ঢাকা,  বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

মানুষের মানচিত্র, নাকি মানচিত্রের মানুষ?

মমিন আফ্রাদ
প্রকাশিত: ১৮:০০, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানুষের মানচিত্র, নাকি মানচিত্রের মানুষ?
‘পৃথিবী কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়’—এই মানবতাবাদী দর্শন প্রধান বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। যদিও এটি বিশ্বসাহিত্যের সর্বাধিক সমাদৃত কাব্যগ্রন্থগুলোর তালিকায় সাধারণত স্থান পায় না, তবু সমকালীন পরীক্ষাধর্মী কবিতার ইতিহাসে এর গুরুত্ব বিশেষভাবে স্বীকৃত।

মমিন আফ্রাদ 
কবিতার নতুন ভূগোল সৃষ্টিকারী কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। আমরা এমন এক পৃথিবীর মানচিত্র দেখি যেখানে আছে কেবল জমি, খনি, সমুদ্র, নদী, মরুভূমি, মালভূমি, বরফ আর হিমালয়। যেন উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত এই ভূগোলে কোথাও মানুষের অস্তিত্ব নেই, মানুষের উপস্থিতি নেই। অথচ  প্রকৃত মানচিত্র কেবল ভূ-প্রকৃতির নয়; মানুষের জীবন, সংগ্রাম, ভালোবাসা, বেদনা ও স্বপ্ন ছাড়া কোনো ভূগোলই সম্পূর্ণ হতে পারে না।

এ যেন কেবল সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের পুনরুক্তি- মানুষ, না মাটি চাই। কেবল মাটি। অথচ মাটির মানুষগুলো কেমন আছে,  কেমন তাদের ভাষা, আচার, আচরণ, ভাব,ভালোবাসা। এসব খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। সব যেন এককেন্দ্রিক। 

Advertisement

শহরের মানুষের চেহারা যেন এক। জীবনাচরণ এক। কর্ম পদ্ধতি পরিসর যেন এক। বিপরীতে গ্রামীণ মানুষের চেহারা যেন আরেক। জীবনাচার যেন আরেক। উচ্চারণ যেন আরেক। 

ছিয়ানব্বই শতাংশ লোডশেডিং হয় গ্রামে গঞ্জে। কখনো কখনো গ্রামের মানুষ ক্ষিপ্র হয়ে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করে। মামলা চলে। যা কখনো শহরে দেখা যায় না। কারণ শহুরে মানুষ ক্ষমতার কাছাকাছি। তাই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তাদের সন্তুষ্টি প্রয়োজন। এ রকম আরো অনেক বঞ্চনার উদাহরণ হয়তো টানা যাবে। 

আমার থেকে ভালো দিতে পারবেন আপনারা।  এ রকম শহরের মানুষ, গ্রামীণ মানুষ, দেশের মানুষ, প্রবাসী, প্রবাসীর প্রতিবেশী, খেয়ে পড়ে থাকা মানুষ, না খেয়ে থাকা মানুষের হাড় মাংস জিহ্বার ভাষা বানান উচ্চারণ নিয়ে নতুন এক কাব্য পরিসর ও কাব্য ভাষার জন্ম দিয়েছেন রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। এঁকেছেন নতুন কবিতার ভূগোল। 

১৯৭১ থেকে ১৯৯১—এই দুই দশকে বিশ্বসাহিত্যে রচিত হয়েছে আধুনিক কাব্যের বহু অমর সৃষ্টি। রাজনৈতিক প্রতিরোধ, ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার, জাতীয় পরিচয়, ব্যক্তিস্বীকারোক্তিমূলক অভিজ্ঞতা এবং মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা—এসব বিষয় এই সময়ের কবিতাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। এ সময়ে বিশ্বজুড়ে খ্যাতিমান কবি যেমন মায়া অ্যাঞ্জেলু, সিমাস হিনি এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিশিষ্ট কবিদের বহু কালজয়ী রচনা প্রকাশিত হয়।

মায়া অ্যাঞ্জেলুর লেখা And Still I Rise কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত Still I Rise ( ১৯৭৮) কবিতাটি আত্মমর্যাদা, প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার শক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবিচল মানবিক জাগরণের এক বিশ্বজনীন প্রতীক। 

‘Diving Into the Wreck’ (১৯৭৩) —
ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত এই বিখ্যাত কবিতায় নিঃসঙ্গতা, আত্ম-অনুসন্ধান এবং নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসকে নতুনভাবে পাঠ করার প্রয়াস অ্যাড্রিয়েন রিচ এর। 

পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি জন অ্যাশবেরির Self-Portrail in a convex Mirror (1975)  কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম-কবিতা এটি। শিল্প, উপলব্ধি এবং আত্মপরিচয়ের জটিল সম্পর্ক নিয়ে রচিত এই দীর্ঘ কবিতাটি বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাব্যকীর্তি হিসেবে বিবেচিত।

 নোবেলজয়ী  আইরিশ কবি সিমাস হিনি তাঁর 'Station Island' (1984) কাব্যগ্রন্থে শিরোনামধারী কবিতামালায় তিনি আয়ারল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী তীর্থযাত্রার প্রেক্ষাপটে নিজের অতীত এবং রাজনৈতিক শহীদদের আত্মার মুখোমুখি হন।

