কলম্বাসের অত্যাচারে দিশেহারা হয়ে আত্মহনন করে ৫০ হাজার মানুষ
পৃথিবীর উন্নত আর সমৃদ্ধশালী দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকা অন্যতম। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৪৯১ সালে ইতালীয় নাবিক ও ঔপনিবেশিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস এই দেশটি আবিষ্কার করেন। তার আমেরিকা অভিযাত্রা ওই অঞ্চলে ইউরোপীয়দের উপনিবেশ স্থাপনের সূচনা করেছিল। তবে গবেষকদের দাবি কলম্বাসের আবিষ্কারের ৩০ হাজার বছর আগেই ছিল আমেরিকার অস্তিত্ব। সেখানে পাওয়া যায় মানুষের বসবাসের চিহ্ন। সম্প্রতি এমনই তথ্য উঠে এসেছে একদল গবেষকের গবেষণায়। এর প্রমাণ মিলছে এক টুকরো চুনা পাথরেই।
উত্তর আমেরিকায় সর্বশেষ গ্লাসিয়াল যুগের আগেও মানুষের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি। সেটা প্রায় ১৯ হাজার থেকে ২৬ হাজার বছর পূর্বের সময়ের কথা। ধারণা করা হয়, এই এলাকা খুব বেশি জনবহুল না হলেও বসতি স্থাপন করেছিল কিছু মানুষ। ২৯ থেকে ৫৭ হাজার বছর আগে হিমবাহ গলে আমেরিকা ডুবেছিল বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। তবে সঠিক সময়টা এখনো জানা না গেলেও স্পষ্ট যে, কলোম্বাসের আবিষ্কারের বহু বছর আগেও এখানে মানুষের অস্তিত্ব ছিল। তবে আজ কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার এবং এর পরের কাহিনী জানাবো। কলম্বাস নতুন দ্বীপকে লোকারণ্য করতে কতটা অত্যাচারী আর নির্মম হয়ে উঠেছিলেন সে গল্পই তুলে ধরব আজকের লেখায়-
ইতালির জেনোয়া শহরে এক তাঁতির ঘরে ১৪৫১ সালে জন্ম ক্রিস্টোফারের। তরুণ বয়স থেকেই তিনি সমুদ্রযাত্রা করেন। ১৪৭৭ সালের দিকে তিনি পর্তুগালের লিসবনে চলে যান। সেখান থেকে তিনি ভূমধ্যসাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগরীয় বাণিজ্যিক বন্দরগুলোতে নৌ অভিযান পরিচালনা করেন। ১৪৮৩ সালে পর্তুগালের রাজা জন দ্বিতীয়র কাছে কলম্বাস তার পরিকল্পনা জমা দেন। তাতে ছিল আটলান্টিক হয়ে পশ্চিমের দিকে ইন্ডিজে যাওয়ার পরিকল্পনা। বর্তমান এশিয়া মহাদেশের পুরোটাকেই তখন ইন্ডিজ বলা হতো।
রাজা যখন তার পরিকল্পনায় রাজি হলেন না, তখন তিনি স্পেনের রাজা ও রানির কাছে পেশ করেন। স্পেনের রাজদরবার তার অভিযান অনুমোদন করেন। তাকে ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের ভাইসরয় হিসাবে নিযোগ দেন। ১৪৯১ সালে আটলান্টিক অভিযানে কলম্বাস ব্যবহার করেছিলেন ‘রহস্যময়’ এক মানচিত্র। অভিযানের শুরু থেকে পুরো সময়টায় তাকে আলোর দিশা দিয়েছে এই মানচিত্রটি। অন্যকথায় বলা যায়, এই মানচিত্রটিকে ঘিরেই পরিকল্পনা নির্ধারণ করতেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস।
এই মানচিত্রটি ছিল জার্মান মানচিত্রকার হেনেরিকাস মারটেলাসের তৈরি করা। অবশ্য এই মানচিত্র প্রস্তুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল আরো কিছু কিংবদন্তীর। বহু পুরনো সেই মানচিত্রটি সময়ের ব্যবধানে এক সময় অনেকটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কলম্বাস কিউবা আবিষ্কার করেন। আমেরিকা মহাদেশের ঠিক কোথায় কলম্বাস জাহাজ থেকে নেমেছিলেন তা নিয়ে শত শত বছর ধরে বিতর্ক চলেছে।
