রাস্তার উপর বাড়ি নির্মাণ, অবরুদ্ধ ১১ পরিবার
‘প্রায় ৩৫ বছর আগে বখতার খাঁ নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির থেকে জায়গা কিনে বসতি করছি। তখন রাস্তা দেখে জমি কিনি। কিন্তু এখন রাস্তা আটকে দেওয়ায় ঢুকতে পারছি না। বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে তা মাথায় করে অনেক ঘুরে আসতে হয়। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে পারছি না। এ অবস্থায় গত ২ মাস ধরে আমরা ১১ দিনমজুর পরিবারে ৮০ জন সদস্য মানবেতর জীবন-যাপন করছি।
এভাবেই নিজের কষ্টের কথা বলছিলেন হয়রত আলী খাঁ। তিনি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউপির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চরকাছিয়া গ্রামের বাসিন্দা। একই সমস্যার কথা বলছিলেন ওই এলাকার ইব্রাহিম গাইন, আশ্রাফ আলী ও আজগর মাঝি।
মোল্লারহাট বাজারের দক্ষিণ দিকে মাঝি বাড়ির সামনের চলাচলের ২২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট প্রস্থের রাস্তা বন্ধ করে আধা পাকা ভবন নির্মাণ করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালী সিরাজুল ইসলাম (সেরান্না পাল)। এতে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে ১১ টি পরিবার।
ভুক্তভোগী দিনমজুর আজগর মাঝি বলেন, আমার বিবাহ উপযুক্ত দুইটি মেয়েসহ পরিবারের ছয়জন সদস্য। দুইজন প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। তাদের ঘাড়ে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। মসজিদে নামাজ পড়তে যেতে পারি না। পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেলে জানাজা পড়ার জন্য মানুষ আসতে পারবে না। এ যুগেও এ ধরনের আচরণ করে মানুষ, তা ভাবা যায় না। জাহেলিয়াতের যুগের মতো আচরণ করছেন তারা। আমরা যে কী মানবেতর জীবনযাপন করছি, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। এখন পর্যন্ত একজন মানুষ আমাদের সহযোগিতা করে নাই।
নাজমা বেগম নামে অপর এক ভুক্তভোগী বলেন, আমরা গরিব মানুষ, আমাদের কথা বলার জায়গা নেই। কৃষি কাজ করে খাই। অনেক হাত-পা ধরেছি কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। ওরা দাবি করছে রাস্তার জায়গা তাদের। রাস্তার ওপর আধা পাকা ভবন করে রেখেছে। গাছ ফেলে রাস্তা আটকে রেখেছে। মানুষ মরলে লাশ নিয়ে যাওয়ার মতো জায়গা নেই। গত ৫ মাস ধরে জলাবদ্ধতায় রয়েছে পুরো বাড়ি। একমাত্র মেয়েটি স্কুলের ড্রেস সঙ্গে নিয়ে সিভিল পোশাক পড়ে স্কুলে যায়। শিশু বাচ্চারা জামা হাঁটুর উপর ও বই মাথায় নিয়ে স্কুলে যেতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা তবিব উল্যা কাসিদ বলেন, ৩৫ বছরের পুরানো রাস্তা এটি। সিরাজুল ইসলাম (সেরান্না পাল), তার স্ত্রী পারুল বেগমসহ ছেলেরা এখন রাস্তাটি নিজেদের বলে দাবি করছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে হুমকি দিচ্ছেন কেউ রাস্তা দিয়ে গেলে তার পা ভেঙে দেবে। এ কারণে আমরা আশপাশের বিভিন্ন বাগান দিয়ে যাতায়াত করছি। বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় ১১টি পরিবারের সদস্যরা বেকায়দায় পড়েছে।
অভিযুক্ত সিরাজুল ও তার স্ত্রী পারুল বেগম বলেন, আমরাও বখতার খাঁ থেকে জমি কিনেছি। তখন পরিমাপ করা হয়নি। এখন পরিমাপ ওই জায়গা আমরা পেয়েছি। সম্পূর্ণ রাস্তাটি হচ্ছে আমাদের জায়গার ওপর। আমাদের পেছনের লোকজন এ রাস্তার ওপর দিয়ে চলাচল করছিলেন। ওই পরিবারগুলোও বখতার খাঁর কাছ থেকে জমি কিনছেন তিনি তো এখন কিছু বলছে না। আমরা আমাদের জমিতে ঘর তুলেছি।
দক্ষিণ চরবংশী ইউপি চেয়ারম্যান আবু সালেহ মিন্টু ফরায়েজি বলেন, রাস্তার জায়গা তাদের, এটা ঠিক। কিন্তু জনগণের চলাচলের জন্য এ রাস্তা ব্যবহার করা হতো। শুনেছি আমার আগের চেয়ারম্যান আবদুর রশিদ মোল্লা বিষয়টি নিয়ে মীমাংসায় বসেছিলেন। এখন দিনমজুর পরিবারের এ সমস্যা কেন হবে তা আমার বোধগম্য না।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন দাস জানান, রাস্তা বন্ধ করার কারণে ১১ দিনমজুর পরিবারের মানবেতর জীবন যাপনের বিষয়টি কেউ জানায়নি। তবে এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।