ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

সৌদি খেজুর চাষে ভাগ্য বদল

কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৪:৪৬, ১৭ আগস্ট ২০২২
সৌদি খেজুর চাষে ভাগ্য বদল
নজরুলের খেজুর বাগান। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

গাজীপুরের সদর উপজেলার পিরুজালী ইউপির বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বাদল। ২০০৩ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক পাস করে বেকারত্ব ঘুচাতে এনজিওসহ কয়েকটি টেলিকমিউনিকেশন সংস্থায় পরিবেশকের চাকরি করেন।

২০১৫ সালের পর সব বাদ দিয়ে বাবার সঙ্গে কৃষি কাজে যোগ দেন। খুঁজতে থাকেন কৃষিকাজে নতুন সম্ভাবনার দিক। পেয়েছেনও সাফল্য। 

দেশ-বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজদের জমিতে ‘সৌদি ডেট পাম ট্রিস ইন বাংলাদেশ’ নামে ব্যক্তি উদ্যোগে খেজুরের বাগান গড়ে তুলেন। খেজুর গাছ চাষের পাশাপাশি খেজুর চারার নার্সারিও গড়ে তুলেছেন তিনি। এখন তিনি নিজ উপজেলায় মরুভূমির ফল খেজুর চাষ করে দেশে খেজুরের চাহিদা মেটানোর স্বপ্ন দেখছেন বাদল। 

শুধু বাদল নয়, এই খেজুর চাষে আগ্রহী জেলার চাষি তার কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে খেজুর চাষে সফলতার স্বপ্ন দেখছেন।

নজরুলের খেজুর বাগান। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

২০১৫ সালে শুরুর দিকে সৌদি আরব প্রবাসী এক বন্ধুর সহযোগিতায় খেজুরের চাষ ও নার্সারী করার পরিকল্পনা করেন। মরুভূমি অঞ্চলের ফসল বাংলাদেশের কাদামাটির ফলানো সম্ভব কিনা তা নিয়েও তার ভাবনার অন্ত ছিল না। তারপরও প্রবাসী ওই বন্ধুর সহযোগিতায় বিশ্বের ৬টি দেশ থেকে বিভিন্ন জাতের খেজুরের বীজ ও চারা সংগ্রহ করেন বাদল। ২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর ৭০ শতক জমিতে সৌদি আরবের ১৮টি খেজুরের চারা রোপণ করে মরুর খেজুরের চাষ শুরু করেন। এর জন্য প্রথমেই তার খরচ হয়েছে ৫২ লাখ টাকা।

২০১৭ সালে প্রথম তার বাগানের খেজুর গাছে ফলন আসতে শুরু করে। খেজুরের বীজ কিংবা সাকার থেকে চারা উৎপাদন করে খেজুরের নার্সারিও গড়ে তোলেন। সেই বছরেই বাগান থেকে ৬২ লাখ টাকার চারা বিক্রি করেন।  বর্তমানে তার বাগানে ও নার্সারিতে ১৬ প্রজাতির খেজুর গাছ রয়েছে।

মানুষের ব্যাপক চাহিদার যোগান দিতে বাদল আরো ১৪ জাতের চারা বাইরে থেকে এনেছেন। প্রতিটি সাকারের দাম ২৫ হাজার টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর খেজুর ধরা অবস্থায়ও চারা বিক্রি করা হয়, যার দাম হলো ৩ লাখ টাকা। বাগান পরিচর্যা ও অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতিমাসে তার ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়।  

নজরুলের খেজুর বাগান। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

খেজুর চাষি নজরুল ইসলাম বাদল বলেন, ২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে মরুর দেশের খেজুরে গাছের ১৮টি চারা রোপণ করেন। সেই গাছে এ বছরও অনেক খেজুর ধরেছে। এক একটি খেজুরের বাঁধার ওজন প্রায় ২৫ কেজি। তবে তার এ সফলতা দেখে খেজুর চাষে আগ্রহীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

তিনি আরো বলেন, ৩০ হাজার চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে খেজুরের নার্সারি গড়ে তুলেছেন। তার সংগ্রহে খেজুরের যেসব জাত রয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আজওয়া, মরিয়ম, আম্বার, খুনিজি, হেলালি, ম্যাডজেলি, বারহি, খালাস, ওমানি, সুক্কারি, সাফাওয়ি ইত্যাদি। তবে যেভাবে ফলন হচ্ছে তা ঠিক থাকলে অচিরেই দেশে খেজুরের চাহিদা মেটাতে পারবেন বলে প্রত্যাশা তার।

তিনি আরো জানান, তার নার্সারিতে টিসু, কলম (সাকার) ও সরাসরি বীজ থেকে উৎপাদিত চারা। টিস্যু ও কলম চারা থেকে ১ থেকে ২ বছরে ফলন পাওয়া যায়। একটি টিস্যু চারা ৮ থেকে ১০ হাজার, কলম চারা ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং বীজের চারা আটশ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। একটি পূর্ণ বয়স্ক গাছে ৮-১২টি বাধি ধরে। প্রতি বাধিতে ২৫-৩০ কেজি করে খেজুর হয়। তাছাড়া বীজ থেকে উৎপাদিত চারায় ফলন আসতে সময় লাগে ৩ থেকে ৪ বছর। বীজ থেকে উৎপাদিত চারার দাম তুলানামূলক কম। এখানে চারা ছাড়াও খেজুরও বিক্রি করা হয়।

ময়মনসিংহের ভালুকার পাঁচগাঁও এলাকার মাদরাসা শিক্ষক বিল্লাল হোসেন জানান, ২০১৯ সালে তিনি গাজীপুরের নজরুল ইসলাম বাদলের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বারহী জাতের একটি ও ৫০ হাজার টাকায় মরিয়ম জাতের একটি খেজুর গাছের সাকার কলমের চারা ক্রয় করেন। বাদল ভাই নিজে এসে চারা দুটি তার জমিতে রোপণ করে দিয়ে গেছেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে খেজুর গাছে ফুল আসে, মার্চেই তা ফলে পরিণত হয়। এরমধ্যে মরিয়মের জাতটি বারোমাসি  হয়েছে।

নজরুলের খেজুর বাগান। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

তিনি আরো জানান, তার কাছ থেকে আবারো ৭৫ হাজার টাকায় একটি হেলালী, একটি আম্বার ও একটি খুদরি জাতের সাকারের কলম চারা ক্রয় করেছেন। ৩১ জুলাই চারাগুলো বাদল ভাই নিয়ে এসে আমার বাগানে লাগিয়ে দিয়ে গেছেন।

শ্রীপুর উপজেলার মাওনা এলাকার হাজী মমতাজ উদ্দিন জানান, তিনিও বাদলের কাছ থেকে চারা কিনেছেন। তাতে ভাল ফলন হচ্ছে।  ২০২০ সালে চল্লিশ হাজার টাকা দিয়ে তিনি দুটি খেজুর চারা ক্রয় করেছিলেন। ২১ মাস পরে এসব গাছে ফুল ও ফলন আসে। 

গাজীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি গাজীপুরে নতুন যোগদান করেছি। তারপরও খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি পিরুজালী গ্রামে প্রায় তিন বিঘা জমিতে সফলভাবে সৌদির খেজুর চাষ করছেন বাদল। বাংলাদেশে সৌদি আরবের খেজুর চাষ একটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য। এর জন্য কৃষি পর্যায়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন। এই ফল চাষে সব ধরণের সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তিনি। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!