ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ সাতরং ]

বিশ্বের প্রথম চর্বিমুক্ত সাবানের বিজ্ঞাপনে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ

সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫:১৯, ৩১ আগস্ট ২০২০
বিশ্বের প্রথম চর্বিমুক্ত সাবানের বিজ্ঞাপনে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ
ছবি: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সাবান বা শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনগুলোতে বেশিরভাগ সময়ে নারীদেরই দেখা যায়। এটি বিজ্ঞাপন সংস্থার একটি কৌশল বলতে পারেন। এজন্য নেয়া হয় সুন্দরী নারী মডেল কিংবা প্রথম সারির নায়িকাদের। সাবান যে শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে তাই ই নয়। বর্তমানে ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে সাবানের অবদান অসামান্য। 

তবে সাবানের আবিষ্কারের সঠিক সময় জানা যায়নি। একেক জনের একেক মত। কেউ বলেন ২৮০০ বছর কেউ বলেন ১৫০০ বছর আগেও ব্যবহার ছিল সাবানের। তবে সেসময়ের সাবান আর এখনকার সাবানের মধ্যে পার্থক্য অনেক। খ্রিষ্টপূর্ব ২৮০০ বছর আগে প্রাচীন ব্যাবিলনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে সাবানজাতীয় বস্তুর ব্যবহারের প্রথম প্রমাণ মেলে। সে সময় মাটির পাত্রগুলোতে সাবানের মতো বস্তু তৈরি ও ব্যবহার করা হতো। 

খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ সালে প্রকাশিত চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা দি ইবার্স প্যাপিরাস থেকে জানা যায়, সেই যুগে মিসরে পশুর চর্বি ও সবজির তেলের সঙ্গে অ্যালকাইন লবণ মিশিয়ে অনেকটা সাবানের মতো দ্রব্য প্রস্তুত করা হতো। তবে সেই সাবান জাতীয় পদার্থ শুধু পরিচ্ছন্নতার কাজে নয়, নানা ধরনের চর্মরোগের চিকিৎসায়ও ব্যবহৃত হতো।

গোদরেজের তৈরি স্প্রিং ছাড়া তালা সাবানের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় দ্বাদশ শতকের কোনো এক সময়, যুক্তরাজ্যে। তবে আমরা যে সাবান ব্যবহার করি, তা এসেছে রসায়নবিদ মিশেল ইউজিন শেভ্রুলের হাত ধরে, ১৮২৩ সালে। এই ফরাসি বিজ্ঞানীই প্রথম চর্বি, গ্লিসারিন ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে সাবান তৈরির কৌশল আবিষ্কার করেন। তবে আজ জানাবো প্রথম চর্বিমুক্ত সাবানের কথা। যার বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

আরো পড়ুন: বিশ্বের প্রাচীন এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকে আছে এখনো  

চর্বিমুক্ত এই সাবান তৈরি করে ভারতীয় এক প্রতিষ্ঠান গোদরেজ। শতাব্দী প্রাচীন সংস্থাটির মুকুটে আছে সাফল্যের নানান পালক। শুধু সাবান নয় অনেক কিছুর জন্যই পরিচিত এই প্রতিথানটি। ভারতে তারাই প্রথম স্প্রিং ছাড়া তালা বানিয়েছিল। ভারতের প্রথম টাইপরাইটার, নির্বাচনের ব্যালট-বক্স,রেফ্রিজারেটর বানিয়েছিল এই প্রতিষ্ঠানটিই। গোদরেজ আজ পৃথিবীজুড়ে প্রায় ৪৭০ কোটি ডলারের ব্যবসা করে। ১৯০২ সাল থেকে গোদরেজ ব্রাদার্স শক্তিশালী সিন্দুক তৈরি করতে শুরু করেছিল।  

একে একে গোদরেজ ব্রাদার্স এনেছিল, আয়রন চেস্ট, ভল্ট, দরজার ফ্রেম ও ডাবল প্লেটের দরজা। গোদরেজ ব্রাদার্সের সব পণ্যের দাম আয়ত্বের মধ্যে থাকায় ক্রেতাদের দ্বারে পৌঁছাতে অসুবিধা হয়নি তাদের। এভাবেই গোদরেজ ব্রাদার্স একশ বছর আগে মুম্বাইতে হয়ে উঠেছিল সুরক্ষার প্রতীক। শোনা যায় ১৯১২ সালে ভারত সফরকালে ইংল্যান্ডের রানি সঙ্গে রেখেছিলেন গোদরেজ ব্রাদার্সের বানানো সিন্দুক।

