ঢাকা,  রোববার   ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

বারাসাতের ঠিকানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে চায়ের দোকান, সেই ডিগ্রিতে শরণখোলায় চিকিৎসার অভিযোগ

বাগেরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৯:১৫, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বারাসাতের ঠিকানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে চায়ের দোকান, সেই ডিগ্রিতে শরণখোলায় চিকিৎসার অভিযোগ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতের একটি ঠিকানায় ‘দ্য ওপেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ফর কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিনস’ নামে কথিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিন ওই ঠিকানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ভবন, সাইনবোর্ড বা শিক্ষা কার্যক্রমের চিহ্ন না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেখানে একটি চায়ের দোকান রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

এদিকে, ওই প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি ব্যবহার করে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার পাঁচরাস্তা মোড়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিচতলায় চেম্বার করে রোগী দেখানোর অভিযোগ উঠেছে মাহামুদুল হাসানের বিরুদ্ধে। তার ব্যবহৃত ডিগ্রির বৈধতা এবং বাংলাদেশে চিকিৎসা দেওয়ার আইনগত অনুমোদন রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের দাবি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বারাসাতের হেলাবটতলায় কথিত বিশ্ববিদ্যালয়টির ঠিকানা সরেজমিনে যাচাই করা হয়। সেখানে কোনো একাডেমিক ভবন, সাইনবোর্ড, শিক্ষক-শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষা কার্যক্রমের দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও ওই নামে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা জানেন না বলে জানিয়েছেন।

Advertisement

অন্যদিকে, মাহামুদুল হাসান শরণখোলার পাঁচরাস্তা মোড়ে গ্রামীণ জেনারেল হাসপাতালের নিচতলায় চেম্বার করে রোগী দেখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার ব্যবস্থাপত্রে নিজেকে ‘এমবিবিএস এম’ এবং মেডিসিন, শিশু ও অর্থোপেডিক রোগে অভিজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তার চিকিৎসা কার্যক্রমের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বাংলাদেশে চিকিৎসা পেশা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নিবন্ধন বা অনুমোদন তার নেই। এ বিষয়ে ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর বাগেরহাটের সিভিল সার্জনকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগের পরও শরণখোলায় তার চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ফলে তার ব্যবহৃত ডিগ্রির বৈধতা এবং চিকিৎসা দেওয়ার অনুমোদন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।

এ ছাড়া ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মাহামুদুল হাসানের ডিগ্রি ও চিকিৎসা কার্যক্রম নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযান পরিচালনা করেছে বলে জানা গেছে।

মাহামুদুল হাসানের বিরুদ্ধে ভুয়া চিকিৎসক-সংক্রান্ত একটি মামলায় ১৯ দিন কারাভোগের পর এলোপ্যাথিক ওষুধ না লেখার মুচলেকা দিয়ে জামিনে বের হয়ে ফের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা যায়নি।

এদিকে, ডিগ্রি ও চিকিৎসা কার্যক্রমের বৈধতা নিয়ে অনুসন্ধানের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে মব সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ডিবিসি নিউজের বাগেরহাট প্রতিনিধি সৈকত মন্ডল আদালতে মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই তদন্ত করছে।

সাংবাদিকদের অভিযোগ, অনুসন্ধানের পর কয়েকজন কথিত কনটেন্ট নির্মাতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তির মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মূলধারার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে দিয়ে সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যদের নাম উল্লেখ করে মামলা এবং সাংবাদিকদের হেয় করতে মানববন্ধনের আয়োজনের অভিযোগও রয়েছে।

সাংবাদিকদের ভাষ্য, কাউকে হয়রানি করা নয়, বরং ব্যবহৃত চিকিৎসা ডিগ্রির বৈধতা এবং বাংলাদেশে চিকিৎসা দেওয়ার আইনগত অনুমোদন রয়েছে কি না তা যাচাই করতেই তারা অনুসন্ধান চালিয়েছেন। তবে অনুসন্ধানের পর মামলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা ও মানববন্ধনের ঘটনায় স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বারাসাতের হেলাবটলার স্থানীয় বাসিন্দা অমাল দাসসহ কয়েকজন জানান, ‘দ্য ওপেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ফর কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিনস’ নামে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা তারা কখনো শোনেননি। ওই ঠিকানায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা কার্যক্রমও তারা দেখেননি।

স্থানীয় বাসিন্দা রাকেশ কান্তি বলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থাকলে সেখানে ভবন, সাইনবোর্ড, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শিক্ষা কার্যক্রম থাকার কথা। কিন্তু ওই ঠিকানায় চায়ের দোকান ছাড়া তেমন কিছু দেখা যায়নি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।

স্বপন কুমার পাল বলেন, তাদের এলাকায় কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কেউ ভুয়া সনদ তৈরি করে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করা উচিত। ভারতের কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড হয়ে থাকলে তা দুই দেশেরই সুনামের জন্য ক্ষতিকর।

স্থানীয় বিজিপি নেতা গিতিশ মৃধার বলেন, তার জানামতে বারাসাতে ‘দ্য ওপেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ফর কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিনস’ নামে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। ভারতের কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ও কথিত সনদ ব্যবহার করে বাংলাদেশে কেউ চিকিৎসা দিয়ে থাকলে তা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আ.স. মাহবুবুল আলম বলেন, মাহামুদুল হাসানের বিষয়ে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বারাসাতের কথিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে চায়ের দোকান পাওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি বাংলাদেশে চিকিৎসা দেওয়ার অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গণমাধ্যমে একাধিকবার প্রতিবেদন প্রকাশ, সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনার পরও কীভাবে তার চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে এখন সেই প্রশ্নের উত্তর চায় সংশ্লিষ্ট মহল।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: বাগেরহাট
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!