ঢাকা,  বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

মান্দালয়

মূলঃ অমিতাভ ঘোষ, উপন্যাস – দ্য গ্লাস প্যালেস
অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ১২:৩০, ১৩ জুন ২০২৩
মান্দালয়
ছবিঃ অন্তর্জাল (মান্দালয় দুর্গ)

এক.

খাবারের দোকানটিতে কেবল একজন মানুষই সঠিকভাবে জানত যে, ইরাবতী নদীর রূপালী বাঁক ঘেষে কীসের শব্দ সেদিন সমতলের ওপর দিয়ে ঘুরে ঘুরে এসে আঘাত করছিল মান্দালয়ের দুর্গের পশ্চিম দেয়ালে। তার নাম ছিল রাজকুমার। মাত্র এগারো বছর বয়সের এক ভারতীয় শিশু, যার কথাকে সত্য হিসেবে নিয়ে নির্ভর করা যায় না।

শব্দটি ছিল অপরিচিত ও অস্থির ধরণের। একটা দূরাগত ধ্বনি, যাকে অনুসরণ করছিল অস্পষ্ট ও থেমে থেমে আসা গর্জন। কোনো কোনো সময়ে মনে হচ্ছিল ডালপালা ঝাপটানোর শব্দ। অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিক। তারপর হঠাৎ সেটি গর্জনে পরিবর্তিত হচ্ছিল। খাবারের দোকানটিকে নাড়িয়ে দিচ্ছিল এবং বাষ্পীভূত হতে থাকা স্যুপের পাত্রের মধ্যে ঘর্ঘর আওয়াজ সৃষ্টি করছিল। দোকানটিতে মাত্র দুটো বেঞ্চ ছিল। দুটোই লোকজনে ভর্তি ছিল, যারা পরস্পরের সাথে চাপাচাপি করে বসেছিল। 

সময়টা ছিল ঠান্ডা। মধ্য বার্মার সংক্ষিপ্ত, কিন্তু প্রবল শীত। সূর্য তখনো আর্দ্র কুয়াশাকে পূড়িয়ে দেওয়ার মতো ওপরে উঠেনি, যা সকালের দিকে নদী থেকে উঠে এসেছিল। প্রথম গম্ভীর ধ্বনি দোকানে পৌঁছুবার পর সবাই প্রথমে নীরব হয়ে গিয়েছিল। তারপর সবাই ঝাপটা বাতাসের মতো প্রশ্ন ও ফিসফিস করছিল এবং বিহ্বলভাবে চারদিকে তাকাছিল। কী এটা? বা লে? সেই মুহুর্তে রাজকুমারের ধারালো কণ্ঠস্বর তাদের জল্পনার গুঞ্জনকে ছিন্ন করে দিয়েছিল। “ইংরেজদের কামান,’ বলেছিল সে। সাবলীল, কিন্তু ভারীভাবে উচ্চারিত বার্মিজ ভাষায়। “সম্ভবত তারা নদীর ওপরের  দিকের কোনো এলাকা হতে এইদিককে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ছে।” 

Advertisement

কয়েকজন ক্রেতার মুখে ভ্রকুটি দেখা গিয়েছিল, যখন তারা দেখেছিল যে কথাগুলো এসেছে হোটেলের বয় হিসেবে কর্মরত ছেলেটির মুখ হতে। সে ছিল সাগরের ওপার থেকে আসা এক কালা–ভারতীয়, যার দাঁতগুলো ছিল তার চোখের মতো সাদা এবং চামড়ার রঙ ছিল মসৃণ শক্ত আবলুশ কাঠের মতো। সে দোকানটির কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছিল কয়েকটা সিরামিকের গামলা হাতে। এবং অপ্রতিভভাবে হাসছিল, ঠিক যেন তার ইঁচড়েপাকা জ্ঞান প্রদর্শনের কারণে। 

তার নামের অর্থ হলো রাজপুত্র, যদিও তার চেহারা কখনোই রাজকীয় ছিল না। সে পরেছিল তেলতেলা গেঞ্জি, ভাঁজযুক্ত ময়লা লুঙ্গি, আর তার খালি পা দুটোই ছিল কড়া-পড়া মোটা চামড়ার চপ্পল। কেউ তাকে তার বয়স জিগ্যেস  করলে সে বলত পনের। কখনো কখনো বলত আঠার অথবা উনিশ। কারণ, এটি তাকে শক্তির বোধ এবং অতিরঞ্জিত করার শক্তিকে বাড়িয়ে দিত। নিজেকে সমাজে বয়স্ক ও শক্তিশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করত, যখন শরীর ও বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী প্রকৃতপক্ষে সে শিশুর চেয়ে বেশী ছিল না। এমনকি যদি সে নিজেকে বিশ বছরের বলে দাবী করত, তারপরেও তাকে লোকজন বিশ্বাস করত, কারণ সে ছিল একজন বড় হৃষ্টপুষ্ট বালক। লম্বায় ও কাঁধে অনেক মানুষের চেয়ে প্রশস্ত। এবং যেহেতু সে খুবই কালো ছিল, সেহেতু তার চিবুক যে হাতের তালুর মতো মসৃণ ছিল। ফলে সে যে সবার মধ্যে সবচেয়ে নির্দোষ ছিল তা ঘুনাক্ষুরেও বোঝা সম্ভব ছিল না।  

