বাংলার প্রথম ছাপাখানায় বই নয়, ছাপা হয়েছিল ক্যালেন্ডার
সকালের চায়ের সঙ্গে পত্রিকাটা না পড়লে দিনটাই যেন ভালো যায় না। এই অভ্যাস বাঙালির বহু পুরনো। তবে কীভাবে ভোর হতেই আপনার হাতে পৌঁছে যায় সারাবিশ্বের খবর। কখনো ভেবেছেন কি কীভাবে বাংলায় শুরু হলো প্রেস। জানেন কি? বাংলার প্রথম প্রেসে কোনো বই বা পত্রিকা নয়, ছাপা হয়েছিল ক্যালেন্ডার।
ছাপাখানা বা প্রিন্টিং প্রেস বলতে কোনো লেখা বা ছবিকে যন্ত্রের মাধ্যমে কাগজে উপস্থাপন করাকে বুঝানো হয়। বিশাল পরিমাণে এবং অল্প সময়ে অনেক বেশি মূদ্রণ করার জন্যই ছাপাখানার ব্যবহার হয়ে থাকে। সাধারণত বিভিন্ন গ্রন্থ বা এর লেখা ছাপার জন্যই ছাপাখানা ব্যবহার হয়ে থাকে। যাবতীয় বই, পত্রিকা, বিজ্ঞাপন প্রচারপত্র সবই এই ছাপা খানার অবদান। ছাপাখানার উদ্ভাবন ও ছড়িয়ে যাওয়া ছিল দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সবচেয়ে যুগান্তকারী ঘটনা। মানুষ কীভাবে সমাজে বসবাস করছে, তাদের বিভিন্ন বিপ্লব ও উত্থান-পতন ছাপার মাধ্যমেই তুলে ধরতে শুরু করে এবং সেখান থেকেই আধুনিক যুগের সূচনা।
অক্ষর আর কাগজের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তো আজকের নয়। সেই আঠেরোশো শতক থেকে যাত্রা শুরু। মনে পড়ে বিভূতিভূষণের কিশোর অপুর কথা। ছাপাখানার কাজ, নতুন কাগজ, আঠার গন্ধ, পাতলা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে দাঁড়িয়ে থাকা রোগাটে এক কিশোর কাজ করে যাচ্ছে। সঙ্গে মেশিনের ঘটর ঘটর শব্দ সত্যজিৎ রায়ের ক্যামেরা পুরো বিষয়টাকেই ধরে রেখেছিল। ছাপাখানা, বই আর শব্দের এই চিরন্তন সম্পর্ক কোথাও আমাদের আবহমান ঐতিহ্যের মধ্যেও ঢুকে গিয়েছে।
আরো পড়ুন: সকাল-সন্ধ্যা এই রাস্তাগুলোতে থাকে ভূতের আনাগোনা
বাংলার প্রথম ছাপাখানা কোনটি? এই বিষয় সামান্য মতভেদ আছে। কারোর মতে, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুদ্রণযন্ত্রটি স্থাপিত হয় ১৫৫৬ সালে, গোয়ায়। কাজটি করেন পর্তুগিজরা। ১৫৬৭ সালে গোয়ার ছাপাখানা থেকে এ অঞ্চলের প্রথম বইটি ছেপে বের হয়। খ্রিস্টান মিশনারিরা তাদের ধর্মীয় ভাবনা বিভিন্ন প্রকাশনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতেন। তবে বাংলায় প্রথম ছাপাখানা স্থাপিত হয় ১৭৭৭ সালে। কলকাতার জেমস অগাস্টাস হিকির ছাপাখানা প্রথমে শুরু হয়েছিল। তবে দুইটিই যে খুব কাছাকাছি সময় প্রতিষ্ঠিত, তা বলাই যায়। এদের কথায় আসার আগে ছুঁয়ে যেতে হবে একটি অখ্যাত ক্যালেন্ডারকে। ১৭৭৭ সালে যোহান জাকারিয়া কিয়েরনানডার নামের এক পাদ্রি বাংলার ছাপাখানায় একটি বিশেষ ক্যালেন্ডার তৈরি করতে আগ্রহী হন। সেই সুবাদেই ঐ বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত হয় ক্যালেন্ডার ফর দ্য ইয়ার অব আওয়ার লর্ড এমডিসিসিএলএক্সএক্সভিআইআইআই ক্যালকুলেটর টু দ্য মেরিডিয়ান অব ক্যালকুলেট। নতুন হলেও ছাপাখানা তখন এসে গেছে বাংলায়। তার হাত ধরেই এই ক্যালেন্ডারের প্রকাশ। তবে উল্লেখ্য, এই ক্যালেন্ডারটি কিন্তু ইংরেজিতে লেখা হয়েছিল। বাংলা অক্ষরের সঙ্গে এর কোনো যোগাযোগই ছিল না।
