ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

শিবগঞ্জে ৩০ কোটি টাকার সেতু নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা

জাহিদ হাসান মাহমুদ মিম্পা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ 
প্রকাশিত: ১৫:৩২, ২২ জুলাই ২০২৬
শিবগঞ্জে ৩০ কোটি টাকার সেতু নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা
বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমদ মন্টু সেতু। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমদ মন্টু সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার প্রায় তিন বছর পরও শেষ হয়নি। চলতি বছরের নভেম্বরে সেতুটি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের কথা থাকলেও এখনো প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। 

প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতুটির কাজ গত এক বছর ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। নির্মাণকাজ শুরুর দেড় বছরের মধ্যেই অন্তত চার দফা কাজ বন্ধ হয়েছে। ফলে উপজেলার মনাকষা, বিনোদপুর ও দুর্লভপুর—এই তিন ইউনিয়নের মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

জানা গেছে, শিবগঞ্জ উপজেলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মনাকষা, বিনোদপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের মানুষের চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হলো শিবগঞ্জ বাজার থেকে পাগলা নদীর এই সেতু। গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৯১-৯২ সালে ৯ জনের দুই একর ৩৯ শতক জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে একটি বেইলি সেতু নির্মাণ করা হয়।

Advertisement

তৎকালীন সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমদ মন্টুর উদ্যোগে নির্মিত ওই বেইলি সেতুটি দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার ছেলে সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল বেইলি সেতুর পাশেই নতুন সেতুর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন।

পল্লী সড়কের গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমদ মন্টু সেতুর উদ্বোধন করা হয়। ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৭২ দশমিক ৩০০ মিটার দীর্ঘ সেতুটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ কোটি ৯৮ লাখ ৭৭ হাজার ৩১৫ টাকা। প্রকল্প অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৪ নভেম্বর কাজ শেষ হওয়ার কথা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমদ মন্টু সেতু।সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্মাণাধীন সেতুর পাশের পুরোনো বেইলি সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তিন বছর আগে থেকেই এর প্রবেশমুখে ইটের পিলার নির্মাণ করে ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে মনাকষা ও দুর্লভপুরের ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনের জন্য ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার ঘুরে কানসাট সেতু ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।

জরাজীর্ণ, সরু ও ক্ষতিগ্রস্ত বেইলি সেতুতে সারাদিনই যানজট লেগে থাকে। স্টিলের পাটাতন কয়েক দফা ভেঙে পড়ার পর মেরামতের মাধ্যমে সচল রাখা হয়েছে সেতুটি। শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে সেতু পার হতে হয়। বিশেষ করে পরীক্ষার সময় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুর দুই পাশে ৩৫টি বাড়ি ও কয়েকটি দোকান থাকায় ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। নির্মাণসামগ্রী খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ মার্চ জেলা এলজিইডি অফিসের ০১-২০৯১-২০৯২ স্মারকে সাতজনকে সাত দিনের মধ্যে অধিগ্রহণকৃত জমি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে তারা জমি ছাড়েননি; বরং জেলা প্রশাসকের কাছে সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করেন।

সেতুর দুই পাশের ৩৫টি বাড়ি উচ্ছেদের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে দুইবার আবেদন করা হলেও এখনো উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়নি। নোটিশপ্রাপ্তদের দাবি, যথাযথ ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত তারা বাড়ি ছাড়বেন না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমদ মন্টু সেতু।স্থানীয়দের ভাষ্য, নির্মাণকাজের শুরুতে অনিয়মের অভিযোগে এলাকাবাসী বাধা দেন। পরে তদন্তের মাধ্যমে অনিয়ম সংশোধন করা হয়। প্রথমে প্রায় ৪৫ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে আবার কাজ শুরু হয়ে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রগতি হলেও বর্তমানে ভূমি অধিগ্রহণ ও বর্ষাজনিত কারণে কাজ আবারও বন্ধ রয়েছে।

একাধিক সূত্র জানায়, ১৯৯১-৯২ সালে বেইলি সেতু নির্মাণের সময় অধিগ্রহণ করা জমির ৯ জন মালিকের মধ্যে মাত্র দুজন ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন। বাকি সাতজন এখনো ক্ষতিপূরণ পাননি। দীর্ঘদিন ধরে তারা ওই জমিতে বসবাস করছেন। তাদের দাবি, ক্ষতিপূরণের অর্থ বুঝে পাওয়ার পরই তারা জায়গা ছাড়বেন।

দুর্লভপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম আজম বলেন, প্রশাসনের দাবি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে, জমির দাবিদাররা বলছেন, তাদের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। প্রশাসন ও ভূমি মালিকদের দীর্ঘসূত্রতার কারণে দুর্ভোগ বাড়ছে।

তিনি বলেন, উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল মনাকষা, বিনোদপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের প্রায় সোয়া দুই লাখ মানুষ, যার মধ্যে ভোটার রয়েছেন প্রায় এক লাখ ১৫ হাজার। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক সাহিন আলম বলেন, টিকটকার ও কিছু সাংবাদিক গুজব ছড়াচ্ছেন যে ঠিকাদার পালিয়ে গেছেন। প্রকৃতপক্ষে বন্যা, বৃষ্টি ও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণেই নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।

ঠিকাদার আব্দুল মান্নান বলেন, আমাদের কোনো গাফিলতি নেই। উচ্ছেদ কার্যক্রম দ্রুত শেষ হলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরো সেতুর কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।

দুর্লভপুরের মুদি ব্যবসায়ী শাহিন আলী বলেন, শিবগঞ্জ বাজার থেকে তার দোকানের দূরত্ব মাত্র তিন কিলোমিটার। কিন্তু ট্রাকে পণ্য আনতে এখন প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।

মনাকষার বাকরুলী বিশ্বনাথপুর গ্রামের হারুন অর রশিদ বলেন, জরুরি কাজে জেলা শহরে যাওয়ার সময় বেইলি সেতুর যানজটে আধা ঘণ্টা আটকে থাকার পর দুই কিলোমিটার হেঁটে শিবগঞ্জ শহরে পৌঁছান। ততক্ষণে যার সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল, তিনি চলে যান। তিনি বলেন, এই দুর্ভোগ শুধু আমার নয়, তিন ইউনিয়নের মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা।

শিবগঞ্জ সরকারি মডেল হাইস্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আতিক ইসলাম জানায়, সরু ও এক লেনের বেইলি সেতুতে দুটি অটোরিকশা একসঙ্গে পার হতে গেলেই যানজট সৃষ্টি হয়। অনেক সময় বিদ্যালয়ে সময়মতো পৌঁছানো যায় না। পরীক্ষার সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

নোটিশপ্রাপ্ত বাড়ির মালিক সুমাইয়া খাতুন বলেন, আমাদের সব কাগজপত্র ঠিক আছে। কিন্তু প্রশাসন এখনো জমির মূল্য নির্ধারণ বা ক্ষতিপূরণ নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয় ক্ষতিপূরণ ছাড়া ছাড়ব না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বাসিন্দাও বলেন, কষ্ট করে তৈরি করা বাড়ির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ না পেলে আমরা একচুলও সরব না।

শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী সাহিনুল ইসলাম বলেন, বর্ষার কারণে সেতুর মাঝের গুরুত্বপূর্ণ পিলারের কাজ আপাতত বন্ধ রয়েছে। তবে এ সময় অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ করা যেত, কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ শেষ না হওয়ায় সেটিও সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, সেতুর দুই পাশের জমি অধিগ্রহণ ও বাড়িঘর উচ্ছেদের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। দ্রুত এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে নির্মাণকাজও পুনরায় শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!