বিশ্বের প্রাচীন এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকে আছে এখনো
সময় ধরে কাজ করার চেয়ে অনেকেই স্বাধীন পেশা বেশি পছন্দ করেন। হয়ে ওঠেন উদ্যোক্তা। তবে ব্যবসা করতে গেলে প্রথমেই নিতে হবে ঝুঁকি। এরপর এর উত্থান পতনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা। অনেকের আবার পতনের ধাক্কা সামলাতে না পেরে ব্যবসায়ীর স্বপ্ন অঙ্কুরেই নষ্ট হয়।
অনেকে আছেন লাভ-ক্ষতির রিলে রেসে হেরে গিয়ে তারা হারিয়ে যান চিরতরে। তবে দৃঢ় প্রত্যয়ে যারা ঘুড়ে দাঁড়ান তারাই পরবর্তিতে টিকে থাকতে পারেন। তিলে তিলে গড়ে তোলেন তাদের প্রতিষ্ঠান। বছরের পর বছর বংশ পরম্পরায় যখন ব্যবসা টিকে থাকে, তখন সেগুলোকে বলা হয় শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান। আচ্ছা, শতবর্ষী অনেক প্রতিষ্ঠানের কথা মাঝে মাঝেই শুনেছেন। তবে হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে এমন প্রতিষ্ঠানের কথা জানেন কি?
আজকের আয়োজনে থাকছে তেমনই কিছু প্রতিষ্ঠানের কথা। যেগুলো টিকে আছে হাজার বছর। ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে রয়েছে বিশ্বে এমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার। তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
প্রাচীন এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সাক্ষী হয়েছে নানা প্রতিকূলতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধসহ নানা ধ্বংসাত্মক সময়ের। আমাদের দেশে এতো পুরনো কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান না থাকলেও শত বছর পার করেছে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিশ্বে এখনো টিকে থাকা প্রাচীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা কিন্তু কম নয়। এর মধ্যে জাপানেই রয়েছে তিন হাজার ১৪৬টি, জার্মানিতে এর সংখ্যা ৮৩৭টি, নেদারল্যান্ডসে রয়েছে ২২২টি এবং ফ্রান্সে ১৯৬টি রয়েছে প্রতিষ্ঠান।
চলুন জেনে নেই সেসব প্রাচীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে-
কঙ্গো গুমি
কঙ্গো গুমি হলো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে জাপানের ওসাকা শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই তাদের প্রধান কার্যালয়। কনস্ট্রাকশন বা ভবন নির্মাণ করাই কঙ্গো গুমির কাজ। এর প্রতিষ্ঠাতা একজন অভিবাসী। যিনি শিতেনো-জি বৌদ্ধ নির্মাণের জন্য রাজকুমার শোটোকুর কাছ থেকে দায়িত্ব পান। ২০০৬ সালের আগ পর্যন্ত কঙ্গো গুমি প্রায় ১৪০০ বছর ধরে পরিবার পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ছিল। ২০০৬ সালে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি তাকামাতসু কনস্ট্রাকশন গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। একীভূত হওয়ার আগে এর কর্মী সংখ্যা ছিল শতাধিক। এর বার্ষিক বাজেট ছিল প্রায় ৭০ মিলিয়ন ডলার। প্রতিষ্ঠানটি এখনো বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ অব্যাহত রেখেছে।
আরো পড়ুন: কলম্বাসের অত্যাচারে দিশেহারা হয়ে আত্মহনন করে ৫০ হাজার মানুষ
নিশহিয়ামা অনসেন কেইউনকান
বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান হলো নিশহিয়ামা অনসেন কেইউনকান। এটিও জাপানের হায়াকাওয়া শহরে অবস্থিত। এটি একটি হট স্প্রিং হোটেল। ৭০৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই হোটেল ২০১১ সালে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে বিশ্বের প্রাচীনতম হোটেল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। হোটেলটিতে ঘরের সংখ্যা ৩৭টি। একটি পরিবারের ৫২ প্রজন্ম ১৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি পরিচালনা করে আসছে। এই হোটেলে রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে গরম পানির ৬টি ঝর্ণা। হোটেলটি আকাইশি পর্বতমালার গা ঘেঁষে অবস্থিত এবং এর গরম পানির উৎস পার্শ্ববর্তী হাকুহো স্প্রিংস।
কোমান
কোমানও জাপানের একটি ঐতিহ্যবাহী হোটেল। ৭০৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত কোমান হোটেলটি বিশ্বের তৃতীয় প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। হোটেলটি প্রতিষ্ঠা করেন গনোকামি হিউকে। জনশ্রুতি আছে, তিনি চার দেবতাকে স্বপ্ন দেখে হোটেল শুরু করার অনুপ্রেরণা পান। স্বপ্নে দেবতারা নাকি তাকে বলেছিলেন- পরিবারকে বংশ পরম্পরায় রক্ষা করার জন্য তাকে অবশ্যই এই জায়গায় থাকতে হবে। গনোকামি হিউক যে স্থায়ী হওয়ার জন্য শুধু হোটেল নির্মাণ করেন, তা কিন্তু নয়। তিনি হোটেলের ভেতর দেবতাদের উদ্দেশ্যে একটি মন্দিরও তৈরি করেন। বংশ পরম্পরায় এই হোটেল এখনো পরিচালিত হচ্ছে।
হোশি

হোশিও জাপানের ঐতিহ্যবাহী আরেকটি হোটেল। ৭১৮ খ্রিস্টাব্দে এই হোটেলটি প্রতিষ্ঠিট হয়। এটি বিশ্বের চতুর্থ প্রাচীনতম হোটেল। জাপানের ইশিকাওয়া প্রদেশের আওয়াজু ওনসে অঞ্চলে অবস্থিত এই হোটেল একই পরিবারের মালিকানায় ৪৬ প্রজন্ম ধরে আজো টিকে আছে।
আরো পড়ুন: তিন যুগ ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে নওগাঁর ১০৮ কক্ষের দোতলা মাটির বাড়ি
গেন্ডা শিগিও

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে চালু থাকা কাগজ তৈরির প্রতিষ্ঠান এটি। এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে অন্যান্য নানা প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখনো চালু রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গেন্ডা শিগিও প্রতিষ্ঠা করা হয় ৭৭১ খ্রিস্টাব্দে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অফিস কিয়োটো ইম্পেরিয়াল প্রাসাদ এবং নিজো ক্যাসেলের মধ্যে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কাগজের পাশাপাশি বিয়ের এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের কার্ড তৈরি করে। এছাড়া মিজুহিকি নামক বিশেষ কাগজ দিয়ে উপহারের মোড়ক তৈরির জন্যও খ্যাত।
স্টিফস্কেলার সেন্ট পিটার
এটি বিশ্বের ষষ্ঠতম প্রাচীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। প্রাচীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তালিকার প্রথম প্রতিষ্ঠান যেটি জাপানের বাইরে অবস্থিত। এটি একটি রেস্তোরাঁ। সেটি পাওয়া যাবে অস্ট্রিয়ার সালজবুর্গ শহরে। স্টিফস্কেলার সেন্ট পিটার বিশ্বের প্রাচীনতম রেস্তোরাঁ। সেই সঙ্গে ইউরোপের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। রেস্তোরাঁটি ৮০৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করা হয়। রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের দাবি, গত কয়েক শতাব্দীতে এখানে ক্রিস্টোফার কলম্বাস এবং উলফগ্যাং অ্যামাদিউস মোজার্টসহ বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তি এসেছিলেন।