নভেম্বরের সেই সকালে কেবলমাত্র ভাগ্যই রাজকুমারকে মান্দালয়ে টেনে নিয়ে এসেছিল। যে সাম্পানে সে বয় ও সংবাদবাহক হিসেবে কাজ করত, সেটিকে বঙ্গোপসাগর হতে ইরাবতীতে যাবার সময়ে মেরামত করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এই কাজটি করতে এক মাস অথবা তারচেয়েও বেশি সময় লেগে যেতে পারে জেনে নৌকার মালিক ভয় পেয়েছিল। নৌকার কর্মচারীদেরকে এতদিন খাওয়ানোর সক্ষমতা তার ছিল না। সুতরাং সে কয়েকজনকে বলেছিল অন্য কোথাও কাজ খুঁজে নিতে। রাজকুমারকে বলা হয়েছিল কয়েক মাইল ভেতরের শহরে যেতে। দুর্গের পশ্চিম দেয়ালের বিপরীত দিকের একটা বাজারে মা চো নামের অর্ধেক ভারতীয় এক মহিলার সাথে তাকে দেখা করতে।  মহিলাটি বাজারে একটা খাবাবের দোকান চালাত। সে হয়ত রাজকুমারকে কোনো কাজ দিতেও পারে।  

সুতরাং মাত্র ১১ বছর বয়সে রাজকুমার জীবনে প্রথম মান্দালয় শহরের ভেতরে ঢুকল এবং ঢুকেই  একটা সোজা রাস্তা দেখতে পেল। রাস্তাটির দুপাশে ছিল বাঁশের দেয়ালের খুপরি, তালপাতা দিয়ে ছাওয়া কুঁড়েঘর এবং গোবর ও আবর্জনার  স্তুপ। কিন্তু সোজা রাস্তাটি দিয়ে তার ভ্রমণ দুইপাশের মতো ময়লা দিয়ে পূর্ণ ছিল না। বরং সেটি ছিল অস্থির সাগরের বুক কেটে চলে যাওয়া বাঁধের মতো, যার গতিপথ লাল রঙের দুর্গের দেয়াল পেরিয়ে শহরের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। মান্দালয় পাহাড়ের মন্দির পর্যন্ত। দূর থেকে পাহাড়ের ঢালে সেটিকে মনে হচ্ছিল সাদা ঘন্টার উজ্জ্বল রশির মতো। 

বয়সের তুলনায় রাজকুমারের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা ছিল যথেষ্টই। যে নৌকাতে সে কাজ করত সেটি ছিল উপকূলীয় বাহন। সেটিকে সারাক্ষণই সাগরের খোলা পানির ওপরে রাখা হতো। এই পানি বার্মা হতে বাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলকে সংযুক্ত করেছিল। রাজকুমার চট্টগ্রাম ও বেসেইন ( Bessein) এবং এই দুটোর মধ্যবর্তী অনেকগুলো শহর ও গ্রামে গিয়েছিল। কিন্তু তার এই সকল ভ্রমণে সে কোথাও মান্দালয়ের মতো রাস্তাঘাট দেখেনি। সে আঁকাবাঁকা সীমাহীন  সরুপথ ও  গলির সাথে সাথে পরিচিত ছিল, যেখানে পরের বাঁকে কী ছিল তা কখনোই দেখা যেত না। কিন্তু এখানকার ব্যাপারগুলো ছিল সম্পুর্ণই নতুনঃ একটা রাস্তা সোজা চলে গিয়েছিল, ডানে-বামে না বেঁকে। ফলে দিগন্তকে মনে হতো জনপদের ঠিক মধ্যিখানে অবস্থিত।  

যখন দুর্গের পূর্ণ বিশালতা দৃশ্যমান হলো, রাজকুমার রাস্তার মাঝখানে থামল। এক মাইল লম্বা দেয়াল ও বিশাল জলাশয়সহ  দুর্গটিকে দেখতে তার কাছে অলৌকিক বলে মনে হলো। খাঁজকাটা কামান দাগার ছিদ্রগুলো প্রায় তিনতলা উঁচুতে ছিল। সেগুলো ছিল খুবই হালকা, লাল রঙের। সেগুলোর শীর্ষে ছিল সাত স্তরযুক্ত ছাঁদ। দেয়ালগুলো হতে লম্বা ও সোজা রাস্তা বাইরের দিকে চলে গিয়ে সেগুলোকে পরিষ্কার জ্যামিতিক গ্রিডের রূপ দিয়েছিল। এতোটাই আকর্ষনীয় ও অদ্ভুত এই রাস্তাগুলোর বিন্যাস ছিল যে, রাজকুমার অনেকদূর পর্যন্ত সেগুলোর ওপর দিয়ে প্রদক্ষিণ করল। এবং   কেবলমাত্র সম্পূর্ণ অন্ধকার হবার সময়েই সে মনে করতে পারল যে তাকে কী কারণে শহরে পাঠানো হয়েছে। তখন সে দুর্গের পশ্চিম দেয়ালের দিকে ফিরে গেল এবং মা চো'র খোঁজ করল। 

(চলবে...) 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!