রণাঙ্গনের রোমহর্ষক স্মৃতি
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। এক মিশ্র অনুভূতিতে পূর্ণ ছিল দিনটি। পথে-ঘাটে বিজয়ের আনন্দে মানুষ ছিল উদ্বেলিত। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় বেড়িয়ে পড়েছিল আনন্দ মিছিল করতে। আবার কারো কাছে আনন্দের মাঝেও জড়িয়ে ছিল দু:খ। তারা স্মরণ করছিলেন প্রিয়জনকে, সহায় সম্বল অনেকেই ছিলেন স্মৃতিকাতর।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে মানুষদের ভিড় জমেছিল সাধারণ মানুষের। স্মৃতির ডানা মেলে এভাবেই বিজয়ের দিনটির কথা বর্ণনা করেন ময়মনসিংহের বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল।
বিজয় দিনের স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন, সেই দিন সম্ভ্রম হারানো নারীরা যখন বিভিন্ন টর্চাল সেল থেকে বেড়িয়ে আসছিল, তাদের চোখমুখেও ছিল বিজয়ের আনন্দ। মানুষের আনন্দ মিছিল দেখছিল মন ভরে। ৯ টা মাস পাকিস্তানি পশুরা তার শরীরটা ক্ষতবিক্ষত করেছে, সেই ক্ষত ভুলে গিয়ে তারাও বিজয়ের আনন্দে শামিল হয়েছে।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে স্বতঃস্ফূর্ত তাড়নায় রণাঙ্গনে ছুটে গিয়েছিলেন বিমল পাল। ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেষা ময়মনসিংহে হালুয়াঘাটের পাহাড়ি আঁচলে ঢাকা আদিবাসী গ্রাম তেলিখালী থেকে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে।
যুদ্ধে যাওয়ার স্মৃতি: ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল হয়ে ময়মনসিংহ শহর এবং রেলপথে গফরগাঁও এসে এ জেলা দখল করে নেয় হানাদার বাহিনী। ২২ এপ্রিল পরিবার ফুলবাড়িয়ার একটি গ্রামে আশ্রয় নিলে সেখান থেকেই যুদ্ধে যাবার জন্য মনস্থির করেন বিমল পাল। দিনটি ছিল ৯ মে। মা কে মামার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে নিজের সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পরেন রাস্তায়। তবে মামার বাড়ি না গিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে চলে যান ভারতে।
১১ জুন ১৯৭১। তুরা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের উদ্দেশে খোলা ট্রাকে করে একদল তরুণের সঙ্গে শুরু হয় যাত্রা। ১২ জুন এসে উপস্থিত হন ক্যাম্পে। প্রায় এক মাস চলে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। ১৪ জুলাই পোস্টিং দেয়া হয় ১১ নম্বর সেক্টরের ঢালু সাব সেক্টরে। কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন আলী হোসেন, প্লাটুন কমান্ডার মোজাফফর হোসেন, সেকশন কমান্ডার ফারুক আহমেদ। ১৭ জুলাই হালুয়াঘাটের নাগলা ব্রিজ ধ্বংস করার মধ্যদিয়ে শুরু হয় প্রথম সম্মুখযুদ্ধ। এরপর বারমারি অ্যাটাক, নুন্নি সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে চলে যুদ্ধ।
রণাঙ্গনের রোমহর্ষক স্মৃতি: ময়মনসিংহ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হালুয়াঘাটের তেলিখালী যুদ্ধ। সেই দিনের কথা মনে হলে আজও গাঁ শিউরে উঠে বিমল পালের। ২ নভেম্বর রাত থেকে মুক্তিযোদ্ধারা ‘আক্রমণ করো এবং দখল করো’ নীতিতে প্রস্তুত ছিলেন। তেলিখালীতে পাকিস্তানি সেনাদের সব বাংকার দখলের সব পরিকল্পনা সাজায় মুক্তিযোদ্ধারা।
