ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

রাতের পরিশ্রমে ভোরের ঝকঝকে রাজশাহী

মো. মমিনুল ইসলাম, রাবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৮:৫৭, ৪ জুলাই ২০২৬
রাতের পরিশ্রমে ভোরের ঝকঝকে রাজশাহী
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। রাজশাহীর সাহেব বাজারের সড়কজুড়ে নেমে এসেছে নতুন দিনের নীরবতা। কিছুক্ষণের মধ্যেই কর্মব্যস্ত মানুষে ভরে উঠবে শহর। অথচ রাতভর জমে থাকা কোনো আবর্জনার চিহ্ন নেই কোথাও। যেন রাতের অন্ধকারেই অদৃশ্য কোনো হাত শহরটিকে নতুন করে সাজিয়ে দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এমনই পরিচ্ছন্নতা আর পরিকল্পিত সৌন্দর্যের জন্য রাজশাহী পরিচিত হয়েছে দেশের ‘ক্লিন সিটি’ হিসেবে।

শহরের প্রধান সড়ক, ফুটপাত ও সড়ক বিভাজকজুড়ে সারি সারি বাহারি গাছ। সন্ধ্যা নামলেই লাল, নীল ও হলুদ আলোর সাজে অন্যরকম রূপ নেয় নগরী। পদ্মা নদীর তীরঘেঁষে লালন শাহ মঞ্চ, সিমলা পার্ক, আই-বাঁধ, টি-বাঁধ, বড়কুঠিসহ নানা স্থাপনা রাজশাহীর সৌন্দর্যে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। শহররক্ষা বাঁধের দুই পাশের সবুজ বৃক্ষরাজি যেন নগরজীবনের কোলাহলে এক টুকরো স্বস্তির ঠিকানা।

রাজশাহী সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ১৯৯১-৯২ সাল থেকে শুরু হওয়া বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত নগরজুড়ে এক লাখের বেশি গাছ লাগানো হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই সবুজায়ন উদ্যোগই আজ রাজশাহীকে দেশের অন্যতম সবুজ নগরীতে পরিণত করেছে।

Advertisement

তবে এই পরিচ্ছন্ন নগরীর পেছনে রয়েছে একদল নীরব কর্মযোদ্ধার নিরলস পরিশ্রম। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার পর থেকেই শুরু হয় তাদের কর্মব্যস্ততা। রাতভর ঝাড়ু, ময়লা সংগ্রহ আর বর্জ্য অপসারণের কাজ শেষে ভোর হওয়ার আগেই তারা শহরকে নতুন দিনের জন্য প্রস্তুত করে তোলেন।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন বলেন, রাজশাহীকে ক্লিন সিটি বলা হয়—এটা আমাদের সবার জন্য গর্বের বিষয়। তবে শুধু সিটি করপোরেশন নয়, নগরবাসীর সহযোগিতা ছাড়া এ সাফল্য সম্ভব হতো না। এজন্য রাজশাহীর মানুষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তিনি জানান, নগরী পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রতিদিন দৈনিক মজুরিভিত্তিক প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করেন। তাদের জন্য হ্যান্ডগ্লাভস, মাস্ক ও গামবুটসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়।

শেখ মো. মামুন আরও বলেন, প্রতিদিন নগরীতে ৩৫০ থেকে ৪০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। আম ও অন্যান্য ফলের মৌসুমে তা বেড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ টন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার। ওয়েস্ট টু ফার্টিলাইজার ও ওয়েস্ট টু বায়োগ্যাস প্রকল্পের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। 

নগরীর এক নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, প্রতিদিন রাত ৮টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত কাজ করি। শহর পরিষ্কার রাখাই আমাদের দায়িত্ব। মানুষ যখন সকালে পরিষ্কার শহর দেখে, তখন আমাদেরও ভালো লাগে। দশ বছর ধরে পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত কর্মী মিকাইল বলেন, বিনোদপুর বাজার এলাকায় কাজ করি। আগের তুলনায় এখন ময়লা অনেক বেশি হয়। তবু নিয়মিত পরিষ্কার করি। শহরকে সুন্দর রাখতে পারছি—এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।

শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাই নন, নগরবাসীও রাজশাহীর পরিচ্ছন্নতা নিয়ে গর্বিত। আম ব্যবসায়ী মিরাজ বলেন, অনেক শহরে গেছি। কিন্তু রাজশাহীর মতো এত পরিষ্কার শহর খুব কম দেখেছি। প্রতিদিন নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় বলেই শহরটা সবসময় পরিচ্ছন্ন থাকে।

রাজশাহীর এই পরিচ্ছন্নতা শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ঘামেই গড়ে ওঠেনি; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নাগরিক সচেতনতা, পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের সবুজায়ন উদ্যোগ। তবে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের আধুনিক ব্যবস্থা চালু করা না গেলে ভবিষ্যতে এই সাফল্য ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস আই এস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!