ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ সাতরং ]

স্বামীসহ ৩০০ পুরুষকে হত্যা করেন এই নারী 

সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪:২৮, ২৮ আগস্ট ২০২০
স্বামীসহ ৩০০ পুরুষকে হত্যা করেন এই নারী 
ছবি: স্বামীসহ ৩০০ পুরুষকে হত্যা করেন এই নারী

পৃথিবীর ইতিহাসে অন্ধকার এক অধ্যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এতে ৯০ লাখ যোদ্ধা ও ৫০ লাখ নিরীহ মানুষ নিহত হয়। প্রায় এক কোটি সৈন্য এবং দুই কোটি ১০ লাখ সাধারণ মানুষ আহত হয়। ১৯১৪ সালের ২৮শে জুন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয়।      

আজ বিশ্বযুদ্ধের কথা নয়, জানাবো সেই সময়কার এক নারীর কাহিনী। যিনি একাই ৩০০ পুরুষের হত্যাকারী ছিলেন। ভাবতে পারেন, তিনি হয়তো যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন বা শত্রু পক্ষকে হত্যা করেছেন! না, তিনি পুরুষদের হত্যা করেছিলেন অন্য কারণে। নিজের স্বামীকেও ছাড় দেননি বরং তাকে দিয়েই শুরু করেন এই অমানবিক কাজ। চলুন জেনে নেয়া যাক এই নারী কেন এতজন পুরুষকে হত্যা করেছিলেন।         

দানিউব নদী তীরবর্তী এক দেশ হাঙ্গেরি। এই দেশেরই ছোট্ট এক গ্রাম নাগিরেভ। বিশ্বের আর পাঁচ দশটা গ্রামের মতোই খুব সাধারণ এই গ্রামটি। গ্রামের পুরুষরা সারাদিন পরিশ্রম করে কেউবা গম ফলায় কেউবা সূর্যমুখী ফুল। নারীদের নিস্তরঙ্গ জীবন। অন্য গ্রামের সঙ্গে কোনো তফাত খুঁজে পাওয়া যাবে না এই গ্রামটির। তবে একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যাবে হাঙ্গেরির নিতান্ত অখ্যাত এই গ্রামের প্রতিটি পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ইতিহাস। যদিও সেই ইতিহাস নিঃশব্দ মৃত্যুর ইতিহাস, চরম কলঙ্কের ইতিহাস। 

সুজানা ফাজেকাসপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় হাঙ্গেরির নাগিরেভ গ্রামের পুরুষদের কাছে এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেন সুজানা ফাজেকাস। স্বামী জুলিয়াস ফাজেকাসের সঙ্গে বেশ সুখেই কাটছিল তার দিন। দুজন ভালোবেসেই ঘর বেঁধেছিলেন। প্রেমের প্রথম দিন থেকেই সুজানা ছিলেন বেশ রহস্যে মোড়া। জুলিয়াস মাঝে মাঝেই সুজানাকে বুঝে উঠতে পারতেন না। তবে সুজানার এই রহস্যময়তা আরো আকৃষ্ট করত জুলিয়াসকে। বিবাহিত জীবনের প্রথম কয়েকটা বছর খুব ভালোই কেটেছিল ফাজেকাস দম্পতির। এরপর ১৯১১ সালে নাগিরেভ গ্রামে চলে আসেন তারা। আর এরপরেই ঘটতে শুরু করে একের পর এক বিপর্যয়।     
  
সময়টা ১৯১৮ সাল। সদ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। তখনই আগুনের কালো ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধ যায়নি বাতাস থেকে। এই যুদ্ধের আঁচ পড়েছিল হাঙ্গেরির ছোট্ট গ্রাম নাগিরেভেও। ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া, রাজকুমার ফার্দিনান্দকে হত্যার অভিযোগে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল, তারপর থেকে পরবর্তী চার বছরে হাজার হাজার গ্যালন জল বয়ে গেছে দানিউব নদীর উপর দিয়ে। নাগিরেভে মূলত পরাজিত সৈনিকের যুদ্ধবন্দি হিসেবে রাখত হাঙ্গেরির সেনাবাহিনী। একসময় যুদ্ধে কেন্দ্রীয় শক্তির অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হতে থাকে। অধিকৃত অঞ্চলগুলো হাতছাড়া হতে লাগল তাদের। জরুরি অবস্থায় হাঙ্গেরির সমস্ত পুরুষদের সৈন্যবাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক করল।

