ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

এক যুগ ধরে দোকানঘরে বৃদ্ধ দম্পতির মানবেতর বসবাস

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৩:১৭, ৭ মার্চ ২০২২
এক যুগ ধরে দোকানঘরে বৃদ্ধ দম্পতির মানবেতর বসবাস
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি দোকানে প্রায় ১২ বছর ধরে বসবাস করছেন বৃদ্ধা নূর আলী খাঁ (৭৮) ও তার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ সুফিয়া খাতুন (৭২)। দোকানে প্রতিদিন যা বিক্রি হয়, তাতে তাদের সংসারও চলে না। ফলে অন্যান্য চাহিদা মেটাতে না পেরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বৃদ্ধ এই দম্পতি।

শুধু তা-ই নয়, গৃহহীন হয়ে প্রায় এক যুগ ধরে তারা শৌচাগার, টিউবওয়েল, খাদ্য ও বস্ত্রের অভাবে সীমাহীন কষ্ট করছেন। কিন্তু তাদের ছেলেরা বসবাস করেন পাকা বাড়িতে। তবু তাদের সন্তানদের বিরুদ্ধে নেই কোনো অভিযোগ।

নূর আলী খাঁ কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার খলিশাকুন্ডি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মালিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। নূর আলী বয়সের কারণে ভারী কাজ করতে পারেন না। তাই মুদি ব্যবসা শুরু করেন। তার আগে তিনি দিনমজুর ও লেবুর ব্যবসা করতেন। তার চার মেয়ে ও দুই ছেলে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি মুদি দোকান। দোকানের মেঝেতে সুফিয়া খাতুন শুয়ে রোগের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। পাশে তার স্বামী নূর আলী তার সেবা করছেন। একইসঙ্গে দোকানদারি করছেন। দোকানে সীমিত পরিমাণে চানাচুর, বিস্কুট, পাউরুটি, কয়েল, সাবান, শ্যাম্পু, লবণ, ডালসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিস রয়েছে। সাকুল্যে আনুমানিক দুই থেকে তিন হাজার টাকার পণ্য আছে।

প্রতিদিন তার দোকানে ৩০০ থেকে ৬০০ টাকার জিনিস বিক্রি হয়। এতে তার লাভ হয় ৪০ থেকে ৬০ টাকা। এই লাভের টাকায় তাদের সংসার চলে না। ওষুধ কেনার টাকাও জোগাতে পারেন না।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

অসুস্থ ও অসহায় সুফিয়া খাতুন জানান, থাকার কিছু নাই, বাড়ি নাই, জায়গা নাই, খেতে দেওয়ার লোক নাই। আমি চলাফেরা করতে পারি না, হাঁটতে পারি না। ছেলেদের অবস্থাও ভালো না। তাদের সংসারেও অভাব। আমার রোগ-যন্ত্রণা আছে কিন্তু চিকিৎসা করার ক্ষমতা নেই। চেয়ারম্যান-মেম্বার টাকাপয়সা দেয় না। ঘর চাই, বাড়ি চাই, কাপড়-চোপড় চাই, খাওয়াদাওয়া চাই, চিকিৎসার জন্য সাহায্য চাই।

সুফিয়া বলেন, চার মেয়ের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। দুই ছেলে কাঠের ব্যবসা ও দিনমজুরি করে। ছেলেদের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। তুমি চলে যাও বাপ। সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বললে বকাবকি করবে ছেলেরা। ছেলেদের সংসার বড়। তাদেরও অভাব আছে।

এ বিষয়ে বৃদ্ধ দম্পতির ছেলে ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা এই প্রতিবেদকের ওপর চড়াও হন। এ সময় তারা ছবি তুলতে ও তথ্য সংগ্রহ করতে বাধা দেন। কোনো বক্তব্য দেবেন না বলে জানিয়ে দেন বৃদ্ধা দম্পতির ছেলে মাহাতাব উদ্দিন।

আরো পড়ুন: মেয়েকে যৌন নির্যাতন করায় বাবা গ্রেফতার

নূর আলী খাঁ জানান, আমার স্ত্রী অনেক বছর আগে থেকে অসুস্থ। প্রথমের দিকে চিকিৎসা চালিয়ে ছিলাম। পরে টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে না পারায় সে ছয় বছর ধরে পঙ্গু, একা একা চলাচল করতে পারে না। তা ছাড়া নানা জটিল ও গোপন রোগে আক্রান্ত আমার স্ত্রী। আমিও নানা রোগ ও বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ। আমরা টাকার অভাবে খেয়ে না খেয়ে দিন যাপন করি। আমার কিছুই নেই। দুই শতক জমি ছিল, সেখানে ছেলেরা বাস করে। আমি টাকার অভাবে দোকানে মালপত্র তুলতে পারি না। ৩০০ থেকে ৬০০ টাকার বিক্রি হয়, তাতে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৬০ টাকা লাভ হয়।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশতিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, শুনি সরকার মানুষকে ঘর তুলে দেয়, কতজনকে কতকিছু দেয়। আজ পর্যন্ত চেয়ারম্যান-মেম্বাররা একটা কার্ড করে দিল না আমাদের। অনেক আগে আমি একবার পেয়েছিলাম কিন্তু বুড়িডা কোনো দিনই কিছু পায়নি। স্ত্রীর গোসল, প্রস্রাব-পায়খানা থেকে শুরু করে সব কাজ আমাকে করিয়ে দিতে হয়। এই বয়সে স্ত্রীর সব সেবা আমাকে করতে হয়। সরকার যদি আমাদের দিকে তাকায়, তাহলে আলহামদুলিল্লাহ।

কয়েকজন প্রতিবেশী বলেন, বৃদ্ধ দম্পতির ছেলেরা চাইলে তার মা-বাবাকে তাদের বাড়িতে রাখতে পারে। কিন্তু বাড়িতে তাদের জায়গা দেয় না। কয়েক মাস আগে থেকে দুবেলা-দুমুঠো খাবার খেতে দেয়। কিন্তু বৃদ্ধ-বৃদ্ধার চিকিৎসা, বাসস্থান, বস্ত্রসহ নানা কষ্ট দেখার কেউ নেই।

এ বিষয়ে কথা বলতে খলিসাকুন্ডি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জুলমত হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

স্থানীয় ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সেলিম বিন জামান বলেন, বৃদ্ধ দম্পতির ঘর নেই, এ জন্য দোকানে বসবাস করেন। বিষয়টি আমি জানি। আমি এবারের নবনির্বাচিত সদস্য। সরকারি বিধিমোতাবেক বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় সার্বিক সহযোগিতা করার চেষ্টা করব। তবে তার ছেলের অবস্থা মোটামুটি ভালো।

দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল জব্বার বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আপনার মাধ্যমে বৃদ্ধ দম্পতির মানবেতর জীবনযাপনের বিষয়টি জানলাম। আমি খোঁজখবর নিয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেব।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএম
ট্যাগ: কুষ্টিয়া
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!