ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

ছোট্ট দুই শিশুর প্রতি সৎমায়ের এ কেমন আচরণ?

রংপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২১:১৩, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
ছোট্ট দুই শিশুর প্রতি সৎমায়ের এ কেমন আচরণ?
দুই শিশুর বুকে-মাথায় লাথি ও ছুরিকাঘাত করা হয়

রংপুরের পীরগঞ্জে দুই শিশুকে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে সৎমায়ের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। ভিডিও এবং ছবি দেখে সমালোচনা করেছে নেটিজেনরা। অনেকে আবার সৎমায়ের শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

এ ঘটনায় সৎমা ও বাবার বিরুদ্ধে পীরগঞ্জ থানায় মামলা করা হয়। ৩ সেপ্টেম্বর পীরগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন সৎমা ও বাবা। আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠায়। জামিনে বেরিয়ে নানাভাবে ফের ষড়যন্ত্র করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দুই শিশুর স্বজনরা।

আরো পড়ুন: ৫ টাকা কম দেয়ায় যাত্রীকে বাস থেকে ধাক্কা দিল হেলপার

জানা গেছে, আট বছর আগে পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার শিয়ালকাঠি এলাকার মাসুদ আহমেদের মেয়ে মুনিয়া আক্তারের সঙ্গে রংপুরের পীরগঞ্জের খোলাহাটি এলাকার জাহিদুল ইসলাম সেতুর বিয়ে হয়। তাদের সংসারে দুইটি ছেলে জ্ন্মগ্রহণ করে। জীবিকার তাগিদে জাহিদুল ঢাকায় চাকরি করতেন। তার স্ত্রী প্রথম দিকে ঢাকায় থাকলেও পরে দুই ছেলেকে নিয়ে পীরগঞ্জে থাকতেন। জাহিদুল ঢাকা থেকে ছুটি নিয়ে পীরগঞ্জ এলে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হতো।

এরইমধ্যে ঢাকায় গোপনে আরো একটি বিয়ে করেন জাহিদুল। এছাড়া গত বছরের ১২ ডিসেম্বর কৌশলে দুই ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে জিম্মি করে মুনিয়ার কাছ থেকে তালাকনামায় স্বাক্ষর নেন। পরে দুই ছেলেকে ফেরত চাইলে জাহিদুল ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী সুমনা বেগম সন্তানদের মারধরসহ জীবননাশের হুমকি দিয়ে মুনিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরে মুনিয়া কোনো উপায় না পেয়ে ঢাকায় চলে যান এবং পোশাক কারখানায় কাজ করতে থাকেন।

আশপাশের পরিচিত লোকজনের মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে মুনিয়া জানতে পারেন, প্রায়ই শিশু দুটিকে সৎমা সুমনা নির্যাতন করেন। ঠিকমতো তাদের খেতে দেন না। ৯ আগস্ট রাতে জাহিদুলের উপস্থিতিতে সৎমা সুমনা দুই শিশুকে চড়-থাপ্পড়সহ লাঠি দিয়ে পিটিয়ে জখম করেন। এ সময় দুই শিশুর মাথায়, বুকে, পিঠে লাথি ও ধারালো ছোরা দিয়ে আঘাত করা হয়। ঘটনার সময় প্রতিবেশীরা দুই শিশুকে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হন। পরে দুই শিশুকে নির্যাতনের ঘটনায় মমতাজ নিগার সঙ্গীতা চৌধুরী নামে মুনিয়ার এক ননদ প্রতিবাদ করলে তাকেও মারধর, হত্যাসহ মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির হুমকি দেন জাহিদুল ও সুমনা। পরদিন পীরগঞ্জ থানায় জিডি করেন সঙ্গীতা।

আরো পড়ুন: শাশুড়িকে হত্যা করতে ৫ হাজার টাকায় লোক ভাড়া করেন পুত্রবধূ

পরবর্তীতে দুই শিশুর মা মুনিয়া মোবাইল ফোনে বিভিন্নজনের কাছ থেকে ঘটনা জানতে পেরে ১৯ আগস্ট পীরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। এতে কাজী জাহিদুল ইসলাম সেতুকে প্রধান ও সুমনা বেগমকে দুই নম্বর আসামি করা হয়। ৩ সেপ্টেম্বর পীরগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন সেতু ও সুমনা। সেখান থেকে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক। এ সময় শিশুরাও আদালতে উপস্থিত ছিল। পরে ম্যাজিস্ট্রেট শিশু দুটিকে তাদের দাদার জিম্মায় দেন।

ওই এলাকার খন্দকার শামীম তাবাসসুম ও কাজী রেলা বলেন, সৎমা সুমনা অমানবিকভাবে দুই শিশুকে নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। আমরা বিভিন্ন সময় নিষেধ করেছি। তিনি আমাদের কথা রাখেননি। ঘটনার দিন দরজা বন্ধ করে নির্মমভাবে দুই শিশুকে পেটান সুমনা।

সন্তান দুটির মা মুনিয়া আক্তার বলেন, জোর করে তালাকনামায় স্বাক্ষর নিয়ে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়। এরপর থেকে আমার দুই সন্তানকে নির্যাতন করেছেন তারা। ঠিকমতো খেতেও দেননি।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, একজন উপ-সচিব আসামিদের আত্মীয় হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে মামলা তুলে নেয়ার জন্য আমাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে। আবার জাহিদুলও বিচারকের গাড়িচালক পরিচয় দিয়ে আদালতসহ বিভিন্ন মানুষকে প্রভাবিত করছে। আমি একা, এজন্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

আরো পড়ুন: সেই ভয়ংকর রাতের বর্ণনা দিলেন ইউএনও ওয়াহিদার বাবা

শিশু দুটির দাদা কাজী শামিম আহম্মেদ মুঠোফোনে বলেন, শিশুদের আমার জিম্মায় দিয়েছে আদালত। বর্তমানে তারা ভালো আছে। প্রথমে শিশু দুটিকে উদ্ধারের পর পীরগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ। সেখানকার ব্যবস্থাপত্র মোতাবেক চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পীরগঞ্জ থানার এসআই মিলন বলেন, নির্যাতনের বিষয়টি খুবই অমানবিক। এ ঘটনার তদন্ত চলছে। মেডিকেল সার্টিফিকেট পেলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতামত নিয়ে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।

মমতাজ নিগার সঙ্গীতা চৌধুরীর করা জিডির বিষয়ে তিনি বলেন, তদন্তের অনুমতি পেলে অবশ্যই সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!