গ্যালওয়ে কিনেল তাঁর  'The Book of Nightmares’ (১৯৭১) নামের
দশটি পরস্পরসংযুক্ত কবিতার ধারাবাহিক রচনায় মৃত্যু, প্রজন্মগত ক্ষত এবং মানবজীবনের ভঙ্গুরতা, গভীর ও শক্তিশালী শিল্পরূপে প্রকাশ পেয়েছে।

‘বন্দী শিবির থেকে’ (১৯৭২) — শামসুর রাহমান এর একটি কাব্যগ্রন্থ। কবি নরসিংদীর একটি গ্রামে আশ্রয় নেওয়ার সময় আংশিকভাবে রচিত এই কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ এবং ‘স্বাধীনতা তুমি’-এর মতো কালজয়ী কবিতা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত এটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কাব্যিক দলিল হিসেবে স্বীকৃত।

‘Stay Away from Me, Bangladesh – I’ (১৯৭১) — ফয়েজ আহমদ ফয়েজ এর একটি কবিতা। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে (‘হাজার করো মেরে তন সে’) রচিত এই উর্দু কবিতায় কিংবদন্তি কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের প্রতিক্রিয়ায় গভীর বেদনা ও মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন।

‘Selected Poems’ (১৯৭৬) — এ. কে. রামানুজন এর কবিতা সংকলন। রামানুজন তাঁর মৌলিক কবিতা ও অনুবাদের মাধ্যমে আধুনিক ভারতীয় নগরজীবন এবং প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের টানাপোড়েনকে অসাধারণ শিল্পসৌন্দর্যে প্রকাশ করেছেন।

‘Nobody Owns the Earth’ (১৯৭২) —কানাডীয় কবি বিল বিসেট এর একটি কাব্যগ্রন্থ।  উত্তর আমেরিকার পরীক্ষাধর্মী (অ্যাভাঁ-গার্দ) কবিতার অন্যতম উল্লেখযোগ্য রচনা এটি। প্রচলিত বানান ও ব্যাকরণের নিয়ম ভেঙে ধ্বনিভিত্তিক ভাষাশৈলীতে লেখা এই গ্রন্থে যুদ্ধবিরোধিতা, পরিবেশ, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং ‘পৃথিবী কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়’—এই মানবতাবাদী দর্শন প্রধান বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। যদিও এটি বিশ্বসাহিত্যের সর্বাধিক সমাদৃত কাব্যগ্রন্থগুলোর তালিকায় সাধারণত স্থান পায় না, তবু সমকালীন পরীক্ষাধর্মী কবিতার ইতিহাসে এর গুরুত্ব বিশেষভাবে স্বীকৃত।

তেমনি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বানানরীতি ছিল তাঁর কাব্যভাষার একটি সচেতন ও স্বতন্ত্র নির্মাণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলা ভাষার বানানকে সংস্কৃত ব্যাকরণের কঠোর নিয়মে আবদ্ধ না রেখে বাংলা ভাষার প্রকৃত উচ্চারণ ও স্বাভাবিক ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি মূর্ধন্য ‘ণ’-এর পরিবর্তে ‘ন’, দীর্ঘ ‘ঈ’ ও ‘ঊ’-এর পরিবর্তে ‘ই’ ও ‘উ’, অনুচ্চারিত ‘য’-ফলা ও বিসর্গ বর্জনসহ একাধিক বানানগত পরিবর্তন গ্রহণ করেন। কোথাও কোথাও তিনি ‘স’-এর পরিবর্তে ‘শ’, ‘ঙ’-এর পরিবর্তে অনুস্বার (ং) এবং অসমাপিকা ক্রিয়ায় নিজস্ব রীতিতে ‘ো’-কার বা লোপচিহ্ন ব্যবহার করেছেন। যদিও তাঁর এসব বানানের অনেকগুলো প্রচলিত অভিধানসম্মত নয়, তবু এগুলো ছিল বাংলা বানানকে আরও সহজ, উচ্চারণনির্ভর ও প্রাণবন্ত করে তোলার একটি সচেতন প্রচেষ্টা।

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্  বলেন, '' আমি কবি নই— শব্দ-শ্রমিক। শব্দের লাল হাতুড়ি পেটাই ভুল বোধে ভুল চেতনায়, হৃদয়ের কালো বেদনায়। করি পাথরের মতো চূর্নছিঁড়ি পরান সে ভুলে পূর্ন। রক্তের পথে রক্ত বিছিয়ে প্রতিরোধ করি পরাজয়, হাতুড়ি পেটাই চেতনায়। ''

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ মাটিতে লেগে থাকা রক্তের দাগ ভুলতে পারেন না। তাই উচ্চারণ করেন :
মাটিতে রক্তের দাগ—
চালের গুদামে তবু জমা হয় অনাহারী মানুষের হাড়।
এ-চোখে ঘুম আসে না। সারারাত আমার ঘুম আসে না।”
(বাতাসে লাশের গন্ধ, উপদ্রুত উপকূলে)
না খাওয়া মানুষের উচ্চারণ   :
না-ভুখা দুনিয়ায়
জুলুম চালায় যারা কেড়ে নেবো তাগো সব সুখের খোয়াব।”
(মানুষের মানচিত্র-৩২)
মেঘের জরায়ু ছিঁড়ে নামুক জলের শিশু
জন্মের চিৎকারে ভরে দিক অজন্মা ভুবন।”
(বৃষ্টির জন্যে প্রার্থনা, ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম)

সংগ্রহ সূত্র : nariongan

ডেইলি-বাংলাদেশ/DB-F-01
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!