গোদরেজ নাম্বার ওয়ান সাবানের মোড়ক ১৮৯৭ সালে ভারতের মাটিতে প্রথম সাবান তৈরি করতে শুরু করেছিল মেরঠের ‘নর্থ ওয়েস্ট’কোম্পানি। তবে সেই সাবান ব্রিটিশ লগ্নি ও প্রযুক্তিতে তৈরি হতো। ১৯১৬ সালে, স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ারে ভেসে মহীশুররাজ কৃষ্ণ রাজা ওয়াদিয়ার তৈরি করেছিলেন মাইশোর সোপ ফ্যাক্টরি। ভারতবাসীর হাতে এসেছিল চন্দনের গন্ধে সুরভিত মাইশোর স্যান্ডেল সোপ। মাত্র দুই বছর পরে, ১৯১৮ সালে স্বদেশী পণ্য বানানোর ভাবনা থেকেই সাবানের ব্যবসায় এসে পড়েছিল টাটাগোষ্ঠী। উৎপাদন করতে শুরু করেছিল কাপড় কাচার সাবান।

আরো পড়ুন: জমিদারদের লালসার শিকার হতো ঘেটুপুত্ররা!

সাবানের বাজারে মহীশুররাজ ও টাটাগোষ্ঠীর সাফল্য দেখে, আর্দেশির ও পিরোজশা গোদরেজ পরীক্ষামূলকভাবে নেমে পড়েছিলেন সাবানের বাজারে। ১৯১৮ সালেই পথচলা শুরু করেছিল গোদরেজ সোপ লিমিটেড। বাজারে এসেছিল গোদরেজ সোপ লিমিটেডের কাপড় কাচার বার সাবান। কিন্ত যে বাজারে টাটাগোষ্ঠী আছে সেখানে একই ধরণের পণ্য নিয়ে টিকে থাকা খুবই কঠিন। সাবানের বাজারে অস্তিত্ব রক্ষার উপায় ভাবতে ভাবতে আর্দেশিরের মাথায় এসেছিল এক যুগান্তকারী পরিকল্পনা। 

সেই যুগে পশুর চর্বি ছিল সাবানের প্রধান উপকরণ। অহিংসা নীতি ও নিরামিষ আহারে বিশ্বাস রাখা বেশিরভাগ ভারতীয় তাই কোম্পানির তৈরি সাবান কিনতেন না। এই বিশাল সংখ্যক ক্রেতার কথা ভেবেছিলেন প্রতিষ্ঠানটি। গোদরেজ সোপ লিমিটেডের নতুন সাবানে মিশিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের চিরন্তন অহিংসা নীতি। দুই বছর ধরে গোপনে গবেষণা চালিয়ে, ১৯২০ সালে আর্দেশির ভারতের বাজারে এনেছিলেন চাভি ব্র্যান্ডের নাম্বার টু সাবান। এটিই পৃথিবীর প্রথম চর্বিমুক্ত সাবান। যে সাবানে চর্বির পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছিল উদ্ভিজ্জ তেল।  

বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনে দেখা যেত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রত্যেকটি উৎপাদক সংস্থা তাদের পণ্য তৈরির পদ্ধতি গোপন রাখে। কিন্তু গোদরেজের প্রতিষ্ঠাতা আর্দেশির ঠিক উল্টোটাই করেছিলেন। এই সাবান নিয়ে গুজরাতি ভাষায় লেখা একটি পুস্তিকা বিতরণ করেছিল গোদরেজ সোপ লিমিটেড। সেখানে সংস্থাটি জানিয়েছিল, কীভাবে উদ্ভিজ্জ তেল দিয়ে গোদরেজ সাবান তৈরি করে। পেটেন্ট পাওয়ার আগেই সিক্রেট বলে দেয়াটা অনেকের কাছে বোকামি মনে হলেও, এটাই ছিল গোদরেজের চর্বিমুক্ত সাবানের সাফল্যের মূলকারণ। নিরামিষাশী গুজরাতিরা আপন করে নিয়েছিলেন সাবানটিকে। তাদের দেখে অন্যান্য রাজ্যের নিরামিষাশী মানুষেরাও আপন করে নিয়েছিলেন চর্বিমুক্ত সাবানটিকে।       

