ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

[ সাতরং ]

গরুর সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক, গোমূত্র পানেই মেলে তাদের সুস্থতা

সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭:০০, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
গরুর সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক, গোমূত্র পানেই মেলে তাদের সুস্থতা
ছবি: রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয় গোমূত্র

দক্ষিণ সুদানের সেন্ট্রাল ইকুয়েটরিয়া অঞ্চলে বসবাসরত মুন্ডারি আদিবাসীদের বসবাস। তারা রাজধানী জুবার উত্তর নাঈল নদীর তীরে বসবাস করে। মুন্ডারি আদিবাসীদের প্রধান পরিচয় হলো তারা রাখাল সম্প্রদায়। গরু লালন-পালনকে কেন্দ্র করেই তাদের জীবন আবর্তিত হয়। গরু তাদের প্রধান সম্পদ। রাখাল হিসেবে মুন্ডারি আদিবাসী বিশ্বের অন্য সব রাখার সম্প্রদায়ের থেকে অধিক পরিশ্রমী। তাদের পালিত গরুর জাত অনেক উন্নত ও আর্থিক বিবেচনায় বেশ দামি। 

আরো পড়ুন: বিশুদ্ধ পানির ‘গজনী দিঘী’, ২৫০ বছরেও শুকায়নি

বিশেষত তারা ‘আনখল-ওয়াতুসি’ নামের এক প্রজাতির গরু লালন-পালন করে থাকেন। যাকে ‘গবাদি পশুর রাজা’ বলে অবিহিত করা হয়। এই গরু আট ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে, যা আমাদের দেশের গরুর তুলনায় বৃহদাকৃতির। গড়ে প্রতিটি গরুর মূল্য ৫০০ মার্কিন ডলার।আফ্রিকার কোনো অঞ্চলের গবাদি পশুর এই পরিসংখ্যান অনেকটা অবাক করার মতো। ফলে এই সম্পদ মুন্ডারিদের কাছে এই গরুগুলো স্বর্ণের চেয়েও দামি সম্পদে রূপান্তরিত হয়েছে। 

মুন্ডারিরাতবে সম্পদের মূল্য যত বেশি হয়, মালিকদের ঝুঁকিও তত বেশি। তাই রাত জেগে সম্পদ পাহারা দেয়া তাদের অভ্যাস কিংবা দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। আনাড়ি রাখালদের বন্দুক হাতে দিন-রাত গবাদিপশু পাহারা দিতে দেখা যায়। তবুও কখনো কখনো তাদের গবাদিপশু চুরি হয়ে যায়। স্থানীয় প্রভাবশালী দুষ্টচক্র এই কাজ করে থাকে। এ যেন এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প। যার নেই কোনো বিচার, নেই কোনো সম্পদ ফিরে পাওয়ার কিংবা ক্ষতিপূরণের আশ্বাস।

আরো পড়ুন: জ্বলছে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’, ধুকছে বন্যপ্রাণীরা

প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার ও সাংবাদিক তারিক যায়িদি মুন্ডারিদের জীবনযাপন অবলোকন ও পর্যবেক্ষণ করতে তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন। এসময় তিনি মুন্ডারিদের অসাধারণ কিছু মুহূর্ত তার ক্যামেরায় ধারণ করেছেন। যায়িদি শুধু মুন্ডারি নয়, আফ্রিকার প্রায় ৩০টি আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের জীবনবোধ ও সংস্কৃতি তার ক্যামেরায় ধারণ করেছেন এবং তাদের নিয়ে গবেষণাপূর্ণ ডকুমেন্টারি তৈরি করেছেন। তবে তিনি কখনো, কোথাও পশুদের সঙ্গে মানুষের এমন ঘনিষ্ঠপূর্ণ সম্পর্ক অবলোকন করেননি। বিশেষত মুন্ডারি পুরুষদের সঙ্গে তাদের পালিত গরুদের সম্পর্ক অবাক করার মতো।

