ইতিহাসের ৫ শক্তিশালী শাসক, যাদের মৃত্যু হয়েছিল নৃশংসভাবে
“জম্মিলে মরিতে হবে,
অমর কে কোথা কবে?”
মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই কথাটি আমাদের জীবনের একটি অপ্রিয় সত্য। কারণ মৃত্যুর থেকে চরম বাস্তব আর কিছুই নেই। আর এই মৃত্যু থেকে বাদ যায়নি বড় বড় রাজা-মহারাজারাও।
আমাদের ইতিহাসে এমন বহু শাসক ছিলেন, যারা নিজেদের শক্তিশালী সাম্রাজ্যের জন্য বিশ্ব বিখ্যাত হয়ে গেছেন। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন নৃশংস, আবার অনেকেই ছিলেন মহান। আজ জানাবো ইতিহাসে এমন পাঁচজন শক্তিশালী শাসকের সম্পর্কে, যাদের মৃত্যু হয়েছিল খুবই নৃশংসভাবে। চলুন তবে জেনে নেয়া যাক তাদের সম্পর্কে-
আলাউদ্দিন খিলজি
ভারতের অন্যতম শাসক আলাউদ্দিন খিলজি। যাকে অনেকেই মহান ভাবে, আবার অনেকে তাকে নৃশংস মনে করেন। তবে আলাউদ্দিন খিলজির জীবনের শুরুটা কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না। সুলতান হওয়ার জন্য তিনি অনেক লড়াই করেছিলেন। আর ভারত একটি বিশাল বড় সাম্রাজ্যে তৈরি করেছিলেন। আলাউদ্দিন খিলজির জীবনে বহু রহস্যের মধ্যে তার মৃত্যু একটি বড় রহস্য হয়ে রয়ে গেছে। তার মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগেও কেউ বুঝতেও পারেনি যে তিনি মারা যাবেন, কারণ তিনি কোনো রোগের শিকার হননি বা কোনো যুদ্ধে যাননি। এবার প্রশ্ন হলো আলাউদ্দিন খিলজি তাহলে কীভাবে মারা গিয়েছিলেন?
ঐ সময় একজন বিখ্যাত লেখক ছিলেন জিয়াউদ্দিন বারানী। তিনি বলেন, আলাউদ্দিনের মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল মালিক কাফুর। যে দিল্লির গদিতে বসার জন্য ১৩১৬ সালের ৪ জানুয়ারি ঘুমের মধ্যেই আলাউদ্দিনকে হত্যা করেন, এই সময় আলাউদ্দিনের বয়স ছিল মাত্র ৪৯ বছর। আর আলাউদ্দিন খিলজির কবর বর্তমানে দিল্লির কুতুবমিনার কমপ্লেক্সে রাখা আছে।
চেঙ্গিস খান
বলা হয় ইতিহাসে সবথেকে নৃশংস যতজন শাসক আছেন, তাদের মধ্যে চেঙ্গিস খান অন্যতম। চার কোটি মানুষের হত্যাকারী, হাজার হাজার নারীর ধর্ষণকারী। এই চেঙ্গিস খানের মৃত্যু আজও রহস্য হয়ে রয়ে গেছে। চেঙ্গিস খান ১২২৭ সালের ২৫ শে আগস্ট ৬৫ বছর বয়সে মারা যান। তবে তিনি কীভাবে মারা গিয়েছিলেন এই নিয়ে কোনো সঠিক তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায়নি। কারণ চেঙ্গিস খান নিজেই চাননি, তার মৃত্যু নিয়ে মানুষ বেশি চর্চা করুক। কেউ মনে করেন চেঙ্গিস খানের মৃত্যু একটি অজ্ঞাত রোগের কারণে হয়েছে। আবার কেউ মনে করেন চেঙ্গিস খানের মৃত্যু একটি যুদ্ধে আহত হওয়ার কারণে হয়েছিল। মৃত্যুর পাশাপাশি চেঙ্গিস খানের কবরও একটি রহস্য হয়ে রয়ে গেছে।
কারণ আজ পর্যন্ত এটা জানা যায়নি যে, চেঙ্গিস খানের কবর কোথায় রয়েছে। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন চেঙ্গিস খানেক কখনো কবর দেওয়া হয়নি। বরং তার মৃত শরীরের উপরে হাজার হাজার ঘোড়া দৌড় করানো হয়েছিল। যাতে তার শরীরের অবশিষ্ট না থাকে। আর এটা চেঙ্গিস খানের নিজের ইচ্ছে ছিল। তিনি মৃত্যুর আগে নিজের উত্তরাধিকারীদের কাছে এই আদেশ দিয়ে যান যে, মৃত্যুর পর তার কবর মৃতদেহ সন্ধান যেন কেউ না পায়। আর হয়েছিল ঠিক তাই।
তৈমুর লং