১৭৭২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি নিয়ে ভারতের মাটিতে পা রাখলেন বছর বাইশের এক যুবক। নাম নাথানিয়েল ব্রাসলে হালেদ। কাজ করতে করতে ক্রমশ বাংলার গভীরে ঢুকে পড়া, অতঃপর বাংলা ভাষা শেখা। একসময় নাথানিয়েল ঠিক করলেন, একটা আস্ত বই লিখবেন। তখন কর্মসূত্রে তিনি হুগলিতে। ১৭৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি থেকেই প্রকাশিত হয় তার আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাংগুয়েজ গ্রন্থটি। ইংরেজি নাম হলেও বইটি ছিল বাংলাতে। অ্যান্ড্রুজ নামক এক ইংরেজ ভদ্রলোক হালেদের বইটি ছেপেছিলেন তার নিজস্ব ছাপাখানা থেকে। ঐতিহাসিক এই ছাপাখানাটি ‘অ্যান্ড্রুস প্রেস’ নামে সবার কাছে পরিচিত।
বাংলা হরফ নির্মাণকারী তথা বাংলা ছাপাখানা ও মুদ্রণশিল্পের জনক হিসেবে যাকে আমরা জানি তিনি ব্রিটিশ সিভিলিয়ান স্যার চার্লস উইলকিন্স। ছেনি কেটে হরফ তৈরির কৌশল তিনি লন্ডনে থাকার সময়ই আয়ত্ত করেছিলেন। ভারতে এসে সেই বিদ্যা কাজে লাগান। হালেদের অনুরোধে উইলকিন্স পর পর সাজানো ধাতুনির্মিত চলনশীল বাংলা হরফ তৈরি করেছিলেন। হরফ নির্মাণে উইলকিন্সের সহযোগী ছিলেন বাঙালি খোদাইশিল্পী পঞ্চানন কর্মকার। হুগলির ত্রিবেণীর অধিবাসী পঞ্চাননই একমাত্র বাঙালি, যিনি ঢালাই করা চলনশীল ধাতব হরফ তৈরি করার কৌশল রপ্ত করতে পেরেছিলেন। ১৭৯৩ সালে কর্নওয়ালিসের কোড মুদ্রিত হয় পঞ্চাননের তৈরি অক্ষরে। ১৭৮৫ সালে জোনাথন ডানকানের ‘ইম্পে কোড’-এর বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয় তার তৈরি হরফে। মূলত ডানকানের এই গ্রন্থের মাধ্যমেই বাংলা গদ্য রচনার সূচনা হয়।
এরমধ্যে কলকাতাও একটা যুগান্তকারী ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। জেমস অগাস্টাস হিকি নামে এক ব্রিটিশ সাহেব প্রায় ঐ সময়ই কলকাতার বুকে তৈরি করেন নিজের একটি ছাপাখানা। বাংলার মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাস এই দুই জায়গাকে এক করে দেয়। হুগলি আর কলকাতার হাত ধরে যে যাত্রাটা শুরু হয়, পরবর্তীতে সেটাই দিশা দেখায় পুরো বাংলাকে। কলকাতার নিজের ছাপাখানা থেকেই ১৭৮০ সালে হিকি সাহেব বের করলেন নিজস্ব সংবাদপত্র ‘হিকির বেঙ্গল গেজেট’। বাংলার প্রথম সংবাদপত্র এটি। ইতিহাসের ভেতর দিয়েই তৈরি হয়েছিল আরো একটি ইতিহাস। পরবর্তীকালে এই সারণি ধরেই উঠে আসা গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের বাঙ্গাল গেজেট। যা কিনা বাংলা ভাষার আদি সংবাদপত্র। আজ অবশ্য এই বিশেষ পত্রিকাটির কোনো সংখ্যারই অস্তিত্ব নেই। ছিল গঙ্গাপ্রসাদের নিজস্ব ‘বাঙ্গালী প্রেস’। অনুপ্রেরণা সেই হিকি সাহেব আর হুগলির নাথানিয়েল সাহেব।
