ঢাকা,  শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩

[ রাজধানী ]

‘ছেলে হত্যাকারীদের ফাঁসি না দেখে মরতে চান না বাবা’

মিনহাজুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১০:৪৫, ১৪ অক্টোবর ২০২৩
‘ছেলে হত্যাকারীদের ফাঁসি না দেখে মরতে চান না বাবা’
গ্রেফতার আসামিরা

“আমার ছেলে সবজির ব্যবসা করত। কারো সাথে শত্রুতা ছিল না। মদখোররা মদের টাকা জোগাতে গিয়ে আমার ছেলেকে খুন করে টাকাপয়সা নিয়ে নিল। ঐ খুনিদের ফাঁসি না দেখে আমি মরতে চাই না। ওদের ফাঁসি দেখে তারপর যেন আমি মরি।” কথাগুলো বলছিলেন কেরানীগঞ্জের আমবাগিচা খালপাড় এলাকায় মাদকসেবিদের হাতে নিহত হওয়া মো. সুকুরের পিতা শেখ ওয়াজ উদ্দিন।

তিনি বলেন, সুকুরের ছোট একটি সন্তান রয়েছে। এছাড়াও তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। ঘটনার রাতে সুকুর শ্বশুরবাড়ি সিরাজদিখানে ছিল। ভোরে আলু ও পেঁয়াজ কেনার জন্য শ্যামবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে খুনের শিকার হয়।

গত ২৪ ঘণ্টায় টানা অভিযান চালিয়ে কেরানীগঞ্জ, ঢাকা শহর ও রাজশাহী থেকে পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সুইচ গিয়ার চাকু ও ভিকটিমের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।

গ্রেফতার আসামিরা হলেন- ইমন (২৫), রুবেল (৩২), মো. দিপু (২২), মো. মন্টু (২০) ও মো. হানিফ (২৮)। এদের মধ্যে আসামি ইমন সম্প্রতি আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আসামির জবানবন্দি রেকর্ড করেন ঢাকার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোস্তাফিজুর রহমান। বাকি আসামিদের তিনদিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে। 

খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার করায় প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিহত সুকুরের বাবা ওয়াজ উদ্দিন বলেন, আমি পুলিশ প্রশাসনের কাছে কৃতজ্ঞ। তারা দ্রুত খুনিদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। যারা আমার বুক খালি করেছে, আমার নাতিদের পিতৃহারা করেছে তাদের ফাঁসি চাই।

কেরানীগঞ্জ থানা সূত্রে জানা যায়, গত ১ অক্টোবর ভোরে শুক্কুর সবজি কেনার জন্য সিরাজদিখানের পাউসার গ্রাম হতে ঢাকার শ্যামবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তিনি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার কদমতলী এলাকায় এসে গাড়ি থেকে নামেন। এরপর তিনি পুরান ঢাকার শ্যামবাজার যাওয়ার জন্য একটি রিকশাযোগে কালীগঞ্জ তেলঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তার রিকশাটি আমবাগিচা খালপাড়স্থ গেদু মাস্তানের মাজারের সামনে পৌঁছালে ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তার গতিরোধ করে। এরপর ছিনতাইকারীরা তার সঙ্গে যা আছে বের করে দিতে বলেন।
 
সুকুর ছিনতাইকারীদের টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ছিনতাইকারীরা সুকুরের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাতে তাকে হত্যা করে রাস্তার ওপর ফেলে যায়। প্রথমে পুলিশ অজ্ঞাত লাশ হিসাবে উদ্ধার করলেও পরে নিহতের পরিচয় জানা যায়।

এ ঘটনায় শুক্কুরের বাবা শেখ ওয়াজ উদ্দিন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

থানায় মামলা দায়ের করার পর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজামানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়। তদন্ত টিম ঘটনাস্থল ও আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে গভীর পর্যালোচনার পর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত আসামিদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এরপর তদন্ত টিম তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ করে কেরানীগঞ্জ, ঢাকা শহর ও রাজশাহীতে অভিযান চালিয়ে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত পাঁচ আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা সবাই মাদকাসক্ত এবং পেশাদার ছিনতাইকারী। ছিনতাই করা টাকা দিয়ে তারা মাদক সেবন করে থাকে। ঘটনার দিন মাদকের টাকা জোগাড় করতে আসামিরা সারারাত ছিনতাই করার জন্য টার্গেট খুঁজছিল। সারারাত তারা কোনো সহজ টার্গেট খুঁজে পায়নি। এক পর্যায়ে ভোরে তারা বেশ উগ্র হয়ে যায়। এমন সময় সবজি বিক্রেতা সুকুর রিকশায় করে সবজি কেনার উদ্দেশ্যে আমবাগিচা খালপাড় রাস্তা দিয়ে শ্যামবাজারের সবজির আড়তে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে সুকুরের রিকশার গতিরোধ করে ইমন ও রুবেল। রুবেল রিকশা আটকে রাখে এবং ইমন সবজি ব্যবসায়ী সুকুরকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। এ সময় দীপু, মন্টু ও হানিফ রাস্তা পাহারা দিচ্ছিল যাতে কোনো লোক দেখে না ফেলে।

ছিনতাইয়ের পর ইমন ও রুবেল ভুক্তভোগী সুকুরের কাছে ৩০ হাজার টাকা পায়, যা দিয়ে তারা সবাই মিলে মাদক সেবন করে।

জানা গেছে, নিহত সুকুরের বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার চর মধুচরিয়া আগলা এলাকায়। তিনি এলাকায় সবজি বিক্রি করে সংসার নির্বাহ করেন। গত ১ সেপ্টেম্বর ভোররাতে শ্বশুরবাড়ি সিরাদিখান থেকে রাজধানীর শ্যামবাজারে আলু ও পেঁয়াজ কেনার জন্য রওনা হন। সেখানে যাওয়ার পথেই ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ দিতে হয় তাকে। 

এদিকে সুকুরের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে। সুকুরের একটি শিশু সন্তান নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তার গর্ভবতী স্ত্রী। সুকুরের সন্তানের জন্য সরকারি সাহায্য প্রত্যাশা করে বাবা ওয়াজ উদ্দিন বলেন, সরকার যদি আমার সুকুুরের ছেলেটার লেখাপড়ার জন্য কিছু সহায়তা করে তাহলে খুব ভালো হবে আমাদের জন্য। 

সুকুরের প্রতিবেশী উজ্জ্বল খান জানান, সুকুর খুব ভালো মানুষ ছিল। তার সঙ্গে কারো কোনো ঝামেলা ছিল না৷ সে অনেক ধার্মিক লোক ছিল। মানুষকে ভালোর পথে ডাকতো। আমরা তার হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। 

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজামান জানান, সুকুর হত্যাকাণ্ডে ছয়জন জড়িত ছিলেন। পাঁচজনকে এরই মধ্যে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। বাকি এক আসামিকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। 

তিনি আরো জানান, গ্রেফতার হওয়া আসামিদের বিরুদ্ধে মাদক চুরি ছিনতাইয়ের একাধিক মামলা রয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!