অন্তত ১০টি স্থানের বাসিন্দারা দাবি করেন, কলম্বাস তাদের সেই জায়গাগুলোতেই প্রথম পদধূলি দেন। তবে আমেরিকায় নামার পর কলম্বাস ভেবেছিলেন তিনি ভারতে পৌঁছেছেন। যাই হোক, ১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নেতৃত্বে একদল অস্ত্রধারী তিনটি জাহাজে চড়ে আমেরিকার বাহামাস দ্বীপে পৌঁছান। সরলমনা স্থানীয় আদিবাসীরা তাদেরকে অতিথি হিসেবে স্বাগত জানান। কলম্বাসের একটি ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজও মেরামত করে দেন তারা।
অভ্যর্থনা জানাতে আসা আদিবাসীদের দেহে স্বর্ণের অলঙ্কার দেখে কলম্বাস অনুমান করেন আশেপাশের কোথাও স্বর্ণের খনি রয়েছে। আদিবাসীদের সরলতা কলম্বাসকে মুগ্ধ করে। চতুর কলম্বাস মুহূর্তেই কষে নেন অংক। তিনি ধারণা করেন, খুবই কম পরিশ্রমে ওই ভূখণ্ডের সব কিছু নিজের দখলে নিতে পারবেন। তিনি আমেরিকার মূল মালিক আদিবাসীদের নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা পাকাপোক্ত করেন এবং স্পেনে গিয়ে আরো ১২০০ ইউরোপীয়কে সঙ্গে নিয়ে আসেন।
শুরু হয় নির্মমতা, চলে গণহত্যা। কলম্বাস বাহিনী হিস্পানিওলা দ্বীপের একটি প্রদেশে এক নির্দেশ দেন। ১৪ বছরের উপরের সব আদিবাসীকে তিন মাস পরপর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ জমা দিতে হবে তাদের। এই নির্দেশ মানতে যারাই ব্যর্থ হত তাদেরই দুই হাত কেটে ফেলা হত। হাত কাটার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই মারা যেত তারা। অনেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছে। তবে তাদের পরিণতি হয়েছে আরো ভয়াবহ। হিংস্র কুকুর দিয়ে খুঁজে বের করে নির্মম অত্যাচার করে মেরে ফেলা হত। অনেক আদিবাসীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে।
হিস্পানিওলা দ্বীপে বসবাসকারীরা ছিল আরাওয়াক গোত্রের। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, কলম্বাসের নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় বাহিনীর নির্মমতা সইতে না পেরে ৫০ হাজার আদিবাসী বিষ খেয়ে গণ-আত্মহত্যা করেছিলেন। মায়েরা তাদের ছোট ছোট বাচ্চাদের বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতেন যাতে ইউরোপীয়রা ওই বাচ্চাদেরকে কুকুরের খাবারে পরিণত করতে না পারে। এরপরও যারা বেঁচে ছিলেন তাদেরকে দাসে পরিণত করেন কলম্বাস।
কলম্বাসের সময়ের কিছু নির্মমতার ইতিহাস উঠে এসেছে তার নিজস্ব জার্নাল ও চিঠিতে। আরো তথ্য পাওয়া যায় স্পেনের ঐতিহাসিক বার্তোলমে দা লাস কাসাস এর লেখা ‘হিস্টোরি অব দ্য ইন্ডিজ’গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন, কলম্বাস বাহিনী তাদের ছুরি ও তলোয়ারের ধার পরীক্ষা করার জন্যও আদিবাসীদের টুকরো টুকরো করে কাটতো। নিষ্পাপ শিশুদের শিরচ্ছেদ করতো। কলম্বাস যাদেরকে রেড ইন্ডিয়ান বলে নামকরণ করেছিলেন সেই আদিবাসীদের একটা বড় অংশকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
