে প্রকাশিত হয়েছে এ বিষয়ের একটি টেক্সট-বুক। যেটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবি পরিবারের সদস্যবর্গের প্রতি।
গবেষণা:
নজরুলের জীবন ও কর্ম এবং দেশবিদেশের অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে নজরুলের তুলনা, সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য ও সামগ্রিক বিষয়াদি নিয়ে বিস্তৃত গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়েছে ইন্সটিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ। এখান থেকে প্রতি বছর অনেক শিক্ষার্থী গবেষণার জন্য বৃত্তি পান।

বৃত্তি ও পদক:
কবি নজরুলের পরিবারের দুই সদস্যের নামে এখানে চালু আছে দুইটি বৃত্তি। নজরুলের জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা ও ভূমিকা রাখা ব্যক্তিকে প্রতিবছর দেওয়া হয় নজরুল পদক।
ভাস্কর্য:
বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্নিবীণা হলের ঠিক পেছনেই স্থাপন করা হয়েছে নজরুল ভাস্কর্য। যেটি নজরুলের স্মৃতির এক অনন্য ধারক। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র স্মৃতিস্তম্ভটির নাম ‘চির উন্নত মম শির’। যেই লাইনটি কবির বিদ্রোহী কবিতা থেকে নেয়া। এখানে রয়েছে ‘অঞ্জলি লহ মোর’ ভাস্কর্যও।
এছাড়াও প্রতিবছর নজরুল জন্মজয়ন্তী ও মৃত্যুবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে এখানে জমে ওঠে উৎসব। সভা-সেমিনার থেকে শুরু করে বইমেলারও আয়োজন করা হয় এখানে।
এভাবেই এখানকার প্রায় দশ হাজার শিক্ষক-কর্মকর্তা-শিক্ষার্থীরা দিন যাপন করছে নজরুলের আবহকে সঙ্গী করে। এতে তাদের মননে নজরুলের প্রতি মোহ ও ভালোবাসা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেই মনে করেন অনেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী মো. সজীব বলেন, ‘আমাদের বিদ্রোহী কবি নজরুলকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রান্তে ধারণ করা হয়েছে। যেদিকেই তাকাই শুধু নজরুলময়। এটি আমাদের হৃদয়ে নজরুলপ্রীতি বাড়িয়ে দেয়। ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত রেখে নতুন আবাসিক ভবনগুলোর নামকরণও এই আঙ্গিকে করা হবে বলে প্রত্যাশা করি।’