ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

ঘোড়ার গাড়িতে শিক্ষকের রাজকীয় বিদায়

আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৮:০২, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
ঘোড়ার গাড়িতে শিক্ষকের রাজকীয় বিদায়
আখাউড়ায় ঘোড়ার গাড়িতে করে শিক্ষক অলক কুমার চক্রবর্তীর রাজকীয় বিদায়।ছবি ডেইলি বাংলাদেশ

বিদ্যালয়ের সামনে একটি ঘোড়ার গাড়ি ফুল দিয়ে প্রস্তুত রাখা। বিদ্যালয় মূল ভবন থেকে ঘোড়ার গাড়ি পর্যন্ত দাঁড়িয়ে আছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। কিছুক্ষণ পর বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে এলেন এক শিক্ষক। যাচ্ছেন সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়ির দিকে। এমন সময় দাঁড়িয়ে থাকা কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ফুল ছিটিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষককে। পরে শিক্ষক সুসজ্জিত সেই ঘোড়ার গাড়িতে উঠে বসেন।

এরপর সবাই তাকে শেষ বিদায় জানায়। এই ঘোড়ার গাড়িতে করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাকে পৌঁছে দিল বাড়িতে। এমন এক দৃশ্য দেখা যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের দেবগ্রাম সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। 

বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই বিদ্যালয়ের (ভারপ্রাপ্ত) প্রধান শিক্ষক অলক কুমার চক্রবর্তীর শেষ কর্মদিবস থাকায় তাকে বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

রাজকীয় বিদায় সংবর্ধনা পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে যান শিক্ষক অলক কুমার চক্রবর্তী। জাঁকজমকভাবে বিদ্যালয়ের সামনে থেকে সুসজ্জিত একটি গোড়ার গাড়িতে করে তাদের প্রিয় সহকর্মীকে বাড়িতে পৌঁছে দেন। বিদায়ী এই শিক্ষক অলক কুমার পৌর শহরের রাধানগর এলাকার প্রয়াত শিক্ষক অরুণ কুমার চক্রবর্তীর ছেলে।

বিদ্যালয়  সূত্রে জানা যায়, অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষক চাকুরির শুরু থেকে বিদায় পযর্ন্ত এই বিদ্যালয়ে ছিলেন। ১৯৯৩ সনে সহকারী শিক্ষক হিসাবে তার কর্ম জীবন শুরু হয়। এরপর ২০২৬ সনের জুনে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। টানা ৩৪ বছর চাকুরি শেষে এখান থেকেই তার বিদায় হয়।

কর্মদিবস শেষে এই শিক্ষকের জন্য বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। বিদায়ী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপসী রাবেয়া। প্রধান অতিথি ছিলেন ম‍াধ‍্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্ত  কুমিল্লা অঞ্চলের উপ পরিচালক মো: আমিনুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা শিক্ষা অফিসার মো: জাহাঙ্গীর আলম,উপজেলা শিক্ষা একাডেমিক  সুপার ভাইজার কফির উদ্দিন মাহমুদ। 

শুরুতে পাপড়ি ছিটিয়ে ও ফুলের মালা দিয়ে তাকে বরণ করে নেওয়া হয়। পরে বিদায়ী শিক্ষকের হাতে ক্রেস্টসহ বিভিন্ন উপহার তুলে দেন শিক্ষকসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যাক্তিরা। শেষে ফুল সজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে ওই শিক্ষকের রাজকীয় বিদায় সংবর্ধনা দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় গাড়ির পিছু পিছু বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও তার বাড়ি যান।

সহকর্মীরা জানান, তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান, সদালাপী ও দায়িত্বশীল একজন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের নিকট তিনি শুধু শিক্ষকই নন, পরামর্শদাতা ও প্রিয় মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো: জহিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের এই শিক্ষক খুবই ভালো একজন শিক্ষক ছিল। তিনি বিদ্যালয়ে খুবই সুন্দর করে পাঠদান করাতেন। আমাদেরকে খুবই আদর করতেন। কিভাবে বিদ্যালয় মুখি হওয়া যায় এবং পড়াশুনা ভালো হয় সব সময় তিনি আমাদেরকে বলতেন। পড়াশুনার ব্যাপারে সব সময় খোঁজ রাখতেন।

ইশরাত জাহান বলেন, আসলে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলেন। সব সময় শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নিতেন। বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় কিভাবে মনোযোগী করানো যায় তিনি খুবই তৎপর ছিলেন।

বিদায়ী শিক্ষক অলক কুমার চক্রবর্তী বলেন, আসলেই বিদায় বিষয়টা খুবই বেদনার আর কষ্টের। যার বিদায় দেওয়া হয় সে বুঝে তা যে কতো কষ্টের। কারণ সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের রেখে চলে যাওয়া খুবই কষ্টের। দীর্ঘ ৩৪ বছর এক জায়গাতে থেকেছি। এটা যেন আমার পরিবার হয়ে গেছে। তাই আমার খুবই কষ্ট হচ্ছে। চাকরি জীবনে আমি কখনও দায়িত্বে অবহেলা করেনি। সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। সহকর্মীদের সঙ্গে কখনো খারাপ আচরণ করেনি। সব সময় ভালো সময় কেটেছে। আমাকে এভাবে বিদায় জানাবে কখনো কল্পনাও করিনি। আমাকে যে সম্মান দেখানো হয়েছে এতে আমি অভিভূত। এটা আমার আমৃত্যু স্মরণ থাকবে। আমি চাই, সবাই ভালো থাকুক। মাঝে মধ্যে লেখাপড়ার খোঁজ নিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসবো। সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো: শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘বিদায় বড় কষ্টের তবুও মানতে হবে। আমাকেও এভাবে একদিন বিদায় নিতে হবে। একজন শিক্ষকের বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে তাকে সুসজ্জিত গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বিদায়ের কষ্ট কিছুটা কমানোর জন্যই এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন করা হয়। প্রতিটি শিক্ষকের বিদায় এমন হওয়া উচিত। তিনি দীর্ঘ সময়ে যে দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতা দেখিয়েছেন তা আমাদের সবার কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আখাউড়া/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!