ঢাকা,  সোমবার   ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

এবারো শঙ্কায় গদখালীর ফুল চাষিরা

এইচ আর তুহিন, যশোর   
প্রকাশিত: ১২:২৮, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২
এবারো শঙ্কায় গদখালীর ফুল চাষিরা
ফুল সংগ্রহে ব্যস্ত চাষি

এবারো অতিমারী করোনাভাইরাসের শঙ্কায় রয়েছেন ফুলের রাজধানীখ্যাত যশোরের গদখালির চাষিরা। ফুলচাষিরা সাধারণত বিভিন্ন দিবসের দিকে চেয়ে থাকেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে ভালো ব্যবসা করতে পারেননি তারা। এ বছর আসছে বিশ্বভালোবাসা দিবস, বসন্তবরণ এবং আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস ঘিরে চাষিরা আশার আলো দেখছিলেন। কিন্তু সে স্বপ্ন ভেঙে গেছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের কারণে। জনসমাগমে সরকারি বিধিনিষেধ থাকায় তারা শঙ্কায় রয়েছেন।

দিবসগুলো উপলক্ষে এবার ফুলের এ রাজধানী থেকে ৪০ কোটি টাকার বাণিজ্যের টার্গেট করেন ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা। যা গত বছরের চেয়ে ৮ কোটি টাকা বেশি। সারাদেশে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে যে ফুল বেচাকেনা হয় এর অন্তত ৭০ ভাগই যশোরের গদখালী-পানিসারায় উৎপাদিত হয়। এবার ফুলের উৎপাদন বেশি। তাই গদখালির ফুল দিয়ে বিভিন্ন জেলার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে উৎপাদিত ফুল বিক্রি না হওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষিরা।  

ছবি ডেইলি বাংলাদেশ

পানিসারা গ্রামের ফুলচাষি কামাল হোসেন জানান, চোরাপথে ফুল আমদানি হওয়ায় ফুলের বিক্রিমূল্য আগে থেকে কম হচ্ছে। ফলে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তবু আসন্ন বিভিন্ন উৎসবকে সামনে রেখে এবার ফুলচাষিরা ৪০ কোটি টাকা ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। কিন্তু ভালোবাসা দিবস, বসন্তবরণ ও একুশে ফেব্রুয়ারিতে আশানুরূপ ফুল বিক্রি নিয়ে শঙ্কায় আছেন। 

গদখালির পটুয়াপাড়া গ্রামের উবায়দুল বলেন, অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের নজরদারিতে এবার ফুলের ফলন বেশি হয়েছে। কিন্তু ঠিকঠাক মতো বিক্রি করতে পারব কিনা বুঝতে পারছি না।

তিনি অভিযোগ করেন, ফুলহাটে ইজারাদারের বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কারণে কখনো কখনো ফুলের বাজার অস্থিতিশীল হয়। এ সমস্যা সমাধানে তিনি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

সৈয়েদপাড়া গ্রামের রমজান আলী জানান, গত কয়েক বছরের চেয়ে এবার ফুল উৎপাদন খরচ বেড়েছে। শ্রমিক খরচ, চারার দ্বিগুণ মূল্য, সার কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার ফুলের দাম একটু বেশি। 

তিনি আরো বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, খুলনা ছাড়াও দেশের ছোটবড় এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা ফুল কিনতে আসেন। কিন্তু বিধিনিষেধকালে তারা ফুল কিনতে আসবেন কি না দ্বিধায় আছি।

কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ দীপঙ্কর দাস জানান, এবারো গদখালিতে ফুলের উৎপাদন বেশ ভালো হয়েছে। ২০২০ সালে যে পরিমাণ টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে, এবছর তা অতিক্রম করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এ বছর ৪০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে। বসন্ত উৎসব ও ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে আগামী দুই দিনের মধ্যে ১৫ কোটি টার ফুল বিক্রির টার্গেট রয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আরো ১০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে। তবে করোনার কারণে কিছুটা বিঘ্ন ঘটতে পারে। 

তিনি আরো জানান, দেশের মধ্যে বাণ্যিজিকভাবে যশোর জেলার গদখালীতে ফুল উৎপাদন শুরু করা হয় আশির দশকে। দেশের ফুলের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার রয়েছে এখানে। ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা গদখালিতে আসেন ফুল ক্রয় করতে। 

কৃষি কর্মকর্তা মাসুম হোসেন পলাশ জানান, উপজেলার গদখালীতে এবার প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমি ফুলের আবাদ করা হয়েছে। করোনা ও আম্ফানে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এবার তারা সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠার স্বপ্ন দেখছেন।

ছবি ডেইলি বাংলাদেশ

তিনি আরো জানান, যশোর শহর থেকে পশ্চিমের উপজেলা ঝিকরগাছা ও শার্শা থানার ৭৫টি গ্রামের প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে চাষ করা হয় হরেক রকমের ফুল। ঝিকরগাছা ও শার্শা থানার গ্রামগুলোর রাস্তার দুইপাশে দিগন্ত বিস্তৃত জমিতে লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি আর সাদা রঙের ফুলের সমাহার দেখা যায়। প্রতিদিন ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারার শত শত ফুলচাষির আনাগোনা শুরু হয় গদখালীর বাজারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল  থেকে ছোট-বড় পাইকাররাও সেখান থেকে ফুল কিনে নিয়ে যান। এরপর বিভিন্ন হাতবদল হয়ে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে ফুল ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। এমনকি দেশের বাইরেও। বিশেষ করে গাঁদা, গোলাপ, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, জারবেরা, কসমস, ডেইজ জিপসি, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকাসহ বিভিন্ন ধরনের ফুলের চাষ রয়েছে এখানে। আর এবার সামান্য যুক্ত হয়েছে টিউলিপ ফুল। 

প্রসঙ্গত, ভারতীয় বন্ধু রমেশ, সাতক্ষীরার আমজেদ, যশোরের নুর ইসলামের সহযোগিতায় ১৯৮৩ সালে গদখালীতে প্রথম ফুলচাষ শুরু করেন শের আলী সরদার। তখন স্বল্পপরিসরে ফুল বিক্রি শুরু হলেও এখন তা দেশ পেরিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। বর্তমানে এখানকার ৫ হাজার কৃষক ফুলচাষে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএইচ
ট্যাগ: যশোর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!