মাঝির লোভ কেড়ে নিল ১৮ পর্যটকের প্রাণ
বর্ষা আসলেই নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল পায় ভিন্ন এক রূপ। এর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য কাছে টানে পর্যটকদের। আর একে কেন্দ্র করে মদন উপজেলার উচিৎপুর ট্রলার ঘাটে থাকে পর্যটকদের ভিড়। দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাওরের সৌন্দর্য দেখতে পর্যটকরা আসেন ওই এলাকায়।
এ বিষয়টিকে মাথায় রেখে এখানকার নৌকা বা ট্রলার ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ঘাটে পর্যটকদের ভিড় দেখলে মাঝিরা তাদের নৌকায় কে কত বেশি পর্যটক উঠাতে পারেন, তার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেন। অনেকে নৌকার ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ-তিনগুণ যাত্রী নিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। ফলে প্রায়ই ঘটছে নৌকা বা ট্রলার ডুবিতে প্রাণহানির ঘটনা।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ আগস্ট ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। ঘটনার পর থেকে ট্রলারটি পুলিশের হেফাজতে থাকলেও নৌকার মালিক ও চালকসহ অন্যরা রয়েছে পলাতক।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, হাওর এলাকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে জেলা ও জেলার বাইরের বিভিন্ন স্থান থেকে ভ্রমণ পিপাসুরা আসেন নেত্রকোনার মদন উপজেলার উচিৎপুর ট্রলার ঘাটে। নীল আকাশ আর বিশাল জলরাশির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে ঘাট থেকে রিজার্ভ বা পাবলিক ট্রলার ভাড়ায় নেন। হাওরের আশপাশ এলাকা ঘুরে হাওর পাড়েই গড়ে ওঠা ব্যক্তি মালিকানাধীন বিভিন্ন খাবার হোটেলে খাবারও খান।
স্থানীয় ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানান, গত ৫ আগস্ট ময়মনসিংহসহ নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ৪৮ জন পর্যটক উচিৎপুর ট্রলার ঘাট থেকে লাহুত মিয়ার যাত্রীবাহী ইঞ্জিন চালিত ট্রলারে ওঠেন। বৈরী আবহাওয়া এবং ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী তুলেন নৌকার মাঝি লাহুত মিয়ার ভাতিজা খাইরুল। কিন্তু উত্তাল হাওরের প্রচণ্ড ঢেউয়ের মধ্যেই নৌকাটি ঘাট থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূর অতিক্রম করে ফেলে। যাত্রীদের বেশিরভাগই ট্রলারটির ছাদে ওঠে আনন্দ করতে থাকে।
এদিকে বাতাসের মধ্যেই ট্রলারটি রাজালীকান্দায় পৌঁছাতেই মাঝি ঢেউয়ের তাণ্ডবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কাত হয়ে উল্টে যায় নৌকা। পরে যাত্রীরা দিক-বেদিক ছোটাছুটি করতে থাকলে নৌকাটি উল্টে ডুবে যায়। এ সময় ৩০ জন সাঁতরে পাড়ে উঠতে পারলেও বাকিরা তলিয়ে যায়।
খবর শুনে স্থানীয় ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যৌথভাবে প্রায় ৩ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে ১৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। পরবর্তীতে একজনের লাশ পরদিন ভেসে ওঠে। ঘটনার পর থেকে নৌকার মালিক ও মাঝির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রশাসন এ ঘটনায় কঠোর নিয়ন্ত্রণে গেলেও নৌকার মালিক ও মাঝিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ নিয়ে সাধারণ মানুষসহ এলাকাবাসীর মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘুরতে আসা পর্যটকরা জানান, কোনো নজরদারিই ছিল না এতদিন প্রশাসনের। যে যেভাবে খুশিমতো ভাড়া, যাত্রী বোঝাই করে চলেছে। এমনকি পর্যটকদের সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগও রয়েছে। ঘটেছে অনেক শ্লীলতাহানি। এর কারণে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে।
এ ব্যাপারে মদন থানার ওসি রমিজুল হক জানান, এ ঘটনায় এখনো কোনো অপমৃত্যু মামলা হয়নি। নৌকার মালিক ও মাঝিদের নাম ঠিকানা সংগ্রহ করা হয়েছে।
এদিকে ফায়ার স্টেশনের অফিসার আহমেদুল কবির বলেন, ৩০ জন যাত্রীরস্থলে প্রায় ৫০ জন নিয়ে যাওয়ায় এমনটি ঘটেছে।
ইউএনও বুলবুল আহমেদ জানান, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে গুরুত্ব দিয়ে। যে বা যারাই দোষী হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি নৌকা চালালে লাইফ জ্যাকেটসহ নিরাপত্তার সব সরঞ্জামাদি রাখতে হবে।