বিমল পাল বলেন, এই যুদ্ধে কোম্পানি কমান্ডার আবুল হাশেমের সঙ্গে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ১৩ রাজপুত রেজিমেন্ট যুক্ত ছিল। ঘাঁটিটি ছিল হালুয়াঘাট সীমান্তে পাকসেনাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্যাম্প। ১ প্লাটুন ৩৩ পাঞ্জাব, ১ প্লাটুন ৭১ উইং রেঞ্জারের সঙ্গে সমান সংখ্যক রাজাকার। এই আক্রমণের নায়ক ল্যান্স নায়েক মো. মেসবাহ উদ্দিন।
পরদিন ৩ নভেম্বর, তখনো সূর্যের আলো ফুটেনি। সবকিছু আবছা আবছা দেখা যায়। ৩৩ পাঞ্জাবের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণের পাকিস্তানিদের বাংকারটি দখলে আনতে গুলি করছে শামছুল হকসহ মুক্তিযোদ্ধারা। গোলাগুলির শব্দে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠে।
মুক্তিযোদ্ধাদের তখন একটাই লক্ষ্য, সব কটাকে মেরে ওদের বাংকার দখল করতে হবে। পাকিস্তানিরাও তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে থাকে। শেষ পর্যন্ত না পেরে তারা আত্মসমর্থনের সুযোগ চেয়েছিল সুবেদার ধরম পালের কাছে। কিন্তু আমাদের প্লাটুন কমান্ডার আতাউদ্দিন শাহ বলেছিলেন, ‘তোদের কোন রক্ষা নাই। সব কয়টাতে জবেহ করবো।’ তাই তারা আত্মসমর্পনের সুযোগ পেল না।
প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী এই যুদ্ধ শেষে পুরো তেলিখালী ক্যাম্প দখলে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের। যুদ্ধে ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা ও ২১ জন ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সদস্য শহীদ হন। সেসময় পাকিস্তানিদের দুটো প্লাটুনই সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়। যার ফলে ১২৪ জন পাকসেনা ও ৮৫ জন রাজাকার প্রাণ হারায়।
এরপরের পরিস্থিতি আরও লোমহর্ষক ছিল। যুদ্ধ শেষ করে যখন ক্যাম্পে ফিরে আসি, তখন আমাদের চোখের সামনে শুধু ক্ষতবিক্ষত লাশ আর লাশ। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো মাথা নেই। এমন ক্ষতবিক্ষত লাশ এদিক সেদিক পড়ে আছে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ আমরা নিয়ে আসি, ভারতীয়দেরটা তারা নিয়ে যায়। এটি ছিল আমাদের জন্য এক হৃদয় বিদারক ঘটনা। আর পাকিস্তানি বাহিনীদের লাশ সেভাবেই পড়ে ছিল। কেউই সৎকারের ব্যবস্থা করেনি। দিন-রাত শিয়াল-কুকুর তাদের খেয়েছে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় সংকেত ছিলো এই ঐতিহাসিক তেলিখালী যুদ্ধ। মূলত ৩ নভেম্বর সেই সম্মুখযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শত্রুদের পতন শুরু হয়। ৭ ডিসেম্বর থেকে ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকা মুক্ত হতে শুরু করে। এর ঠিক তিনদিন পর ১০ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয় ময়মনসিংহ।
বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল বলে চলেন, ময়মনসিংহ শত্রুমুক্ত হলেও সবাই অপেক্ষায় ছিল চূড়ান্ত বিজয়ের। ১৫ই ডিসেম্বর থেকেই আকাশ বাণীতে শোনা যাচ্ছিল ১৬ ডিসেম্বর হয়তো আত্মসমর্পণ করতে চলেছে পাক বাহিনী। অবশেষে চলেই আসে বিজয়ের সেই ঘোষণা। আর আমাদের কি উচ্ছ্বাস। মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে উল্লাস করতে থাকে সবাই। আহ! কি আনন্দ আকাশে বাতাসে...।