ঢাকা,  শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

বনদস্যুদের দাপটে উজার হচ্ছে বনাঞ্চল

জাকারিয়া চৌধুরী, হবিগঞ্জ
প্রকাশিত: ১২:৫৩, ১৮ মার্চ ২০২০
বনদস্যুদের দাপটে উজার হচ্ছে বনাঞ্চল
গাছ কাটার মহোৎসব

দেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক পাহাড়ি বনাঞ্চল রেমা-কালেঙ্গা। সুন্দরবনের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক বন এটি। যা হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বাংলাদেশ ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। 

প্রাকৃতির অভয়ারণ্যে এই বনাঞ্চলটিতে দিন দিন বেড়েই চলেছে বন দস্যূদের দাপট। বন দস্যূদের ক্ষমতা এতটাই যে দিনে দুপুরে তারা এই বনাঞ্চল থেকে কেটে নিচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। আর এতে করে একদিকে যেমন উজার হচ্ছে বনাঞ্চল অন্যদিকে পরিবেশ হারাতে বসেছে ভারসাম্য। একই সঙ্গে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রজস্ব। 

অভিযোগ রয়েছে বন বিভাগ ও সরকারি দলের কতিপয় কিছু নেতাদের ছত্রছায়ায় বন দস্যূরা দীর্ঘদিন ধরে এ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তবে বিষয়টি অস্বীকার করছে বন কর্তৃপক্ষ। 

তারা বলছে, এখন আর রেমা কালেঙ্গা বনাঞ্চল থেকে কোনো গাছ কাটা বা পাচার হচ্ছে না। আর কারো বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। 

বন বিভাগ সূত্র জানায়, ১৯৪০ সালের দিকে প্রায় ১৭৯৫ হেক্টর আয়তনের এই বনাঞ্চলটি বিস্তার লাভ করে। তবে রেমা কালেঙ্গা এই বনাঞ্চলটি অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় ১৯৮২ সালে। 

১৯৯৬ সালে এ বনের সম্প্রসারণ করা হয়। বনবিভাগের কালেঙ্গা রেঞ্জের চারটি বিটের (কালেঙ্গা, রেমা, ছনবাড়ী আর রশিদপুর) মধ্যে রেমা, কালেঙ্গা আর ছনবাড়ী বিস্তীর্ণ জঙ্গল নিয়ে রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য গঠিত। 

এতে রয়েছে একাধিক পাহাড় ও টিলা। এখানকার উঁচু পাহাড়গুলো প্রায় ৬০ থেকে ৬৭ মিটার উঁচু। এই বনাঞ্চলটিতে রয়েছে সাড়ে ৫ শ প্রজাতির গাছ। এর মধ্যে সেগুন, মেহগুনি, আকাশি, চাপালিশসহ মূল্যবান গাছ রয়েছে এই বনে। 

তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উজার হতে বসেছে এই বৃহৎ বনাঞ্চলটি। বন দস্যুরা প্রকাশ্যে কেটে নিচ্ছে এই বনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। 

সরেজমিনে বনের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, একদল বনদস্যু দিনের বেলায় প্রকাশ্যেই পাহাড়ের ওপর গাছ কাটছে। আবার অন্য কয়েকজন দ্রুতই গাছগুলো কেটে সারিবদ্ধ করে রাখছে। পরে সারিবদ্ধ গাছের টুকরোগুলো ট্রাক্টরের মাধ্যমে পাচার করা হচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে এ যেন গাছ কাটার মহোৎসব চলছে। 

স্থানীয় বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ জানান, প্রতিনিয়তই এভাবে গাছ কেটে পাচার করা হয়। তবে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় না কেউ। আবার কেউ যদি তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে তা হলে তাদের ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন।
 
অনুসন্ধানে জানা যায়, নুহ বাহিনীর প্রধান নুহ, হোসেন বাহিনীর প্রধান হোসেন ও মনা মিয়াসহ স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি গাছ পাচারের ঘটনার সঙ্গে জড়িত। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতাও জড়িত রয়েছে গাছ পাচারের ঘটনায়। যদিও তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলার সাহস দেখায়নি কেউ। 

এছাড়াও পাচারকারীদের সঙ্গে সখ্যতা রয়েছে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীদেরও।
 
আহমদ মিয়া নামে এক ব্যক্তি জানান, রেমা কালেঙ্গা বনাঞ্চলটি যেন এখন বন দস্যুদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। দস্যুরা দিনে দুপুরে গাছ কেটে জন সম্মুখেই ট্রাক্টরের মাধ্যমে পাচার করছে। 

বন বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীরা দেখেও না দেখার ভান করছে। এমন করে চলতে থাকলে একদিন হয়তো এই বনাঞ্চলটি ধ্বংস হয়ে যাবে। এছাড়াও বিপন্ন হয়ে যাবে রেমার প্রাকৃতিক পরিবেশ। এখানে থাকবে না কোনো পশু পাখি আর সাপ বিচ্ছু। তাই প্রাকৃতিক এই অভয়ারণ্যটি বাঁচিয়ে রাখতে এখনই সংশ্লিষ্টদের নজর দিতে হবে। 

শিক্ষিকা নাছিমা আক্তার জানান, চা-বাগানের ভেতরে অবস্থিত একটি প্রাইমামি স্কুলের শিক্ষকতা করেন তিনি। দীর্ঘদিন যাবত এই স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। স্কুলে আসা যাওয়ার পথে প্রায়ই তিনি দেখছেন ট্রাক অথবা ট্রাক্টরে করে প্রকাশ্যে গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। 

এভাবে চলতে থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই রেমার প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে বলেও জানান তিনি। এছাড়াও বিপন্ন হয়ে যাবে অনেক প্রজাতির পশু পাখি।

গাজীপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম জানান, আগে রেমা কালেঙ্গা বন বিট থেকে যেভাবে গাছ পাচার করা হত এখন তা আগের মত হয় না। তবে এই বনবিট থেকে গাছ পাচাররোধ করতে হলে বন কর্তৃপক্ষকে আরো সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে এবং তাদের কর্ম তৎপরতা আরো বৃদ্ধি করতে হবে।
 
রেমা-কালেঙ্গা বন বিটের রেঞ্জ অফিসার মো. আলাউদ্দিন জানান, এই বিটে যোগদানের পর থেকে অনেক অভিযান পরিচালনা করেছি। বনদস্যু নুহ ও হোসেনসহ একাধিক দস্যুদের আটক করে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছি। তারা বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছে। এছাড়াও এই বন থেকে কোনো গাছ পাচার হয় না। সার্বক্ষণিক বনের চার পাশ নিয়মিত টহলসহ পর্যবেক্ষণে রাখছি। 

চুনারুঘাট বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মারুফ হোসেন জানান, এই এলাকায় নতুন এসেছি। বন থেকে গাছ পাচার হয় এ বিষয়টি জানা নেই। যদি এমন হয়ে থাকে তা হলে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়াও বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা কর্মচারী যদি এ ঘটনায় জড়িত থাকে তাদেরকেও ছাড় দেয়া হবে না। পাচারকারীদের সঙ্গে কোনো আপোষ নয়। যেই পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!