পাক বাহিনীর নৃশংসতার স্বাক্ষী আশুগঞ্জ সাইলো
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সারাদেশের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জেও বর্বরতা, নৃশংসতার সাক্ষী রেখে গেছে পাক হানাদার বাহিনী। সেই সময়ের বিভীষিকার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে এ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে। এর মধ্যে অন্যতম আশুগঞ্জ সাইলো।
মুক্তিযোদ্ধারা জানান, যুদ্ধ চলাকালীন আশুগঞ্জ সাইলো ছিল পাক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সদর দফতর। এখানে ট্ররচার সেল বানিয়েছিল তারা। ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, ঢাকা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে ধরে সাইলোর টর্চার সেলে এনে নির্যাতন করা হতো। পাক বাহিনীর বড় অফিসারদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থাও ছিল এখানে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সুন্দরী তরুণী ও বিভিন্ন বয়সী নারীদের এখানে রাখা হতো। অফিসারদের ভোগের পর তারা শেয়াল কুকুরের কিংবা মেঘনা নদীর মাছের খাবার হতো।
পাক বাহিনীদের বর্বরতা নিজের চোখে দেখেছেন আশুগঞ্জের বিশিষ্ট লেখক কেএম আহসান উল্লাহ জুয়েল। তিনি বলেন, পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর কয়েকশ মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ দেশপ্রেমিককে সাইলোতে ধরে ধরে নিয়ে অকথ্য নির্যাতন ও হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হতো।
তিনি আরো বলেন, যুদ্ধের সময় আশুগঞ্জ সাইলোতে পাকসেনাদের ক্যাম্প ছিলো। উত্তরে তেলিয়াপাড়া সীমান্ত ও দক্ষিণে সালদা নদী সীমান্ত অঞ্চল পর্যন্ত তাদের যুদ্ধক্ষেত্র ছিল। যুদ্ধ শেষে তারা এখানে এসে বিশ্রাম নিত। এই ক্যাম্পে বিভিন্ন গ্রাম থেকে মেয়েদের ধরে এনে ভোগ করত খানসেনারা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ই.খ. হুমায়ুন কবীর বলেন, আশুগঞ্জ সাইলোতে ধরে এনে ভৈরবের বিশিষ্ট ব্যক্তি হাফিজ উদ্দিন মিয়া, মন্টু মিয়া, মালি কন্ট্রাক্টরসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। পাক বাহিনীর নৃশংসতার অন্যতম সাক্ষী হয়ে আছে এই সাইলো। সেসব দিনের স্মৃতি মনে পোড়লে আজও শরীরের প্রতিটি রোম দাঁড়িয়ে যায়।
আশুগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম আজাদ বলেন, সাইলোর পশ্চিম পাশের নদী সংলগ্ন জায়গায় শত শত নিরীহ মানুষকে হত্যা করে গন কবর দেয়া হয়েছে। এছাড়া কত লাশ যে নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে তার হিসাব নেই।
৯ ডিসেম্বর আশুগঞ্জের সোহাগপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাক বাহিনীর বড় ধরনের সম্মুখযুদ্ধ হয়। এতে পাকিস্তানী সৈন্য, মুক্তিযোদ্ধাসহ অসংখ্য নিরীহ গ্রামবাসী মারা যায়। পরে হানাদাররা সাইলোতে অবস্থান নেয়। মুক্তিযোদ্ধারাও ওয়াপদা সড়কে অবস্থান নিয়ে হানাদার বাহিনীর ওপর আক্রমণ করেন।
১০ ডিসেম্বর রাতের আঁধারে পাক সেনারা ভৈরবের দিকে পালাতে থাকে। যাওয়ার আগে তারা আশুগঞ্জ রেলসেতুর ৩টি স্প্যান ডিনামাইন্ড দিয়ে উড়িয়ে দেয়। ১১ ডিসেম্বর শত্রমুক্ত হয় আশুগঞ্জ। ওড়ে স্বাধীনতার পতাকা। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় আশুগঞ্জের পরিত্যক্ত বধ্যভূমিগুলোতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করার দাবি জানায় উপজেলার মানুষ।