প্রকৃতির বন্ধু ইউডার চারুকলা
নদীমাতৃক দেশে হারিয়ে যাচ্ছে নদী, পুরান ঢাকাও ঢেকে গেছে নতুন ভবন আর প্রযুক্তিতে। মুক্ত খোলা মনে দূরে কোথায় হারিয়ে যেতে না পারলে একঘেয়েমি জীবনে শিল্পীর মনেও আসে না সৃজনশীল ভাবনা। কিংবা মানবিক গুণাবলি না থাকলে সে শিল্পী হলেও তো সমাজের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না।
‘এসব ভাবনায় মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন জীবনমুখী শিল্পী গড়তে ইউডা চারুকলা বিভাগ কোর্স কারিকুলাম সাজিয়েছে ব্যতিক্রমী ও জীবনমূখী কোর্স দিয়ে’, বলছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ডেভলপমেন্ট অলটারটেনিভ এর চারুকলা বিভাগের চেয়্যারমান অধ্যাপক শাহজাহান।
২০০২ সালে সেপ্টেম্বরের ১৭ তিনজন শিক্ষক আর ২৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পথচলা শুরু। এরই মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তের শেষ করেছে প্রায় ১২শ’ শিক্ষার্থী।
বর্তমানে পড়ালেখা করছে প্রায় ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী। জাপানের একজন বিদেশী শিক্ষকসহ ২৫জন শিক্ষক দিচ্ছেন পাঠদান।
‘দেশে ইউডাই প্রথম যেখানে চারুকলার শিক্ষার্থীদের স্নাতকোত্তরে অধ্যায়নের সুযোগ আছে’ জানালেন চারুকলার আরেক শিক্ষক এসএম আহসান।
চারুকলার বিভাগে কোর্স কারিকুলামে আছে নতুনত্ব। এর মধ্যে অ্যাডভান্সড ড্রইং, কোলাজ আর্ট, রাইটিং আ’বাট আর্ট আন্ড ডিজাইন, রেনেসাঁ আর্ট, ফাউন্ড অবজেক্ট স্টাডি, ফোক আর্ট, ইন্সটলেশন আর্ট, ওল্ড মাস্টার স্টাডি, গ্যালারি ম্যানেজমেন্ট কোর্স, রেস্টোরেশন অব আর্ট ওয়ার্ক ও অবজারভেশন অব নেচার আন্ড স্টাডি অন্যতম।

অবজারভেশন অব নেচার অ্যান্ড স্টাডি কোর্স করতে শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে পড়ে দূর গ্রামে। প্রকৃতির সঙ্গে মেলামেশায় যে অভিজ্ঞতা তা হাতের ছোয়ায় ক্যানভাসে কখনো বা বালু ভাস্কর্যে তুলে আনে শিক্ষার্থীরা। তাৎক্ষনিক আঁকা এসব নিয়ে আবার স্পটেই আয়োজন করে প্রদর্শনীর।
এরই মধ্যে ৩৩টি ব্যাচ এ কোর্সটি শেষ করেছে। কোর্সটি পরিশ্রমসাধ্য হলেও শিক্ষার্থীদের মানবিক ও দেশপ্রেমিক হতে সাহায্য করে। শিক্ষার্থীরা দিনে ১৫-২০টির মতো ছবি একে ফেলে মনের আনন্দে। চারুকলা থেকে স্নাতক ও স্নাতকে উত্তীর্ণ হওয়া প্রায় ১২০০ শিক্ষার্থী কর্মজীবনে। তাদের একজনও বেকার নেই। ইউডা থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করছেন শারমিন রহমান। পাশাপাশি চারুকলায় পড়ছেন স্নাতকোত্তরে।
নিজ বিভাগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এখানে বিভিন্ন ইভেন্টে কাজ করতে হয়েছে। এখন যে কোনো ইভেন্ট আয়োজন আমার কাছে খুবই সহজ। শিল্পীর মানুষ হওয়ার যে চেষ্টা তা দিয়েছে এখানকার পরিবেশ।
চারুকলা বিভাগে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এমন শিক্ষার্থী, মেধাবী ও পাহাড়ী অঞ্চল থেকে সংগ্রাম করে লেখাপড়া করতে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে স্কলারশিপের ব্যবস্থা।
দেশ ও বিদেশের নানান পুরস্কার আছে এখানকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ঝুলিতে। মজার ব্যাপার হলো শিক্ষার্থীরাই আবার বিভাগে আসে শিক্ষক হয়ে।

বিভাগের চেয়্যারমান জানালেন, ইউডার বর্তমান শিক্ষকদের মধ্যে ৪০% হলো এখানকার সাবেক শিক্ষার্থী। ইউডার থেকে পাস করে বর্তমানে ইউডাতেই শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন এস.এম আহসান।
চারুকলা বিভাগ নিয়ে তিনি বলেন, ইউডা চারুকলায় ছাত্র থাকা অবস্থায় পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও জড়িত ছিলাম। যা আমাকে পরিণত করেছে মূল্যবোধ ও মনুষত্বে। পড়ালেখার পাশাপাশি ইউডার শিক্ষার্থীরা অংশ নেন গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টগুলোতে। পহেলা বৈশাখে ধানমন্ডিতে আয়োজন করে বাংলা শোভাযাত্রার। ২০০৩ সাল থেকে প্রতিবছরই ২৫ মার্চের কালরাতে চারুকলার নেতৃত্বে ইউডা আয়োজন করে পথচিত্রাঙ্কন। এ শৈল্পিক আয়োজনে অংশগ্রহণ করে দেশের সকল গুণিশিল্পীরা। একরাতে প্রায় চারশতাধিক মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক অঙ্কন আছে চারুকলা বিভাগে।
যা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে বলে মনে করেন চারুকলা বিভাগের চেয়্যারমান। চারুকলা বিভাগটি ধানমন্ডির লেকপাড়ে সুনিবিড় সবুজের চাদরে ঘেরা।
সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলে প্রাকটিক্যাল ক্লাস (স্নাতক)। বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত স্নাতকোত্তর ক্লাস।
চারুকলা বিভাগের চেয়্যারমান অধ্যাপক শাহজাহান আহমেদ বিকাশ বলেন, চারুকলা যে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বেশ ব্যয় সাপেক্ষ। এ কারণে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশে মাত্র ২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।