আট ফুট লম্বা হয় এসব গরুযায়িদি বলেন, মুন্ডারি রাখালদের সঙ্গে গবাদিপশুর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও আত্মিক। তাদের কাছে গবাদিপশুর গুরুত্ব বলে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই পশুরাই তাদের জীবনের সবকিছু। প্রায় সব পুরুষই আমাকে দেখে তাদের পছন্দের পশুর সঙ্গে ছবি তুলতে চেয়েছে। এমনকি তাদের স্ত্রী ও শিশুরাও তাদের প্রিয় পশুর সঙ্গে ছবি তুলতে চেয়েছে। এর মধ্যে ‘আনখল-ওয়াতুসি’ প্রজাতির গরু মুন্ডারিদের কাছে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ গবাদি পশু। অনেক সময় এই প্রজাতির গরুরা তাদের উপাসনার লক্ষ্যবস্তুতেও পরিণত হয়। 

আরো পড়ুন: নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসতে পারে এসব ফুলের গন্ধে!

সাধারণত মাংস খাওয়ার জন্য তারা নিজেদের গরু কখনো হত্যা করে না। যদিও এর বাজারমূল্য অত্যন্ত চড়া হওয়ার কারণে অধিকাংশ মুন্ডারি সদস্যের কাছে গরুর মাংস খাওয়া বিলাসিতাপূর্ণ ব্যাপার মাত্র। তবে গরু তাদের হাঁটাচলার সঙ্গী, পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য, একটি মহিমান্বিত সম্পদ ও রোগের প্রতিষেধক।  সর্বোপরি একজন উত্তম বন্ধু। ফলশ্রুতিতে গরু শুধুমাত্র তাদের সম্পদ নয়, জীবন পরিচালনার একটি পথও বটে।

গুর পালনই মুন্ডারিদের প্রধান কাজযায়িদির বর্ণনামতে, মুন্ডারিরা আকৃতিতে লম্বা ও পেশীবহুল স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে থাকে। তাদেরকে দেখতে বডি বিল্ডারের মতো মনে হয়। তবে তাদের খাদ্যাভ্যাস খুব সাধারণ, নিয়মতান্ত্রিক। তারা প্রচুর পরিমাণ দুধ ও দই খেয়ে থাকেন। এটাই তাদের সুস্বাস্থ্যের গোপন রহস্য। তারা গরুর প্রস্রাবও পান করে থাকেন। গরু যখন প্রস্রাব করে, মুন্ডারি পুরুষরা তখন নুইয়ে পড়ে তা মুখে ধারণ করেন। তাদের ভাষ্যমতে, এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং এতে থাকা অ্যামোনিয়া তাদের চুলকে কমলা রঙে রাঙিয়ে তুলতে সাহায্য করে।

আরো পড়ুন: ভারতের সীমান্তে নগ্ন এক গোষ্ঠী, এরা কারা?

এছাড়া গরুর গোবর তারা রান্নার কাজে ব্যবহার করেন। এতে পীচ-রঙের সুন্দর ছাই উৎপাদন হয়। এই ছাইকে তারা জীবাণুনাশক হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। রোদের তীব্রতা থেকে ত্বক সুরক্ষিত রাখতে তারা এই ছাই ব্যবহার করে থাকেন।
যায়িদি জানান, তাদের পালিত ‘আনখল-ওয়াতুসি’ বিশ্বের সবচেয়ে আদুরে স্বভাবের গরু হিসেবে পরিচিত। ফলে তাদের সেবা-যত্ন অনেক বেশি করতে হয়। 

গরুই তাদের বন্ধুমুন্ডারি রাখালরা প্রতিদিন দুবার করে তাদের শরীর মালিশ করে দেন। গোবরের ছাই টেলকম পাউডারের মতো তাদের দেহে মাখিয়ে দেন, যা তাদের ক্ষতিকর জীবাণু থেকে সুরক্ষিত রাখে। তাদের ত্বক পরিষ্কার করতে এবং থাকার ঘরেও এই ছাই বিছিয়ে দেয়া হয়। মশাদের হাত থেকে রক্ষা করতে তাদের ঘরের চারপাশে নান্দনিক উপায়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এছাড়া মুন্ডারিরা গবাদি পশুর সঙ্গেই ঘুমান। 

