ঢাকা,  সোমবার   ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

[ খেলা ]

‘৬৩ নট আউট’ ফরএভার

আসাদুজ্জামান লিটন
প্রকাশিত: ১২:৩৭, ২৭ নভেম্বর ২০১৯
‘৬৩ নট আউট’ ফরএভার
ফাইল ফটো

সদা হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তিটা হতে চেয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় গিলক্রিস্ট। অবশ্য উইকেটকিপার হিসেবে নিয়মিত ছিলেন না কখনোই। চলে যেতে হবে সবাইকেই, কিন্তু এভাবে তার চলে যাওয়াও যে মেনে নিতে পারেনি কেউ। তাই না থেকেও আজ সবার স্মৃতিতে রয়েছেন তিনি। বলা হচ্ছে ফিলিপ জোয়েল হিউজ নামক একজন ক্রিকেটারের গল্প। অনেকে তাকে মনে করেন ‘৬৩ নট আউট’ হিসেবেও।

তার ভেতর অমিত সম্ভাবনা দেখেছিল সবাই। প্রায় সকলের ভাষ্য ছিল বড় মাপের একজন ক্রিকেটার পেতে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট। বড় কিছু হতে পারতেন কিনা সেটা জানা যেতো যদি সময় পেতেন। তবে তার আগেই যে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

ক্রিকেট মাঠে আঘাত পাওয়া স্বাভাবিক বিষয়। বোলিং ও ফিল্ডিং করার সময় হরহামেশাই চোটে পড়েন ক্রিকেটাররা। ব্যাটসম্যানরা তুলনামূলক কম ইনজুরির শিকার হন। তবে একটা ইনজুরিই কেড়ে নেয় ফিলিপ হিউজের প্রাণ।

ঘটনার পটভূমি ২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বর। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেট শেফিল্ড শিল্ডে খেলছিলেন নিজের জন্মরাজ্য নিউ সাউথ ওয়েলসের বিপক্ষে। জাতীয় টেস্ট দলে ছিলেন আসা যাওয়ার মাঝে। তবে সে মৌসুমে দুর্দান্ত কিছু ইনিংস খেলে অস্ট্রেলিয়ার দলে ডাক পাওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলেন। ভেন্যু ছিল বিখ্যাত সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড। স্মৃতির পাতা মনে করিয়ে দেয়, এ মাঠেই শেফিল্ড শিল্ডের ফাইনালে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান হওয়ার গৌরব রয়েছে তার।

অস্ট্রেলিয়ানরা বরাবরই স্লেজিং-এর দিক দিয়ে এগিয়ে। ঘটনাপ্রবাহ থেকে জানা যায়, নিজ ঘরের বিপক্ষে খেলায় সেদিন স্লেজিংটা একটু বেশিই করা হচ্ছিল তাকে। এক বোলার নাকি তাকে বলেই ফেলেছিল, ‘I will kill you.’ কেউ হয়তো ভাবেননি, আসলেই সবাইকে ছেড়ে সেদিনই ওপারে পাড়ি জমানোর প্রস্তুতি নেবেন তিনি।

সেদিন মোট ২০ টা বাউন্সার দেয়া হয় হিউজকে। এর মাঝে ১৯টি ডেলিভারিতেই রান করেন হিউজ। কিন্তু ২০-তম বাউন্সারেই বাঁধে বিপত্তি। পেসার শন অ্যাবোট নিজেও হয়তো ভাবেননি, হিউজের জীবনের শেষ ডেলিভারি করে ফেলেছেন তিনি।

অ্যাবোটের সেই বাউন্সার পুল করতে চেয়েছিলেন। তবে কি ভেবে যেনো শেষ মূহুর্তে চোখ সরিয়ে নিলেন বলের ওপর থেকে। বলটা সরাসরি আঘাত করলো বাম কানের পেছনে ঠিক নীচের অরক্ষিত জায়গায়। একবার ভাবুন, আপনার এখানে হালকাভাবে আঘাত পেলে কেমন লাগতে পারে। সেখানে হিউজ ব্যথা পান একজন পেসারের বলে! 

