ঢাকা,  রোববার   ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

সিলেটে জামায়াতের রাজনীতিতে কোন্দলের বলি মাওলানা লোকমান

সিলেট প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৩:৫১, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
সিলেটে জামায়াতের রাজনীতিতে কোন্দলের বলি মাওলানা লোকমান
মাওলানা লোকমান আহমদ। ছবি: সংগৃহীত

সিলেট জেলা জামায়াতে ইসলামীর অন্দরে ক্ষমতা ও প্রভাবের দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলেও, ক্ষমতার মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দলীয় সর্বোচ্চ মর্যাদা বা ‘রুকনিয়াত’ হারিয়েছেন সিলেট জেলা জামায়াতের প্রভাবশালী নেতা মাওলানা লোকমান আহমদ। শুধু তা-ই নয়, সদ্য অনুষ্ঠিত জেলা আমীর নির্বাচনের ভোটার তালিকা থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে তাঁর নাম। এই আকস্মিক পদস্খলনে সিলেট রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম চাঞ্চল্য ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ৭ সেপ্টেম্বর। মালিক সমিতির ব্যানারে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা সেবায় অনিয়ম, অবহেলা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদী মিছিল বের করা হয়। ওই মিছিলে নেতৃত্ব দেন মাওলানা লোকমান আহমদ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মিছিলটিতে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার সাধারণ মানুষের সমাগম ঘটে, যা সিলেটর গণরাজনীতিতে জামায়াতের অন্য কোনো নেতার পক্ষে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এমন শোডাউন করার নজির বিরল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে এই জনপ্রিয়তাই যেন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। দলীয় অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, ৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি পালনের আগে জেলা আমীরের মৌখিক বা সবুজ সংকেত থাকলেও, মহানগর জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও আসন্ন সিলেট সিটি করপোরেশন মেয়র প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করে এই ইস্যুটি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। মহানগর জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে দাঁড়ানো এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জামায়াতের জেলা ও মহানগর শাখার মধ্যে কোন্দল চরমে পৌঁছায়।

প্রাপ্ত তথ্য ও দলীয় অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী, সিসিক মেয়র প্রার্থিতা ও রাজনৈতিক সমীকরণে মাওলানা লোকমান আহমদকে ঘিরে এক ধরনের বলয় তৈরি হয়েছিল। ‘ছাত্রশিবির মহানগরী’ নামক একটি ফেসবুক আইডির পোস্ট এবং দলীয় সূত্র থেকে জানা যায়, সিসিক নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় প্যানেল গঠন নিয়ে কেন্দ্রের সাথেও স্থানীয় নেতৃত্বের টানাপোড়েন তৈরি হয়। বিশেষ করে, অঞ্চল পরিচালক ও কেন্দ্রীয় অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের বিশেষ ভূমিকা ও প্রচণ্ড চাপের মুখেই মূলত মাওলানা লোকমানকে কোণঠাসা করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।

মূলত হাসপাতালের দুর্নীতিবিরোধী ওই সফল কর্মসূচির পরই শুরু হয় দৃশ্যপট বদলানোর খেলা। গত ১০ সেপ্টেম্বর (অন্য একটি সূত্রে ৮ সেপ্টেম্বর) নগরীর কুদরতউল্লাহ মার্কেটস্থ জেলা জামায়াত কার্যালয়ে জরুরি কর্মপরিষদ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জেলা আমীরের উপস্থিতিতে ওই বৈঠকে লঘু পাপে গুরু দণ্ডের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে মাওলানা লোকমানের রুকনিয়াত সাময়িক স্থগিত করা হয়। অঞ্চল পরিচালক ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মনোরঞ্জন এবং অভ্যন্তরীণ আধিপত্য টিকিয়ে রাখতেই এই হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

এদিকে এ ঘটনার সত্যতা ও গভীরতা নিয়ে যখন ধোঁয়াশা তৈরি হচ্ছিল, ঠিক তখন সিলেট জামায়াত ঘরানার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট কবির আহমদ সোহেল ২৫ অক্টোবর ভোররাতে নিজের ফেসবুক আইডিতে ‘না বোঝে কেউ মন্তব্য করবেন না’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস শেয়ার করেন। ওই পোস্টে তিনি সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াতের ক্ষমতার টানাপোড়েন, ১৯ নম্বর আসনে ফলাফল বিপর্যয়, সিসিক মেয়র প্রার্থিতায় হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং মাওলানা লোকমানকে লঘু পাপে গুরু দণ্ড দেওয়ার নেপথ্য কারণগুলো তুলে ধরেন।

পোস্টদাতার মন্তব্য অপশনেও দলের অনেকেই ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে লোকমান আহমদের পক্ষে অবস্থান নেন এবং বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের পোস্ট আসার পর থেকেই পুরো ঘটনাটি নিছক দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, বরং একটি পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র-এই ধারণাই আরও ঘনীভূত হয়।

ঘটনার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সিলেট জেলা জামায়াতের আমীর ও সম্পাদকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান। দায়িত্বশীল কোনো নেতাই এই স্পর্শকাতর বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/সিলেট/জেডআই
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!