আমীরুল ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কের হিসাব কোনো দিনই ঠিকমতো রাখা হয়নি। কে কাকে কতবার ফোন করেছি, কত আড্ডা দিয়েছি, কার বই কে পড়েছি, কোথায় কতবার দেখা হয়েছে- এসবের হিসাব রাখার মতো সম্পর্ক আমাদের ছিল না। বরং দেখা হলেই মনে হতো, মাঝখানে কোনো বিরতিই ছিল না। তাঁর সেই দরাজ গলা, প্রাণখোলা হাসি, আড্ডার মধ্যে হঠাৎ কোনো গল্প, কোনো রসিকতা কিংবা কোনো তরুণ লেখককে নিয়ে আগ্রহ- সবকিছু মিলিয়ে তিনি ছিলেন নিজের মতো করে এক উষ্ণ মানুষ।
অনুজদের প্রতি তাঁর স্নেহের আলাদা ধরন ছিল। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা কম, অধিকার বেশি। ভালোবাসা প্রকাশের জন্য খুব বড় কোনো বাক্য তাঁর দরকার হতো না। কখনো একটি ফোন, কখনো একটি বই, কখনো আড্ডায় পাশে টেনে নেওয়া, কখনো কোনো লেখা নিয়ে দু-একটি কথা- এসবের মধ্য দিয়েই বুঝিয়ে দিতেন, তিনি খোঁজ রাখছেন। হাঁক ছেড়ে ডেকে উঠতেন, "অ্যাই মিয়া, কই যাও! এদিকে আহো।"
.png)
আমীরুল ভাই তাঁর লেখা ‘বারোয়ারি বারো গল্প’ বইটি আমাকে উৎসর্গ করেছিলেন। সেখানে লিখেছিলেন- ‘দীপু মাহমুদ, কিশোর গল্পের জাদুকর।’ একজন লেখকের কাছ থেকে এমন বাক্য পাওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের। কিন্তু আজ সেই উৎসর্গের পাতা খুললে আনন্দের চেয়ে অন্য কিছু এসে বুকের মধ্যে জমে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, মানুষ চলে যায়, তার কথা থেকে যায়।
আমীরুল ভাই শেষের দিকে চোখে দেখতেন না। কিন্তু চোখে না দেখার সেই সীমাবদ্ধতা তাঁর মানুষ দেখার ক্ষমতাকে যেন আরও গভীর করে দিয়েছিল। তিনি চোখ মেলে দেখতেন না, অন্তর মেলে আদর করতেন, "দীপু নাকি। কেমুন আছ মিয়া। লেখা কেমুন চলতাছে। তুমি তো দুই হাত দিয়ে লেখো। এত লেখো ক্যামনে!"
কে কেমন আছে, কে লিখছে, কে থেমে গেছে, কার কী প্রয়োজন- এসবের প্রতি আমীরুল ভাইয়ের গভীর দায়িত্ববোধ ছিল। শিশুসাহিত্য তাঁর কাছে শুধু নিজের লেখার জায়গা ছিল না, এটা ছিল এক বড় পরিবারের মতো। সেই পরিবারের বড় ভাইয়ের দায়িত্ব তিনি নিজের মতো করে পালন করেছেন।
এই জায়গাটিই হয়তো আমীরুল ভাইকে আলাদা করে মনে রাখার সবচেয়ে বড় কারণ। তিনি নিজে লিখেছেন বিপুল, কিন্তু নিজের লেখার চারপাশে দেয়াল তুলে রাখেননি। নতুনরা লিখুক, অনুজরা এগিয়ে আসুক, শিশুসাহিত্য আরও সমৃদ্ধ হোক- এ নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখকের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়, আমীরুল ভাইয়ের মধ্যে তা দেখিনি। বরং তাঁর আড্ডায় বয়সের ব্যবধান অনেক সময় অদৃশ্য হয়ে গেছে।
হাসতে হাসতে তিনি পাশে বসাতেন, কথা বলতেন, শুনতেন। কখনো প্রশংসা করতেন, কখনো মত দিতেন। কিন্তু সেই মতের ভেতরেও থাকত আপন করে নেওয়ার উষ্ণতা, "এত যে পুরস্কার পাইতেছ, পুরস্কার পাইলে কী হয়! মন দিয়ে লেখো মিয়া। পুরস্কার তোমার পাওয়া লাগত না, পুরস্কারই তোমারে পাওয়ার জন্য ঘুরতে থাকব।"