যায়িদি বলেন, আক্ষরিক অর্থে তারা তাদের পশুদের থেকে মাত্র দুই ফুট দূরে রাত্রিযাপন করেন এবং তাদের মধ্য থেকে একজন সেখানে বন্দুক হাতে গবাদি পশুর পাহারা দেন। অকারণে তারা পশুর এত নিকটে রাত্রিযাপন করেন না। পশুর ডাক ও খচমচ আওয়াজ তাদের জন্য একটি বড় ব্যাপার। যেন এই আওয়াজ ছাড়া তারা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন না।

গরুর গোবরের ছাই তারা শরীরে মাখেগবাদি পশু মুন্ডারিদের কাছে অর্থ-সম্পদ ও মর্যাদার প্রতীকও বটে। তাদের পারিবারিক প্রথায় যৌতুক হিসেবে গবাদি পশুর গুরুত্ব সর্বাধিক। গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলে হাজার হাজার পুরুষ নববধূর সন্ধানে দক্ষিণ সুদানে ফিরে আসে। তখন একটি জটিলতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যাদের অধিক গবাদি পশু আছে, তারা এর বিনিময়ে ‘নববধূ ক্রয়ের’ মতো নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা ও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। একপর্যায়ে তা ভয়ানক দাঙ্গার সৃষ্টি করে।

এই দাঙ্গা ছিল মুন্ডারিদের জন্য আত্মঘাতি। যুদ্ধের রেশ শেষ হতে না হতেই এই ধাক্কা ছিল নির্মম ও পীড়াদায়ক। যদিও দাঙ্গার চেয়ে গৃহযুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ছিল বহুমুখী ও ব্যাপক, এতে তাদের গবাদি পশুর চারণভূমি পরিণত হয়েছিল ভয়ানক এক জুয়ার আসরে। এ কারণে মুন্ডারিরা বাধ্য হয়ে তখন নাঈল নদীর বুকে গড়ে ওঠা ছোট একটি দ্বীপে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। তবে এখন সেখানেই তারা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এটি তাদের জন্য এক দ্বিমুখী সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে।

গরুর বিনিময়ে তারা স্ত্রী ক্রয় করেযায়িদি বলেন, যুদ্ধ মুন্ডারি জনগোষ্ঠীকে বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। তারা নিরাপত্তার ভয়ে শহরে আসতে পারছেন না। তাদের বর্তমান আবাসস্থলের অবস্থা খুবই নাজুক। ফলে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও প্রচণ্ডভাবে ব্যহত হচ্ছে। যুদ্ধ থেকে মুন্ডারিদের বিশেষ কোনো অর্জন নেই। যুদ্ধে তাদের কোনো অংশগ্রহণও ছিল না। তাদের বন্দুক কাউকে হত্যা করে না। তবে তাদের পালিত পশুদের নিরাপত্তা প্রদান করে।

সর্বোপরি, মুন্ডারিরা তাদের পালিত পশুদের অত্যন্ত সুন্দরভাবে সেবা-যত্ন করে থাকেন এবং জীবনের বিনিময় হলেও তা তারা রক্ষা করতে চান। বাণিজ্যিক দিক বাদ দিলেও পশুদের প্রতি তাদের গভীর প্রেম বিশ্বের অন্যান্য রাখালশ্রেণীর তুলনায় অনেক উচ্চাঙ্গে। তাই পৃথিবীও এই রাখালদের গভীর প্রেমে আবদ্ধ করুক, এটাই আমাদের কামনা।  মানুষ ও অন্য প্রাণীর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা কতটা দৃঢ় হতে পারে মুন্ডারিরা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। টিকে থাক এই অন্যন জাতিগোষ্ঠী।

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএমএস
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!