জেল পালাতে অভিনব পন্থা, রাতারাতি হলেন তারা বিখ্যাত
পৃথিবীর সব দেশেই রয়েছে অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা। অপরাধের ধরণ আর পরিমাণের উপর নির্ভর করে শাস্তির তারতম্য রয়েছে। মৃত্যুদণ্ড থেকে শুরু করে হাজতবাস। পুলিশের অপরাধী ধরার নানা অভিনব পন্থার কথা তো প্রায়ই পত্রিকা, নাটক, সিনেমায় দেখেন। তবে অপরাধীর পালানোর কাহিনী জানেন কি? প্রায়ই কারাগারের কঠিন পাহারায় থেকেও পালিয়েছেন বন্দি, এমন খবর শোনা যায়।
বিশ্বে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছে বন্দি। তাও আবার অভিনব সব পন্থা বের করেছেন পালাতে। তেমনি কিছু বুদ্ধিমান মানুষের কথাই জানাবো আপনাদের। যারা দিনের পর দিন কড়া পাহারায় থেকেও নিজেদের মানাতে পারেন নি। মুক্তির স্বাদ পেতে বের করেছেন অভিনব সব উপায়। সমুদ্রের মাঝে দ্বীপ কিংবা নিশ্ছিদ্র কারাগার কিছুই তাদের আটকে রাখতে পারে নি। চলুন এমনই কয়েকজন জেল পালানো বন্দির কথা জেনে নেই-
মুনডাইন জো
.png)
১৮২৬ সালে ইংল্যান্ডের করনোওয়ালে এক গরিব পরিবারে জন্ম মুনডাইনের। বাবা থমাস ছিলেন একজন কামার। আর মেরি বোলিথো ছিলেন গৃহিণী। বাবা মায়ের দেয়া নাম জোসেফ বলিথো জন্স। পিতা থমাস জোন্স মারা যাওয়ার পর জোসেফ এবং তার তিন ভাই কাজের আশায় অষ্ট্রেলিয়ায় চলে আসে। সেখানে এক খনিতে কাজ নেয়। তাতেও ফিরছিল না স্বচ্ছলতা। নিজের এবং পরিবারের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আনার জন্য ছোটবেলা থেকেই চুরি-ডাকাতিতে হাত পাকাতে থাকে জোসেফ। এসব বিষয়ে তার আত্মবিশ্বাস ছিল অবিশ্বাস্য। ১৮৪৮ সালে জোসেফ তার জীবনের প্রথম চুরিটি করে। রিচার্ড প্রাইস নামক এক বিত্তশালীর বাসা থেকে তিন পিস পাউরুটি, এক পিস বেকন, কিছুটা পনির এবং শীতের থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিছু গরম জামাকাপড়। এক সময় চুরি ডাকাতি করতে গিয়েই ধরা পড়ে যায় জোসেফ।
ক্ষুধার তাড়নায় প্রথম চুরিটি করলেও তার বিরুদ্ধে ঘরে সিঁদ কেটে মূল্যবান জিনিসপত্র চুরির অভিযোগ আনা হয়। বিচারক জোসেফের বিরুদ্ধে ১০ বছরের কারা অন্তরীণের রায় প্রদান করেন। তাকে জেলে প্রেরণ করা হয়। তবে বেশিদিন জেলে তাকে আটকে রাখা যায়নি। কারারক্ষীদের চোখেকে ফাঁকি দিয়ে সে জেল থেকে পালিয়ে যায়। জনশ্রুতি আছে, কবে, কখন, কোন রাস্তা দিয়ে পালাবে তা নাকি আগে থেকেই জেলে নিয়োজিত প্রহরীদের জানিয়েই রাখতো জোসেফ। নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে, সবার চোখে ধুলো দিয়ে ঠিক জেল থেকে উধাও হয়ে যেতো।
আরো পড়ুন: স্বামীসহ ৩০০ পুরুষকে হত্যা করেন এই নারী
