ঢাকা,  বুধবার   ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

দরিদ্রতার সঙ্গে লড়েই আনিছুর হতে চান ইঞ্জিনিয়ার

ইউনুছ আলী আনন্দ, কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ১৫:০০, ৯ জুন ২০২০
দরিদ্রতার সঙ্গে লড়েই আনিছুর হতে চান ইঞ্জিনিয়ার
ফুফা-ফুফুর মাঝে আনিছুর

নিরক্ষর বাবার ঘরে জন্ম নিয়েও শিক্ষার আলোয় জীবনকে আলোকিত করার স্বপ্ন বুকে লালন করে চলেছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউপির মলিকার কুটি গ্রামের অটোরিকশা চালক ইউনুছ আলীর ছেলে অদম্য মেধাবী আনিছুর রহমান।

লেখা পড়ার করার প্রতি প্রবল ইচ্ছায় নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে তার ফুফুর বাড়ির আশ্রয়ে থেকে লেখাপড়া করে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন।

ফুলবাড়ী জছিমিঞা মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের কারিগরি ভোকেশনাল শাখা থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেন। ফুফু মরিয়ম বেগমের ছোট সংসারের ছোটখাটো কাজ করার মাঝে লেখা পড়া চালিয়ে আনিছুর রহমানের এ জিপিএ-৫ পাওয়ার খবরটি তার বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও এলাকাবাসীকে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

আনিছুর রহমানের বয়স যখন পাঁচ বছর তখন তার বা ইউনুছ আলী ও মা আঞ্জু বেগম অভাবের তাড়নায় ভারত সীমান্তের কাঁটা তার পেড়িয়ে দিনমজুরের কাজ করতে পাড়ি জমায় দিল্লীর ইটভাটায়। তারা এ সময় একমাত্র শিশু ছেলে আনিছুরকে দিয়ে যান ফুফু মরিয়ম বেগমের হাতে।

ফুফুর বাড়িতে বড় হতে থাকে আনিছুর রহমান। ছোট হলেও ফুফুর সংসারে আনিছুরকে বিভিন্ন কাজ করতে হয়। এরমধ্যে ফুফু মরিয়মের বড় মেয়ে মাধুরী আক্তার মিতির সঙ্গে লেখাপড়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেন আনিছুর। অক্ষরজ্ঞান জানা আনিছুরের ফুফু মরিয়ম বেগমও কার্পণ্য না করে আনিছুরকে পড়ালেখা করার তাগিদ দিকে থাকেন।

অনিছুরের রেখাপড়া করার প্রবল ইচ্ছায় ফুফু মরিয়ম স্থানীয় পানিমাছকুটি মডেল সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন আনিছুরকে। এই বিদ্যালয় থেকে আনিছুর রহমান জিপিএ-৫ পেয়ে পিএসসি পরীক্ষায় পাস করে। পরে ফুলবাড়ী জছিমিঞা মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। এখান থেকেও মেধা তালিকায় জেএসসি পাস করে আনিছুর।

পরে ফুলবাড়ী জছিমিঞা মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের কারিগরি ভোকেশনাল শাখায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের সঙ্গে জিপিএ-৫ অর্জন করে আনিছুর। জীবন স্বপ্নের একটি সিঁড়ি এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর আনিছুরের চোখে মুখে এখন দেখা গেছে একজন আলোকিত মানুষ হওয়ার দৃঢ়তা।

আনিছুরের সঙ্গে তার গরিব বাবা-মা ও আশ্রয়দাতা ফুফু-ফুফাও আনিছুরকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার স্বপ্ন দেখছেন।

আনিছুরের বাবা ইউনুছ আলী বলেন, আমি একজন অসহায় মানুষ লেখাপড়া করার ভাগ্য আমার না হওয়ায় ছেলে আনিছুর রহমানকে শিক্ষার আলোয় শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখি। এ জন্য অভাবের তাড়নায় দিল্লীতে ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতে যাওয়ার সময় পাঁচ বছরের একমাত্র ছেলে আনিছুরকে বোন মরিয়মের বাড়িতে রেখে যাই। আমার বোন মরিয়ম ছেলেটাকে ভালো করে দেখাশুনা করায় আমার ছেলেটি আজ লেখাপড়া করে আমার মনে খুশি এনে দিয়েছে। আমি লেখাপড়া করতে না পারলেও ছেলের লেখাপড়ার সুনামে আমার বুক ভরেছে। আনিছুরকে মানুষের মতো মানুষ করতে সবার সহযোগিতা চাই।

আনিছুরের ফুফু মরিয়ম বেগম বলেন, আমার বড় মেয়ে মাধুরী আক্তার মিতি মেধাবী। সে পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসিতে জিপিএ-৫ পায়। সে দিনাজপুরে নার্সিং কলেজে লেখাপড়া করছে। আনিছুর আমার ভাইয়ের ছেলে। সে আমার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করেও এবার এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। 

মরিয়ম বেগম আরো বলেন, আমি তাকে আমার মেধাবী মেয়ের মতো করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। আমার এই প্রচেষ্টায় আনিছুর এবার এসএসসিতে জিপিএ-৫ পায়। আমি গরিব হলেও আমার মেয়ে মাধুরী আক্তার মিতি ও ছেলে হিসেবে আনিছুরের জীবন উজ্জ্বল করার চেষ্টা চালিয়ে যাবো। এ সময় তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন। 

আনিছুরের ফুফা আব্দুর মোন্নাফ বলেন, আনিছুরকে আমরা নিজ সন্তানের মতো দেখেছি। এসএসসিতে সে জিপিএ-৫ পেয়ে আমাদের ধন্য করেছে। সে মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশ জাতির সেবা করবে। গরিব বাব-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে এই প্রত্যাশা করছি।

আনিছুরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফুলবাড়ী জছিমিঞা মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবেদ আলী খন্দকার বলেন, আনিছুর রহমান কারিগরি শিক্ষাকে ভালোবেসে আমার প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়ায় সে নিঃসন্দেহে অদম্য মেধার অধিকারী। আমি তার জীবনের উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করছি। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা করা প্রয়োজন।

আনিছুর রহমান বলেন, আমার জন্ম গরিব পরিবারে। ফুফা-ফুফুর সহযোগিতায় আমি কারিগরি ভোকেশনাল শাখা থেকে এবার এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছি। কষ্ট করে হলেও রুটিন মতো লেখাপড়া করে এটা সম্ভব হয়েছে। 

আনিছুর আরো বলেন, আমি ভবিষ্যতে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ও পরে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই। আমার স্বপ্ন দেশ ও মানুষের সেবা করা। আমার বাবা একজন অটোরিকশা চালক। আমার লেখাপড়ার খরচ চালানো তার পক্ষে অনেকটা অসম্ভব হবে। তাই আমি আমার স্বপ্নপূরণে দেশ-বিদেশের স্ব-হৃদয় মানুষের সহযোগিতা চাচ্ছি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএইচ/জেডএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!