ঢাকা,  শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

সিরাজগঞ্জের পিটুলি মাংসে মেহমানদারির ঐতিহ্য, সুনাম দেশজুড়ে

গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী
প্রকাশিত: ১১:৪০, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
সিরাজগঞ্জের পিটুলি মাংসে মেহমানদারির ঐতিহ্য, সুনাম দেশজুড়ে
পিটুলি রান্না করা হচ্ছে। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পিটুলি মাংসের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। বিয়ে, দোয়া মাহফিল কিংবা মেজবানি, নানা সামাজিক আয়োজনে এই খাবার যেন বাড়তি আকর্ষণ। দূরদূরান্ত থেকে নিমন্ত্রণে আসা আত্মীয়স্বজনেরও থাকে বিশেষ আবদার, খাবারের তালিকায় পিটুলি মাংস চাই-ই চাই। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই রন্ধন ঐতিহ্য স্থানীয় মানুষের মেহমানদারির বিশেষ পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।

পিটুলি মাংসের প্রচলন ঠিক কত বছর আগে শুরু হয়েছিল, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেন না স্থানীয় প্রবীণরাও। তাঁদের ভাষ্য, বাপ-দাদার মুখে এই খাবারের প্রচলনের গল্প শুনেছেন তাঁরা। সেই থেকে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে পিটুলি রান্না ও পরিবেশনের রীতি। সময়ের সঙ্গে এর জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছোনগাছা, বাগবাটি ও রতনকান্দি ইউনিয়নসহ কাজিপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পিটুলি মাংসের আয়োজন দেখা যায়। কোনো এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুর পর চল্লিশা, হজ পালনে যাওয়ার আগে দোয়ার আয়োজন কিংবা আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখতে আয়োজিত মেজবানিতে এই খাবার পরিবেশন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানকে ঘিরে এলাকার মানুষের মধ্যে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

সামাজিক বন্ধনের অনন্য আয়োজন

পিটুলি মাংসের মেজবানির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, আয়োজক গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির নারী-পুরুষ ও শিশুকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়। খাবার তৈরি থেকে শুরু করে অতিথিদের পরিবেশন, সব কাজেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন গ্রামের মানুষ। সাধারণত এসব কাজে তাঁরা কোনো পারিশ্রমিক নেন না। সম্মিলিত সহযোগিতায় সম্পন্ন হয় পুরো আয়োজন।

অনুষ্ঠানের আগে অতিথিদের তালিকা তৈরি করা হয়। সেখানে এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তি, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ও আত্মীয়স্বজনের নাম থাকে। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজনটি হয়ে ওঠে সর্বজনীন। শুধু খাবার পরিবেশন নয়, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করাও এ আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

আগে অতিথিদের খাবার পরিবেশনের জন্য বিভিন্ন গ্রাম থেকে কলাপাতা সংগ্রহ করা হতো। ভাত ও মাংস কলাপাতায় পরিবেশনের সেই রীতি ছিল আয়োজনের পরিচিত দৃশ্য। তবে সময়ের পরিবর্তনে এখন অনেক জায়গায় প্লাস্টিকের থালা ও গ্লাস ব্যবহার করা হচ্ছে।

রান্নার প্রস্তুতি শুরু আগের দিন থেকেই

পিটুলি মাংস রান্নার প্রস্তুতি শুরু হয় অনুষ্ঠানের আগের দিন বিকেল থেকে। বড় বড় ডেকচিতে রান্নার জন্য তৈরি করা হয় একাধিক চুলা। চুলার নিচে চট ব্যবহারসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন আয়োজকেরা। বাবুর্চির নির্দেশনা অনুযায়ী মাংস কেটে রান্নার উপযোগী করা হয়। এরপর মাঝরাত থেকে শুরু হয় মূল রান্না।