ইতিহাস আরেকজন শক্তিশালী শাসক ছিলেন তৈমুর লং। যিনি ভারতের দিল্লি জয় করেছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে তিনি ঠিক করেছিলেন, চীন দখল করবেন। আর এই কারণে তিনি তার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে চীনের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। আর সেই সময় তার কাছে যে শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছিল, তাতে তিনি যুদ্ধে জিতেও যেতেন। তবে চীনের ঠান্ডা তৈমুর লং-এর জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। ঠান্ডার কারণে শারীরিক অসুস্থতায় ভোগেন তৈমুর লং। আর খুব কষ্ট পেয়ে তিলে তিলে তিনি মারা যান।
বলা হয়, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৪০৫ সালে তৈমুর লং মারা যান। তার মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ উজবেকিস্তানের সমরকন্দে কবরে দেওয়া হয়েছিল। তবে তৈমুর লং-এর কবর নিয়ে একটি রহস্য রয়েছে। এই কবরের উপর থাকা একটি পাথরের উপর লেখা আছে, 'এই কবর যে খুলবে, তার জীবনে আমি অভিশাপ হয়ে আসবো।' আর অবাক করার বিষয় হলো ইতিহাসে বেশ কয়েকজন শাসক তৈমুর লং-এর কবর খোলার চেষ্টা করেছিলেন। আর তার ফলও তারা ভোগ করেন।
১৯৪১ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্ট্যালিন তৈমুর লং-এর কবর খোলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি এসব অন্ধবিশ্বাসকে মানতেন না। রাশিয়ার আর্কিওলজিস্টরা ১৯শে জুন ১৯৪১ সালে তৈমুর লং-এর কবর খোলেন। আর এর তিনদিনের মধ্যেই হিটলার হঠাৎ রাশিয়ার উপর আক্রমন করে দেয়। আর এই যুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ সৈন্য প্রাণ হারায়। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক চাপে স্ট্যালিন আবার তৈমুর লং-এর কবর বন্ধ করে দেন। আর এই কবর বন্ধ করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জার্মানি সৈন্যরা রাশিয়া থেকে পিছু হটতে শুরু করে।
আরতুগ্রুল গাজী
ইতিহাসে যে কয়েকজন মুসলিম শাসক এসেছিলেন, তাদের মধ্যে আরতুগ্রুল গাজী অন্যতম। লাগাতার মোঙ্গলদের আক্রমণে যখন মধ্য এশিয়ার মুসলিম জনগণ ভেঙে পড়েছিল, তখন তাদের মাসিহা হয়ে সামনে এসেছিলেন আরতুগ্রুল গাজী। আর তিনি অটোমান সাম্রাজ্যের ভিড় তৈরি করেছিলেন। তবে আরতুগ্রুল গাজীর মৃত্যু কোনো যুদ্ধ বা রোগের কারণে হয়নি। তিনি দীর্ঘদিন শাসন করেছিলেন। ১২৮০ সালে বার্ধক্যের কারণে তার মৃত্যু হয়। আরতুগ্রুল গাজীর কবর তুর্কিস্তান সোগুত শহরে রয়েছে। সেখানে তিনি বেঁচে থাকাকালীন যে কয়টি রাজ্য দখল করেছিলেন, সেই সব এলাকার মাটি দিয়ে তাকে কবর দেয়া হয়েছিল।
দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর
যিনি মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট ছিলেন। যে মুঘল সাম্রাজ্য একটা সময় ভারতের রাজ করতো, সেই মুঘলদের ছলে-বলে-কৌশলে দুর্বল করে দিয়েছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। বাহাদুর শাহ জাফর দিল্লির শেষ শাসক ছিলেন। যিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে সেই সময় মুঘলদের থেকে ব্রিটিশরা অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। তাই ব্রিটিশদের সামনে টিকতে পারেনি মুঘল সৈন্যরা।
যুদ্ধে হেরে ব্রিটিশদের কাছে বন্দী হয়ে যান বাহাদুর শাহ জাফার। সে সময় ব্রিটিশরা বাহাদুর শাহ জাফরকে রেঙ্গুনে পাঠিয়ে দেয়। ১৮৭২ সালে ৭ নভেম্বর ৮৭ বছর বয়সে খুবই কষ্ট পেয়ে তিনি তিলে তিলে মারা যান। বলা হয় বাহাদুর শাহ জাফরের শেষ ইচ্ছে ছিল, যে তাকে তার পরিবারের লোকজনের পাশে যেন কবর দেওয়া হয়। মানে দিল্লিতে। তবে ইংরেজরা তার সেই শেষ ইচ্ছেকেও সম্মান জানায়নি। বাহাদুর শাহ জাফরের মৃতদেহকে রেঙ্গুনেই কবর দেওয়া হয়েছিল।