এরপর ১৯২২ সালে তারা বাজারে আনেন গোদরেজের নাম্বার ওয়ান সাবান। নাম্বার টু থেকে দাম সামান্য কিছু বেশি। তবে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এটি। তারপরেও ভারতে তৈরি বিশ্বমানের সাবানকে আরো ছড়িয়ে দিতে তৈরি করেন বিজ্ঞাপন। এর আগে নাম্বার টু সাবানের বিজ্ঞাপনে দেখা গিয়েছিল অ্যানি বেসান্ত ও রাজাগোপালাচারিকে। তারা স্বদেশী ব্র্যান্ডটিকে সফল করতে সর্বান্তকরণে সাহায্য করেছিলেন।  নাম্বার ওয়ান সাবানের বিজ্ঞাপনের জন্য বেছে নিয়েছিলেন এমন একজনকে। যাকে ভারত সহ বিশ্বের সব মানুষ চেনে এক নামে। তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

গোদরেজ নাম্বার ওয়ান সাবান সেসময় দেখতে এমনই ছিল না  অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, স্বদেশী কোম্পানিগুলোর পায়ের তলার মাটি শক্ত করতেই একের পর এক স্বদেশী পণ্যের বিজ্ঞাপনে দেখা দেন তিনি। তার বিজ্ঞাপনের সংখ্যা ছিল অগনিত। এখনকার ভারতের সেলিব্রেটিরাও এতো বিজ্ঞাপন করেছিলেন কিনা সন্দেহ। রবীন্দ্রনাথের করা বিজ্ঞাপনগুলোকে নিয়ে অসামান্য গবেষণা করেছেন অরুণ কুমার রায়। ১৮৮৯ সাল থেকে ১৯৪ওয়ান সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের করা প্রায় ৯০টি পণ্যের বিজ্ঞাপন খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। এর বাইরেও সম্ভবত অসংখ্য বিজ্ঞাপনে দেখা গিয়েছিল বিশ্বকবিকে। 

আরো পড়ুন: জেল পালাতে অভিনব পন্থা, রাতারাতি হলেন তারা বিখ্যাত

প্রায় সব ধরণের পণ্যের বিজ্ঞাপনে দেখা যেতো রবীন্দ্রনাথের নাম ও উক্তি কিংবা ছবি ও উক্তি। পণ্যগুলোর মধ্যে বই থেকে শুরু করে স্নো, ক্রিম, ঘি, মিষ্টি, কেশ তেল, ওষুধ, লাইম জুস, তিল তেল, গ্লিসারিন, হারমোনিয়াম ছাড়াও আরো অনেক কিছু ছিল। বিজ্ঞাপনগুলো প্রকাশিত হতো বসুমতী, ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেট, ভাণ্ডার, সাধনা ম্যাগাজিনগুলোতে। প্রকাশিত হতো আনন্দবাজার, অমৃতবাজার ও স্টেটসম্যান পত্রিকাতে। ডঃ উমেশ চন্দ্র রায়ের ‘পাগলের মহৌষধ’ নামক একটি  ওষুধের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথের একটি মজার উক্তি তো প্রবাদ হয়ে গিয়েছিল। পাগলের মহৌষধের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, আমি ইহার উপকারিতা বহুকাল যাবৎ জ্ঞাত আছি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোদরেজ সাবানের বিজ্ঞাপনী পোস্টার বুঝতে পারছেন তো কিসের ব্যাপারে তিনি জ্ঞাত থাকার কথা বলছেন! এটি সেসময় প্রবাদের মতোই হয়েগিয়েছিল। আচ্ছা গোদরেজ নাম্বার ওয়ান সাবানের বিজ্ঞাপন করার গল্পটা এবার জানা যাক। গোদরেজের প্রতিষ্ঠাতা বরাবরই সাহিত্যপ্রেমী ছিলেন। নাম্বার ওয়ান সাবানের বিজ্ঞাপনে তাই তিনি চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকেই। যার জনপ্রিয়তা  বিশ্বজোড়া। আবার গোদরেজের স্বদেশী সাবানের বিজ্ঞাপনের মডেল হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেননি রবীন্দ্রনাথও। ১৯২২ সালে সারা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল গোদরেজ নাম্বার ওয়ান সাবানের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের ছবিতে দেখা গিয়েছিল, হাত দুটো কোলের সামনে রেখে বসে আছেন ভারতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম সেরা নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ। এখানে দেখা যায় এক অচেনা রবীন্দ্রনাথকে। যার জীবনে প্রেম নেই, পূজা নেই, মালা নেই, নেই অতীন্দ্রিয় সত্তার গূঢ় রহস্যময়তা, নেই মৃত্যুর নান্দনিকতা। হৃদয় জুড়ে আছে শুধু নিখাদ স্বদেশপ্রেম।   

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেএসকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!