অস্ট্রেলিয়া পুলিশ তার জন্য নিশ্ছিদ্র কারাগার বানান। কারাগার প্রস্তুত হওয়ার পর বিশেষ অভিযান চালিয়ে মুনডাইনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে সেই নিশ্ছিদ্র কারগারে নেওয়া হয়। এটা তার জন্য একটি পরীক্ষা ছিল। কারা কর্তৃপক্ষ দেখতে চেয়েছিলেন যে, জো পালাতে পারে কিনা। সেখানেও তাকে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। সেই জেল ভেঙেও পালিয়ে যান মুনডাইন। তবে একথা একবাক্যে কারা কর্তৃপক্ষ স্বীকার করতো যে, তার ব্যবহার ছিল চমৎকার। যা সবাইকেই মুগ্ধ করত। জোসেফের কর্মকান্ড সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে অস্ট্রেলিয়া পুলিশকে।
রয় দ্য মিস্টিক
পেশায় ছিলেন জাদুকর। আজ থেকে প্রায় ১৩০ বছর আগের কথা। ১৮৯১ সালের ২৮ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন যতীন্দ্রনাথ রায়। তবে ম্যাজিকের জগতে তার পরিচয় ‘রয় দ্য মিস্টিক’নামেই। যেমন ছিল তার অসামান্য জাদুর দক্ষতা, তেমনই তার উপস্থাপনা। তার বাবা কালীভৈরব রায় ছিলেন ধামরাইয়ের জমিদারি এস্টেটের নায়েব। ১৯০৭ সালে ঢাকা শহরে তখনকার বিখ্যাত জাদুকর এমিন সুরাবর্দির খেলা দেখেন তিনি। জেদ চেপে যায়, এই খেলা তাকে শিখতেই হবে। যেমনই ভাবনা, তেমনই কাজ। একদিন উপস্থিত হলেন তার কাছে। কিন্তু বহু অনুরোধেও বরফ গলল না। এমিন সুরাবর্দি তাকে শেখালেন না জাদু। অথচ তাকে যে জাদুকর হতে হবে। উপায় খুঁজতে তিনি ছুটলেন ঢাকা মাদ্রাসার শিক্ষক মির্জা আখতার আলি খাঁ সাহেবের কাছে। তিনি জাদুবিদ্যা না জানলেও সন্ধান দিলেন মায়ারহস্যের প্রবেশপথের। তার হাতে তুলে দিলেন হফম্যানের বিখ্যাত বই মডার্ন ম্যাজিক। জীবনে সেভাবে বড়ো কারোর থেকে জাদু শেখেননি রয় দ্য মিস্টিক। তার যা শিক্ষা, সবটুকুই বই থেকে। বই পড়ে রপ্ত করেছিলেন হস্তকৌশল।
তবে নানা বিতর্কিত কাজেও জড়িয়েছিলেন এই জাদুকর। ১৯৩০-এ চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলের সঙ্গেও জড়িয়ে ছিলেন তিনি। লুণ্ঠনের পরে পুলিশের নজর এড়িয়ে ময়মনসিংহ ছেড়ে পালিয়ে যান ঢাকায়। অন্যদিকে তখন হন্যে হয়ে তাকে খুঁজছে ব্রিটিশ পুলিশ। বারবার জায়গা, নাম আর কাজ বদলেছেন তিনি। কখনো করেছেন শাড়ির ব্যবসা কখনো বা শিক্ষকতা। জেলে বন্দি করেও তাকে আটকে রাখতে পারেনি ব্রিটিশ পুলিশ। বারবার পালিয়েছেন জেল থেকে। কীভাবে পালিয়েছেন এর সঠিক পথ বের করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ধারণা করেন জাদু বলয়েই পালিয়েছেন তিনি।
দ্য গ্রেট এস্কেপ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘স্টালাগ লাফ্ট ৩’ছিল জার্মানদের বানানো যুদ্ধবন্দিদের ক্যাম্প। যেখানে বিমান বাহিনীর সৈন্যদের বন্দি হিসেবে রাখা হতো। এদের মধ্যেই একজন ছিলেন অক্সিলিয়ারি এয়ার ফোর্সের স্কোয়াড্রন লিডার রজার জয়েস বুশেল। ১৯৪৩ সালের জানুয়ারি মাসে বুশেল এখান থেকে পালানোর পরিকল্পনা করলেন। তবে একা না, সবাইকে নিয়েই সুড়ঙ্গ খুঁড়ে পালাবেন এখান থেকে। তার একটি সংকেত ছিল। যা ব্যবহার করতেন বন্দিদের সঙ্গে কথা বলতে। সাংকেতিক নাম ছিল টম, ডিক ও হ্যারি। এর অর্থ একটি নয়, তিনটি; একা নয়, সবাইকে নিয়ে।