একজন শিশুসাহিত্যিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ সম্ভবত তাঁর নিজের ভেতরের শিশুকে বাঁচিয়ে রাখা। আমীরুল ভাই সেই শিশুকে শেষ দিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর বিপুল লেখালেখির দিকে তাকালে বোঝা যায়, শিশু-কিশোরদের জন্য তিনি শুধু গল্প বা ছড়া লিখতে চাননি, তাদের চারপাশের পৃথিবীটাকেও সাহিত্যের মধ্যে নিয়ে আসতে চেয়েছেন। ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান, প্রকৃতি, কল্পনা, রূপকথা, হাসি, দুষ্টুমি- কত বিচিত্র পথে তিনি শিশুদের কাছে পৌঁছেছেন। লেখার বাইরেও তাঁর বড় কাজ ছিল- শিশুসাহিত্যিকদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করা, অনুজদের সাহস দেওয়া, তাদের লেখাকে গুরুত্ব দেওয়া।
আমার মতো অনেকের কাছেই সেই স্নেহ ছিল এক ধরনের আশ্রয়। তাই আজ আমীরুল ভাইকে নিয়ে লিখতে বসে তাঁর বইয়ের সংখ্যা, পুরস্কার, সাহিত্যকর্মের তালিকা দিয়ে শোক প্রকাশ করতে ইচ্ছে করছে না। সেসব থাকবে, অবশ্যই থাকবে। সাহিত্য তাঁকে তার প্রাপ্য জায়গায় মনে রাখবে। বাংলা শিশুসাহিত্যে তাঁর দীর্ঘ ও বহুমুখী কাজের মূল্যায়ন হবে। তাঁর ছড়া, গল্প, উপন্যাস, রূপকথা, বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা, মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসের বই- সবই পাঠকের কাছে ফিরে ফিরে যাবে। কিন্তু একজন অনুজের কাছে একজন বড় ভাইয়ের যে মূল্য, তার কোনো গ্রন্থপঞ্জি হয় না।
সেটা থাকে ভালোবাসায়। কিছু আড্ডায়। কিছু অসমাপ্ত কথায়। কোনো এক বিকেলে শোনা দরাজ হাসিতে। হঠাৎ করা কোনো ফোনে। কোনো বইয়ের উৎসর্গপত্রে। কিংবা এমন এক সম্বোধনে- "ওই মিয়া দীপু, আছ কেমন, কী লেখতেছ?"
এই "আছ কেমন, কী লেখতেছ"টুকু আর কোনো দিন শোনা যাবে না। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৭ মিনিটে লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়া হয়েছে। তারপর থেকে আমীরুল ভাই আমাদের দৃশ্যমান পৃথিবীর বাইরে। কথাটা লিখতেও কেমন অস্বাভাবিক লাগছে। কারণ যে মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায়, তাঁকে নিয়ে হঠাৎ অতীতকালে লিখতে হয়- এ এক অদ্ভুত নির্মমতা।
তবু মৃত্যু জীবনের শেষ কথা নয়- বিশেষ করে একজন লেখকের বেলায়। একজন লেখক তাঁর বইয়ের মধ্যে থেকে যান। তাঁর লেখা কোনো শিশুর হাতে গেলে, কোনো কিশোর তাঁর গল্প পড়ে হাসলে, কোনো তরুণ লেখক তাঁর উৎসাহের কথা মনে করলে, কোনো পুরোনো বন্ধু তাঁর আড্ডার কথা বললে- তিনি আবার ফিরে আসেন। আমীরুল ভাইও ফিরবেন। বারবার ফিরে আসবেন।
তাঁর দরাজ হাসিতে ফিরবেন। তাঁর আড্ডায় ফিরবেন। কোনো অনুজকে স্নেহ করে পাশে বসিয়ে নেওয়ার স্মৃতিতে ফিরবেন। তাঁর লেখা কোনো বইয়ের পাতায় ফিরবেন। আর আমার কাছে ফিরবেন সেই উৎসর্গপত্রের কয়েকটি শব্দ হয়ে- ‘কিশোর গল্পের জাদুকর।’
জানি, ঋণ শোধ করার সুযোগ আর নেই। থাক সেসব ঋণ কষ্ট হয়ে আমার বুকে। আমীরুল ভাই, আপনার জন্য ভালোবাসা। আভূমিনত শ্রদ্ধা। ভালো থাকুন, ভাই। বেহেশতের বাগানে আনন্দে থাকুন। হাসুন আর নতুন ছড়া গাঁথুন।