ঢাকা,  শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

গ্রাহকের ১৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও রাজ্জাক

নওগাঁ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৯:১১, ২৩ জানুয়ারি ২০২৪
গ্রাহকের ১৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও রাজ্জাক
ডলফিন সেভিং এন্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের অফিস ও ইনসেটে অভিযুক্ত আব্দুর রাজ্জাক

নওগাঁয় ‘ডলফিন সেভিং এন্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে গ্রাহকের প্রায় ১৫ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে ওই সংস্থায় জীবনের শেষ সঞ্চয় রেখে সর্বস্বান্ত হয়েছেন অন্তত ৬ শতাধিক গ্রাহক। টাকা ফেরত পাবেন কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন গ্রামের সহজ-সরল মানুষ। কষ্ট করে অর্জিত টাকা ফেরত পেতে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন তারা।

নওগাঁ সদর উপজেলার ফতেপুর বাজারে ২০১৩ সালে সমবায় থেকে নিবন্ধন নিয়ে ‘ডলফিন সেভিং এন্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থা গড়ে তোলেন একই গ্রামের নাসির উদ্দিনের ছেলে আব্দুর রাজ্জাক। যেখানে বিভিন্ন গ্রামের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে স্থায়ী আমানত ও ক্ষুদ্র সঞ্চয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন তিনি। গ্রাহকদের প্রতি লাখে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা মুনাফা দিতেন। হঠাৎই এ সংস্থার পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক উধাও হয়ে গেছেন। গত এক সপ্তাহ থেকে ওই অফিসের প্রধান গেটে তালা ঝুলছে। গ্রাহকরা অফিসে এসে তালা দেখে ফিরে যাচ্ছেন। এতে দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছেন তারা।

বাড়তি লাভের আশায় কেউ মেয়ের বিয়ের জন্য, কেউ বিদেশ যাওয়ার জন্য, কেউবা গরু-ছাগল বিক্রির টাকা আবার কেউ দিনমজুরি করে টাকা আয় করে জীবনের শেষ সঞ্চয় রেখেছিলেন এ সংস্থায়। মুনাফাও পেতেন তারা। তবে বিপত্তি বাধে মূল টাকা ফেরত চাইলে। এতে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠে পরিচালকের বিরুদ্ধে। হঠাৎ সংস্থার কার্যক্রম বন্ধ করে পরিচালক পালিয়ে যাওয়ায় এখন গ্রামের সহজ-সরল মানুষের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। 

স্থানীয়রা জানায়, সঠিক তদারকির অভাবে নামে-বেনামে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে বিভিন্ন সংস্থা। গ্রামের সরল-সরল মানুষকে প্রলোভন দিয়ে টাকা গুছিয়ে এক সময় পালিয়ে যায়। এ সংস্থাটি অন্তত ৬ শতাধিক গ্রাহকের ১৫ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছে।

ফতেপুর গ্রামের দিনমজুর আলম হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চলে। আমার দুই মেয়ে। তাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে গত কয়েক বছরে এ সংস্থায় দেড় লাখ টাকা সঞ্চয় করেছিলাম। কিন্তু আমার সব শেষ হয়ে গেল। এখন পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না।

নাপিত সাইদুল ইসলাম বলেন, কাজ করে সংসারের খরচ বহনের পাশাপাশি প্রায় এক লাখ টাকা গুছিয়ে গত কয়েক বছর আগে এ সংস্থায় রেখেছিলাম। প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা করে লাভ পেতাম। টাকার প্রয়োজন হওয়ায় গত কয়েক মাস ধরে ঘুরে ঘুরে ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। গত কয়েকদিন থেকে অফিস তালাবদ্ধ। মালিক আব্দুর রাজ্জাককে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার বাড়িতেও তালা দেওয়া।

গৃহবধূ মাসুদা বানু বলেন, বাড়ির পাশেই এনজিও। বিদেশ যাওয়ার জন্য দুই লাখ টাকা রেখেছিলাম। বলতে গেলে আমার কাছ থেকে জোর করেই ১০ মাস আগে টাকা নিয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক। লাখে আড়াই হাজার টাকা লাভ দেওয়ার কথা থাকলেও দুই হাজার করে দিয়েছে। গত চার মাস থেকে মূল টাকা নেয়ার জন্য তাগাদা দিয়ে আসছিলাম। টাকা না দিয়ে সময়ক্ষেপণ করছিলেন এবং হুমকিও দিচ্ছিলেন। এখন তো পালিয়ে গেছেন, টাকা পাবো কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।

ডলফিন সেভিং এন্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের ভুক্তভোগী গ্রাহকদের একাংশগৃহবধূ নাহিদা আক্তার বলেন, স্বামীকে না জানিয়ে এ সংস্থায় দেড় লাখ টাকা রেখেছিলাম। স্বামী পরে জানতে পারেন। এ নিয়ে ঝগড়াও হয়। আমরা যারা টাকা রেখেছি সবারই কষ্টের টাকা। কষ্টে উপার্জিত টাকা ফেরত পেতে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছি।

আব্দুর রাজ্জাকের গ্রামের বাড়ি ফতেপুর পূর্বপাড়া গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কেউ না থাকায় বাড়ির মূল দরজা তালাবদ্ধ। তবে আব্দুর রাজ্জাকের বড় ভাইয়ের বাড়িতে বসবাস করছেন তার বাবা-মা। আব্দুর রাজ্জাকের মা মরজিনা বেগম বলেন, ছেলে এক সময় বিদেশে ছিল। এরপর গ্রামে এসে বিভিন্ন দোকানে কাজ করে। এরপর একটি এনজিও (বেসরকারি সংস্থা) দেয়। গত কয়েকদিন থেকে ছেলেকে দেখা যাচ্ছে না। তবে কীভাবে কত টাকা লেনদেন করেছে একমাত্র ছেলেই বলতে পারবে।

নওগাঁ জেলা সমবায় অফিসার খোন্দকার মনিরুল ইসলাম বলেন, গত বছরের জুনে ওই সংস্থা পরিদর্শন করে ৩৮ লাখ টাকা আমানতের তথ্য পাওয়া যায়। তবে ৬ মাসের ব্যবধানে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে, যা অসম্ভব। তবে সমিতিকে সামনে রেখে বা সাইনবোর্ড ব্যবহার করে ব্যক্তিগতভাবে গোপনে আত্মসাতের জন্য লেনদেন করেছে কিনা সে বিষয়টিও দেখা হবে। গত কয়েকদিন আগে কয়েক ভুক্তভোগী এসে টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন। যদি এ ধরনের সত্যতা পাওয়া যায় তবে ওই সংস্থার নিবন্ধন বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএম
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!