নারীদেরকে আর্সেনিক দিয়ে স্বামীকে হত্যার পরামর্শ দেন সুজানা ফলে কিছুদিনের মধ্যেই হাঙ্গেরির অন্যান্য অঞ্চলের পুরুষদের মতোই নাগেরিভ গ্রামের পুরুষ অধিবাসীদের চিরাচরিত কৃষিকাজ ছেড়ে যোগ দিতে হল সৈন্যবাহিনীতে। নাগিরেভ হয়ে পড়ল পুরুষশূন্য। অন্যদিকে ভৌগোলিকভাবে অবস্থানগত সুবিধা থাকায় কিছুদিনের মধ্যেই নাগিরেভ গ্রামে ঘাঁটি তৈরি করল হাঙ্গেরির সৈন্যবাহিনী। নাগিরেভের প্রায় সব পুরুষই তখন হাঙ্গেরির হয়ে সীমান্তে যুদ্ধরত। পুরুষদের অনুপস্থিতির সুযোগে এখানকার অধিকাংশ নারীদের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়ে হাঙ্গেরির সৈন্যবাহিনীর বেশ কিছু সদস্য। এর ফল ছিল মারাত্মক। কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামের বেশ কিছু নারী গর্ভবতী হয়ে পড়লেন।  

অন্যদিকে নাগিরেভে আসার কিছুদিনের মধ্যেই হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যান সুজানার স্বামী জুলিয়াস। অনেক খোজাখুঁজি করেও কোনো খোঁজ মিলেনি জুলিয়াসের। গ্রামের লোক সন্দেহ করতে শুরু করে, জুলিয়াসের এই হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার পেছনে সুজানা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এরইমধ্যে নাগিরেভের যুদ্ধে যোগদানকারী প্রায় সব পুরুষ গ্রামে ফিরে আসতে থাকে। এরপরই অধিকাংশ পুরুষেরই মৃত্যু ঘটে আকস্মিকভাবে। হাজার চেষ্টার পরেও এই মৃত্যুর রহস্যের কিনারা হয় না। হাঙ্গেরির দুঁদে গোয়েন্দারা পর্যন্ত হতাশ হলেন। যদিও বহু চেষ্টার পর শেষ পর্যন্ত অপরাধী পুলিশের জালে ধরা পড়ল। তদন্ত শেষে পুলিশের হাতে উঠে আসে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য।

সুজানাকে নিয়ে এমন পোস্টার তৈরি করেছিল পুলিশ বিভাগ নাগিরেভের পুরুষ হত্যার পেছনে হাত রয়েছে এক নারীর। তিনি আর কেউ নন, সুজানা ফাজেকাস। নাগেরিভ গ্রামের যে নারীরা পুরুষদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে অবৈধ প্রণয়ে জড়িয়ে পড়ে গর্ভবতী হয়ে পড়েন, তাদের অধিকাংশ শরণাপন্ন হন সুজানা ফাজেকাসের। শুধুমাত্র মনারীদের গর্ভপাত করিয়ে থেমে থাকেননি সুজানা। আর্সেনিক প্রয়োগে পুরুষদের হত্যার পরামর্শ দেন সুজানা। তদন্ত শেষে পুলিশ দাবি করেছিল নাগিরেভ গ্রামের হত্যায় প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত সুজানা। কারণ হত্যায় ব্যবহৃত আর্সেনিকের যোগান দিয়েছিল সুজানা ফাজেকাস নিজেই। যার মাধ্যমে নাগিরেভের প্রায় ৩০০ পুরুষকে হত্যা করা হয়।   

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে এরকম হাজারো নৃশংসতা অমানবিকতার ইতিহাস। নাগিরেভ গ্রামের এই কলঙ্ক এখনো মুছে যায়নি। সেখানকার নারীদের স্বামী হত্যার দায় বয়ে বেড়াতে হয়।

সূত্র: মিডিয়ামডটকম, ইন্ডিপেনডেন্টডটকম, মার্ডারপিডিয়া    

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেএসকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!