ছবি: সংগৃহীত
বল লাগার পরেই ঝাপসা হয়ে এলো আশেপাশের সবকিছু। দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করলেন, তবে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না। জ্ঞান হারালেন মূহুর্তেই। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেন্ট ভিনসেন্ট হাসপাতালের ডাক্তাররা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েন “ইনডিউসড কোমা”-তে থাকা হিউজ। শেষ পর্যন্ত পাঁচ বছর আগে আজকের দিনে (২৭ নভেম্বর ২০১৪) ক্রিকেট বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের প্রার্থনাকে পাশ কাটিয়ে চলে যান না ফেরার দেশে।

হিউজ যে ধরনের আঘাতে মারা যান তা ছিল অত্যন্ত বিরল ধরনের ইনজুরি। মেডিকেলের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বল হিউজের মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ করা ধমনীতে আঘাত করলে সেই ধমনী ছিন্ন হয়ে যায় (vertebral artery dissection)। ফলে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে ব্রেইন হ্যামারেজে তার মৃত্যু হয়। সেদিন হিউজের মাথা ফেঁটে রক্ত বের হলেও হয়তো বেঁচে যেতেন। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা কি ভেবে যে তাকে এভাবে নিয়ে গেলেন কে জানে!

সম্ভাবনাময় হিউজের গল্পের শুরু নিউ সাউথ ওয়েলস থেকে। ম্যাকসভিল গ্রামের কলা চাষী বাবা আর ইতালিয়ান মায়ের ছোট্ট ছেলেটি ১২ বছর বয়সেই করেছিলেন এ-গ্রেড সেঞ্চুরি। ১৭ বছরে সিডনিতে পাড়ি জমান, গ্রেড ক্রিকেটে অভিষেক ম্যাচেই ১৪১* রানের ইনিংস খেলে বুঝিয়ে দেন অনেক বড় লক্ষ্য নিয়েই বড় মঞ্চে পা রেখেছেন। মৌসুমে ৭৫২ রান করে জায়গা করে নেন ২০০৮ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে।

বড় দলের দিকে ছুটতে থাকেন দ্রুতই। মাইকেল ক্লার্কের পর সর্বকনিষ্ঠ নিউ সাউথ ওয়েলস ক্রিকেটার হিসেবে মাত্র ১৮ বছর ৩৫৫ দিনে অভিষেক হয় শেফিল্ড শিল্ডে। অভিষেক ম্যাচ রাঙান ৫১ রান আর দুটি ক্যাচ নিয়ে। অভিষেক মৌসুমেই ৬২.১১ গড়ে ৫৫৯ রান করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। এর মাঝে শেফিল্ড শিল্ড ফাইনালে ১১৬ রানের চমৎকার এক ইনিংস খেলেন। শিল্ড ফাইনালের সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ানের রেকর্ডে এখনো জ্বলজ্বল করছে ফিলিপ হিউজের নাম। কলপ্যাক চুক্তিতে কাউন্টি খেলার ডাক পেলেও দেশের হয়ে খেলাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন এ ক্রিকেটার।

জাতীয় দলেও ডাক পেয়ে যান বেশ দ্রুত। ২০০৯ সালে অজি লিজেন্ড ম্যাথু হেইডেনের রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে জায়গা পান। তবে অভিষেক ইনিংসটা ছিল হতাশার। টেস্ট অভিষেকের প্রথম ইনিংসে ডেইল স্টেইনের বলে শূন্য রানে আউট হন। তবে হার না মানা হিউজ দ্বিতীয় ইনিংসে করে ফেলেন দলীয় সর্বোচ্চ ৭৫ রান।

ছবি: সংগৃহীতক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচের দেখা পেয়ে যান পরের টেস্টে। সেই ম্যাচের প্রথম ইনিংসে করেন ১১৫ রান, ছুঁয়ে ফেলেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সবচেয়ে কম বয়সে টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড। থেমে থাকেননি সেখানেই, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬০ রানের আরেকটা অনবদ্য ইনিংস খেলে সবচেয়ে কম বয়সী ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করার রেকর্ড করে ফেলেন ফিলিপ হিউজ (ইতিহাসে দ্বিতীয়)।

অন্যান্য সব ক্রিকেটারের মতো বাজে সময় এসেছিল হিউজের ক্ষেত্রেও। ২০০৯ এশেজ সিরিজ ভালো করেননি। পরের এক বছর ছিলেন যাওয়া আসার ভেতর। এর মাঝে কলম্বোতে শ্রীলংকার বিপক্ষে ১২৬ রানের অসাধারন এক ইনিংস খেলেন। তবুও টেস্ট দলে জায়গা পাকা হচ্ছিল না।

অবশ্য মাইক হাসির অবসরে ওয়ানডে দলে জায়গা করে নেন ফিলিপ হিউজ। ওয়ানডে অভিষেকটা হয়েছিলো দারুণ। শ্রীলংকার বিপক্ষে মেলবোর্নে ১১২ রানের ইনিংসে করেন ওয়ানডে অভিষেকে প্রথম অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড। ওই সিরিজের পঞ্চম ম্যাচে করেন ক্যারিয়ার সেরা ১৩৮*। চোখ তখন ২০১৫ বিশ্বকাপে। দলও হয়তো তাকে নিয়েই পরিকল্পনা সাজাচ্ছিল। তবে এর আগেই তো...