আরো পড়ুন: বিশ্বের প্রথম চর্বিমুক্ত সাবানের বিজ্ঞাপনে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ
তবে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুরের মিশন প্রেস থেকেই বাংলা ভাষায় বাইবেল প্রকাশিত হয়। ধর্ম প্রচারের কাজে, শিক্ষা প্রচারের কাজে এই প্রেসের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। উইলিয়াম কেরির সঙ্গে এখানে যুক্ত হন মুদ্রণ বিশারদ উইলিয়াম ওয়ার্ড। পরবর্তীতে হরফ শিল্পী হিসেবে পঞ্চানন কর্মকারও এখানে যোগ দেন। বাংলার মুদ্রণ শিল্প চর্চা এগিয়ে চলে দুর্বার গতিতে। গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে শ্রীরামপুর প্রেসের নাম এবং সেখানকার কাজের কথা। শুধু বিদেশি পাদ্রি, সাহেবরাই নন, বাঙালিরাও এই বিরাট কর্মোদ্যোগের সাক্ষী থাকেন। আজকালকার উন্নত ব্যবস্থা, উন্নত যন্ত্র, প্রযুক্তি কিছুই কাগজের মোহ কাটাতে পারেনি। লেটারপ্রেস, অফসেট থেকে ডিজিটাল দুনিয়া সব কিছুই সাক্ষী বাংলা। তবে সবকিছু ছাপিয়ে সকালের পত্রিকা কিংবা নতুন বই হাতে নিয়ে পড়ার মজা অন্য কিছুতেই পাওয়া যাবে না।
তবে বাংলাদেশের প্রথম প্রেস তৈরি হয়েছিল রংপুরে। ১৮৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বার্ত্তাবহ যন্ত্র’ছাপখানাটি থেকে প্রকাশিত হতো রংপুরের প্রথম সাময়িকপত্র ‘রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ’। রংপুরের পর ঢাকার ছোট কাটরায় প্রতিষ্ঠিত ছাপাখানাটিকে বাংলার পুরনো প্রেস বলা যায়, যা পরে ‘ঢাকা প্রেস’ নামে পরিচিত হয়। এখান থেকে ‘দ্য ঢাকা নিউজ’ পত্রিকা প্রকাশিত হতো। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব বাংলায় যে মুদ্রণযন্ত্র ছিল, তা নিতান্তই ক্ষুদ্রাকৃতির। তখন বেশির ভাগ প্রকাশনা কলকাতা থেকে মুদ্রিত হতো। ক্রমে ঢাকায় নিজের প্রয়োজনে আধুনিক ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। সরকারি ফরম, গেজেট, নানা ধরনের পুস্তক-পুস্তিকা ছাপার প্রয়োজন তো ছিলই, সেই সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক ও সংবাদপত্র মুদ্রণের বিপুল চাহিদা থাকার কারণে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে দ্রুত মুদ্রণশিল্পের প্রসার ঘটতে থাকে।
এখন আধুনিকায়ন হলেও প্রেসের মূল্যায়ন রয়েছে সর্বক্ষেত্রে। হাতে লেখা বা টাইপ রাইটারে নয় এখন কম্পিউটারের বিভিন্ন সফটওয়্যার মুদ্রণশিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যা খরচ এবং সময় দুটোই বাঁচিয়েছে।