সুড়ঙ্গগুলোর জায়গা এমনভাবে নির্বাচন করা হলো যেন সেগুলো প্রহরীদের চোখে সহজে ধরা না পড়ে। সেজন্য ভু-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০ ফুট নিচে খোঁড়া হয়েছিল প্রতিটি সুড়ঙ্গ। এগুলো আকারেও ছিল বেশ ছোট, কোনো রকমে শরীর ঢুকিয়ে এগিয়ে নেবার মতো। ১৯৪৪ সালের মার্চে হ্যারির খনন সম্পন্ন হয়। প্রায় পাঁচ মাস ধরে তারা এই সুড়ঙ্গগুলো খনন করেছিল। এরপর বন্দিরা অপেক্ষা করতে থাকলেন অমাবস্যার অন্ধকারাচ্ছন্ন এক রাতের জন্য। মার্চের ২৪ তারিখে এসে যায় কাঙ্ক্ষিত সেই সময়। সুড়ঙ্গপথে এক এক করে পালাতে থাকেন যুদ্ধবন্দিরা। এভাবে চলে যান ৭৬ জন। ৭৭তম বন্দী সুড়ঙ্গ থেকে বের হওয়া মাত্রই ধরা পড়ে যান এক প্রহরীর নজরে। এরপরই শুরু হয় পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের খোঁজে সাঁড়াশি অভিযান। ৭৬ জনের মাঝে ধরা পড়েছিলেন ৭৩ জনই। এদের মাঝে ৫০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল।
এরপর জার্মানরা হিসাব করে দেখেন যে, এ সুড়ঙ্গ খননের জন্য ৪,০০০ খাটের পাটাতন, ৯০টি ডাবল বাঙ্ক খাট, ৬৩৫টি ম্যাট্রেস, ১৯২টি বেড কভার, ১৬১টি বালিশের কভার, ৫১টি ২০ জন একসঙ্গে খেতে পারার মতো টেবিল, ১০টি সিঙ্গেল টেবিল, ৩৪টি চেয়ার, ৭৬টি বেঞ্চ, ১,২১২টি কোলবালিশ, ১,৩৭০টি কাঠের তক্তা, ১,২১৯টি ছুরি, ৪৫৮টি চামচ, ৫৮২টি কাটা চামচ, ৬৯টি ল্যাম্প, ২৪৬টি পানির বোতল, ৩০টি কোদাল, ১,০০০ ফুট বৈদ্যুতিক তার, ৬০০ ফুট দড়ি এবং ৩,৪২৪টি তোয়ালে ব্যবহার করা হয়েছিল। ভাবতে পারছেন কতোটা বুদ্ধি করে কাজটি করতে হয়েছিল তাদের।
আলকাত্রাজ দ্বীপ থেকে পালান তিন বন্দি
১৯৬২ সালের ১১ জুনের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের আলকাত্রাজ দ্বীপে অবস্থিত আলকাত্রাজ জেলখানাটি ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত। সার্বক্ষণিক নজরদারিতে ঘেরা এক জেলখানা। চারদিকে পানি আর পানি। সেখান থেকে পালানোর কথা চিন্তাই করা যায় না। তবে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত তিন অপরাধী খুঁজছিলেন মুক্তির পথ। তাই কাজে লাগালেন তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে। এজন্য তারা সাবান আর টয়লেট টিস্যু দিয়ে প্রথমে তৈরী করলেন মানুষের মাথা। এরপর মাথায় আসল চুল লাগিয়ে সেই কৃত্রিম মাথাগুলোকে কাঁথা দিয়ে ঢেকে দিলেন। এমনভাবে রাখলেন যেন রাতের বেলায় প্রহরীরা যখন চেক করার জন্য আসবে, তখন যেন বুঝতে না পারে। এই তিনজন ছিলেন ফ্রাঙ্ক মরিস, জন অ্যাংলিন ও ক্ল্যারেন্স অ্যাংলিন।
আরো পড়ুন: জমিদারদের লালসার শিকার হতো ঘেটুপুত্ররা!