ফিলিপ হিউজের মৃত্যুতে শেফিল্ড শিল্ডের সেই ম্যাচটা বাতিল করা হয়। “রিটায়ার্ড হার্ট” মুছে ফেলে অফিশিয়াল সব স্কোরকার্ডে লেখা হয় ৬৩ নট আউট। হিউজের জার্সি নাম্বার ৬৪। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, এই নাম্বার আর কাউকে দেয়া হবেনা। সবসময় হিউজের জন্যই সংরক্ষিত থাকবে এটি।

এদিকে ফিলিপ হিউজের অকাল প্রয়াণে হেলমেট নিয়ে অনেক গবেষনা শুরু হয়। এর ফলে অতিরিক্ত সেফটি গার্ড যোগ করা হয় হেলমেটের পিছনে। অবশ্য অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের একাধিক রিসার্চ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত যেসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তার কোনটাই হিউজের পড়া ইনজুরির ধরণ থেকে ব্যাটসম্যানকে রক্ষা করবে এই নিশ্চয়তা নেই।

হিউজের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় সারা ক্রিকেটবিশ্ব। অস্ট্রেলিয়া দলে তার সতীর্থরা কতটা আঘাত পেয়েছিলেন তার প্রমাণ মেলে পরবর্তী সিরিজেই। বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফির প্রথম টেস্ট ম্যাচে প্রথা মেনে আগের দিনই একাদশ ঘোষনা করে অজিরা। নিয়ম অনুসারে প্লেয়িং একাদশের সঙ্গে দ্বাদশ খেলোয়াড়ের নাম ঘোষণা করা হয়। তবে সেদিন অস্ট্রেলিয়া দলে ১৩-তম খেলোয়াড় হিসেবে অফিশিয়ালি ঘোষনা করা হয় ফিলিপ হিউজের নাম। এমনকি সব অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়ের জার্সিতে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ব্যাজের নীচে একটাই নাম্বার, ‘৪০৮’ লেখা ছিল।

ছবি: সংগৃহীতম্যাচ শুরুর আগে ৬৩ সেকেন্ড একটানা কড়তালি দিয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান মাঠে উপস্থিত সবাই। সেদিন ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভ স্মিথ ব্যক্তিগত ৬৩* রানে পৌঁছানোর পর ব্যাট উঁচিয়ে আকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। স্মিথ তো সেঞ্চুরি পূরণ করেই চলে যান মাঠের ভেতর বড় করে লেখা ‘৪০৮’ নাম্বারের কাছে। অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ৪০৮ রান হতেই মাঠে উপস্থিত দর্শকেরা দাঁড়িয়ে কড়তালিতে মুখর করে তোলেন পরিবেশ। এমন আবেগময় পরিস্থিতিতে কিছুক্ষণের জন্য খেলাই বন্ধ হয়ে যায়।

প্রতিবছর ২৭ নভেম্বর আসলেই মনে পড়ে যায় ফিলিপ হিউজের কথা। হয়তো অশ্রুসজল চোখে আকাশের দিকে তাকান তার সতীর্থরা। প্রভুর নিকট প্রার্থনা করেন হিউজের জন্য। উপর থেকে হিউজ কি দেখতে পারেন এসব? হয়তো তিনিও বলেন, চিন্তা করোনা বন্ধুরা। আমি আছি তোমাদের সঙ্গে। তোমাদের মাঝেই থাকবো চিরকাল।

ফিলিপ জোয়েল হিউজ থাকবেনই। তার 'ব্যাগি গ্রীন নাম্বার ৪০৮', ‘৬৩ নট আউট’ এই দুটি বাক্য বিশ্বজুড়ে ক্রিকেট প্রেমীদের কাঁদিয়ে যাবে যুগ যুগ ধরে। যতবার কোন বোলারের বাউন্সার ব্যাটসম্যানের হেলমেটে আঘাত করবে ততবারই ফ্যানদের মনে ফিরে আসবেন হিউজ। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের স্মৃতিফলকে যেভাবে আছেন, ফিলিপ হিউজ তার চেয়েও কাছে আছেন ভক্তদের হৃদয়ে।

‘সিক্সটি থ্রি নট আউট’-কে সহজে ভুলতে পারবেনা কেউই। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএল
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!