পিটুলি তৈরিতে সাধারণত গরু বা মহিষের মাংসের সঙ্গে ব্যবহার করা হয় আতপ চালের গুঁড়া। রান্নার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে মাংসের সঙ্গে চালের গুঁড়া মেশানো হয়। এর ফলে খাবারে আসে স্বতন্ত্র ঘনত্ব ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্বাদ। তবে এই রান্নায় সঠিক উপকরণ ব্যবহারের পাশাপাশি অভিজ্ঞতা ও কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ।

রান্না শেষ হওয়ার পর ফজরের নামাজের পর থেকে অতিথিদের খাওয়ানো শুরু হয়। সকাল ১০টার মধ্যে সাধারণত খাবার পরিবেশন শেষ করা হয়। পরিবেশনের জন্য আলাদা লোক দায়িত্ব পালন করেন। কেউ ভাত দেন, কেউ পিটুলি মাংস পরিবেশন করেন, আবার কেউ খাবার শেষে ঘোল পরিবেশন করেন। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, অতিথিদের একবারেই ভাত ও পিটুলি মাংস দেওয়া হয়। খাওয়া শেষে পরিবেশন করা হয় ঘোল।

পুরো আয়োজনের সময় বাড়ির প্রধান বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি খাবার সরবরাহ ও পরিবেশনের বিষয়টি তদারক করেন। যাতে কোনো অতিথি খাবার পেতে সমস্যায় না পড়েন, সেদিকেও নজর রাখা হয়।

মেহমানদের আবদার পিটুলি মাংস

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার পিপুলবাড়িয়া এলাকার আবুল হোসেন (৭০) বলেন, পিটুলি মাংসের আকর্ষণ এখন আর শুধু সিরাজগঞ্জের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো মেহমান এলাকায় এলে তাঁদের কাছে পিটুলি মাংস খাওয়ার আবদার থাকে। এই খাবার ছাড়া দাওয়াত যেন অনেকের কাছে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

কাজিপুরের মাইজবাড়ি এলাকার আয়নাল হক বলেন, তাঁদের এলাকার পিটুলি মাংসের সুনাম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছেছে। বাইরে থেকে কেউ এলাকায় এলে পিটুলি খাওয়ানোর অনুরোধ করেন। এমনকি ঢাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও কাজিপুর থেকে বাবুর্চি নিয়ে গিয়ে পিটুলি মাংস রান্না করানো হয় বলে জানান তিনি।

স্বাদ ধরে রাখার পেছনে বাবুর্চির কৌশল

পিটুলি মাংস রান্নায় অভিজ্ঞ বাবুর্চিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাবুর্চি হোসেন আলী বলেন, এ খাবার তৈরিতে আতপ চালের তাজা গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। চাল ঢেঁকিতে গুঁড়া করার প্রচলিত পদ্ধতিও রয়েছে। মাংসে মেশানোর সময় চালের গুঁড়া ভেজা থাকা জরুরি। রান্নার বিভিন্ন ধাপে নির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করতে হয়।

তাঁর মতে, পিটুলি মাংসের স্বতন্ত্র স্বাদ ও গুণগত বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে এসব নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন। অভিজ্ঞ বাবুর্চিরা দীর্ঘদিনের চর্চা ও পূর্বসূরিদের কাছ থেকে শেখা পদ্ধতি অনুসরণ করেই এই খাবার তৈরি করেন। রান্নার উপকরণ নির্বাচন থেকে শুরু করে গুঁড়া মেশানোর সঠিক সময়, প্রতিটি ধাপেই সতর্কতা জরুরি।

সিরাজগঞ্জের পিটুলি মাংস তাই কেবল একটি খাবার নয়, এটি স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অতিথিপরায়ণতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক সম্প্রীতির গল্প। সময়ের পরিবর্তনে পরিবেশনের ধরন বদলালেও পিটুলি মাংসকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ ও আবেগ এখনো অটুট। সেই ঐতিহ্যই সিরাজগঞ্জের এই বিশেষ খাবারকে দেশের নানা প্রান্তে পরিচিত করে তুলছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/সিরাজগঞ্জ/এমকে
ট্যাগ: সিরাজগঞ্জ
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!