ঘটনার প্রায় এক বছর আগে থেকে তারা তাদের সেলের দেয়ালে বিভিন্ন জিনিস ব্যবহার করে গর্ত খুঁড়ছিলেন। সেই গর্তটি গিয়ে শেষ হয় এক অব্যবহৃত সার্ভিস করিডোরে। সেখান তারা ভেন্টিলেশন শ্যাফট বেয়ে উঠে যান ছাদে। এরপর ছাদ থেকে নেমে আবার আরেকটি প্রাচীর পেরিয়ে সোজা চলে যান সমুদ্রের পাড়ে। এরপর জেলের গুদাম থেকে চুরি করে আনা রেইনকোট ও সিমেন্ট দিয়ে তারা তৈরি করেন র্যাফ্ট। রাত দশটার দিকে তারা আলকাত্রাজ ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও এফবিআই আর কখনোই সেই তিনজনের কোনো সন্ধান পায় নি। ১৭ বছরের অনুসন্ধানের পর এক রিপোর্ট জমা দেন তারা। সেখানে তারা দাবি করেন এই তিনজন হয়তো সাগরের পানিতে ডুবে মরেছে।
ডিলিঞ্জারের কাঠের পিস্তল
নাটক সিনেমায় এই কাহিনী তো দেখাই যায়। তবে বাস্তবেই এই বুদ্ধি কাজে লাগিয়েছিলেন এক বন্দি। এই ঘটনা ডিলিঞ্জারের কাঠের পিস্তল নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়। জন ডিলিঞ্জার আমেরিকার ইতিহাসের কুখ্যাত সন্ত্রাসী। তিনি ছিলেন ডিলিঞ্জার গ্যাংয়ের সদস্য, যারা ২৪টি ব্যাংক ডাকাতি, চারটি পুলিশ স্টেশনে হামলাসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য পরিচিত। তাকে ধরার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় বারবার। শেষ পর্যন্ত ১৯৩৪ সালের জানুয়ারিতে অ্যারিজোনায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। এরপর তার স্থান হয় ইন্ডিয়ানার লেক কাউন্টি জেলে। তবে পালানোর ফন্দি আটতে থাকেন তিনি। কাঠ কেটে বানিয়ে ফেলেন এক খেলনা পিস্তল। তারপর সেটিকে আসলের মতো দেখাতে ব্যবহার করেন জুতার কালি। সেই খেলনা পিস্তল দিয়ে প্রহরীদের ভয় দেখিয়েই পালিয়ে যান জন ডিলিঞ্জার। জেল ভেঙে পালানোর জন্য সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন শেরিফের নতুন কেনা একটি ফোর্ড গাড়ি। ওই বছরেরই ২২ জুলাই পুলিশের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তিনি।