এরপর ইউরোপীয়রা নিজেদের বিলাসী জীবন নিশ্চিত করতে সেবকের প্রয়োজন বোধ করে। শুরু করে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে মানুষদের নিয়ে আসা। আর এভাবেই আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের আগমন। এখনকার আফ্রিকান আমেরিকানরাই সেই সময়ে দাস হয়ে আসা আফ্রিকান। তারা কিন্তু স্বেচ্ছায় আমেরিকায় আসেননি, তাদেরকে জোর করে ধরে আনা হয়েছিল দাস হিসেবে।
বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ লেখক অ্যালেক্স হেলি আমেরিকায় তার নিজের প্রথম পূর্বপুরুষের অনুসন্ধানে ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছিলেন। সেই গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে লেখা ‘রুট্স: দ্য সাগা অব এন অ্যামেরিকান ফ্যামিলি’ বইয়ে আফ্রিকা থেকে মানুষ ধরে আনার কিছু ঘটনার প্রামাণ্য বর্ণনা রয়েছে। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে গবেষণার পর জানতে পারেন আমেরিকায় তার প্রথম পূর্বপুরুষের নাম কুন্তা কিন্তে।
‘দ্য রুটস’ নামে দীর্ঘ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। গাম্বিয়া থেকে কুন্তা কিন্তেকে ধরে নিয়ে আসে ইউরোপীয়রা। কুন্তা কিন্তে’র আমেরিকায় পৌঁছার খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন অ্যালেক্স হেলি। কুন্তা কিন্তে জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে ইউরোপীয়দের অনুচরদের মাধ্যমে অপহৃত হন। এরপর তার আত্মীয়-স্বজনেরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি।
১৭৬৭ সালে এক ইউরোপীয় দাস ব্যবসায়ী অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে গাম্বিয়ার যে ১৪০ জন মানুষকে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে এসেছিল তার মধ্যে কুন্তা কিন্তেও ছিলেন। জাহাজটি অ্যানাপোলিসের বন্দরে এসে থামে। অ্যানাপোলিস বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত। আমেরিকায় পৌঁছার আগেই পথে নির্মমতায় মারা যায় ৪২ জন গাম্বিয়ান। বেঁচে যাওয়া ৯৮ জনের একজন হলেন কুন্তা কিন্তে। তিনি ছিলেন মুসলমান।
অথচ কলম্বাসের আগেও অনেকে আমেরিকা গিয়েছিলেন। অনেক মুসলিম নাবিকও আমেরিকা গিয়েছিলেন তার প্রমাণ রয়েছে। তবে তাদের কারো চিন্তায়ই কলম্বাসের মতো এমন বর্বরতা ঢোকেনি। তবে ইতিহাস কতটা নির্মম। ৫০০ বছর পরে হলেও ইতিহাসে মহাবীর হিসেবে জায়গা করে নেয়া কলম্বাস আজকে বর্বর, নির্মম, পাষণ্ড হিসেবে তার চরিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জায়গা নেয়া তার ভাষ্কর্য আজকে অপসারিত হচ্ছে, ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে, ভাষ্কর্যের গায়ে লাল রঙ মেখে তার রক্ত পিপাসু চরিত্র উন্মোচন করা হচ্ছে। জনবিরোধী, স্বৈরাচার, বর্বর হিসেবে উম্মচিত হচ্ছে তার পরিচয়। বর্তমানে জেনোয়াতে কলম্বাসের বাড়িটি সংরক্ষিত আছে। জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে বাড়িটি। পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে আমেরিকা আবিষ্কারকের এই জন্মস্থানটিতে।