ঢাকা,  শুক্রবার   ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

ফিকে হচ্ছে সোনালী আঁশ

হারুন আনসারী, ফরিদপুর
প্রকাশিত: ১৫:৪৭, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯
ফিকে হচ্ছে সোনালী আঁশ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সোনালী আঁশখ্যাত পাট দিনে দিনে তার জৌলুস হারাচ্ছে। লোকসান হওয়ায় পাট চাষে কৃষকের আগ্রহ ক্রমেই কমছে। 

১০ বছর আগেও ফরিদপুরের হাটে ভাল মানের এক মণ পাটের দাম ছিলো ১৮০০ টাকা। তখন শ্রমিকের মজুরি ছিলো সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। এখন এই মজুরি বেড়ে ৪০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে জমির বর্গা মূল্য, সার, বীজসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের দাম। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি পাটের দাম। 

ফরিদপুরের বাজারে এখন পাটের গড় মূল্য মণপ্রতি ১৪০০ টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ভালমানের সোনালী আঁশ সদৃশ পাট বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ টাকা দরে। আর নিম্নমানের পাট এক হাজার টাকা মণও পাওয়া যাচ্ছে না। 

Advertisement

সরেজমিনে মঙ্গলবার ফরিদপুরের কানাইপুর, সাতৈর, পুখুরিয়াসহ প্রসিদ্ধ হাটে পাটের বাজারমূল্য এমনই দেখা গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সূত্রানুযায়ী, পাটের রাজধানী খ্যাত ফরিদপুরে এ বছর সরকারি হিসেবে ৮২ হাজার ৯৯০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। বিপরীতে উৎপাদন লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮১ হাজার ৯৩০ মেট্রিক টন। আর গত বছর জেলায় ৮৩ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছিলো ৮৫ হাজারের হেক্টরেরও বেশি জমিতে। এই এক মৌসুমে ফরিদপুরে পাট চাষের পরিমাণ কমার পেছনে পাটের মূল্য না বাড়ার কারণকেই দায়ি করছেন কৃষকেরা। 

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন, সদরপুর ও আলফাডাঙ্গা বাদে জেলা সদরসহ বোয়ালমারী, মধুখালী, ভাঙ্গা, নগরকান্দা ও সালথার অনেক জমিতে পাটের আবাদ হয়ে থাকে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ জমিতেই তোষা জাতের পাটের চাষ করা হয়।

ফরিদপুরের বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, এসব হাটে বড় বড় মহাজনী পাইকার ব্যবসায়ীদের লোকেরা কৃষকদের কাছ থেকে পাট কিনছেন। সরাসরি মিল গেটে কৃষকের পাট বিক্রির কোনো ব্যবস্থা নেই। এতে কৃষকের পাটের মুনাফার একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।  

১০ বছরেও পাটের দাম না বাড়ায় এসব পাটচাষিরা হতাশ। এখন পাট বিক্রির মৌসুমে তাদের অনেকেই পাট বিক্রি করে হাসি মুখের পরিবর্তে মলিন মুখে বাড়ি ফিরছেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা পাটের দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসলেও তাদের সে দাবি পূরণ হয়নি।

ফরিদপুরের কানাইপুর ইউপির মৃগী গ্রামের পাট চাষি মো. শাজাহান মোল্যা জানান, ৫২ শতাংশের এক বিঘা জমিতে পাট উৎপাদন করতে তার প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে ১০ মণের কিছু বেশি পাট পাওয়া গেছে। এই পাট বিক্রি করে তেমন লাভের মুখ দেখা যাবে না। কারণ বাজারে এখন পাটের দাম পড়তি। মৌসুমের শুরুতে ২২ টাকা দরে এক মণ পাট বিক্রি হলেও এখন তা কমে সর্বনিম্ন ৯০০ টাকায় দাড়িয়েছে। 

আব্দুল হালিম শেখ নামে ভাঙ্গা উপজেলার একজন কৃষক বলেন, এক দশকের মধ্যে পাটের সর্বোচ্চ দাম পাওয়া গিয়েছিলো ২০১০ সালে। সেবার ভাল মানের এক মণ পাট ২৬০০ টাকা দরেও বিক্রি হয়েছিলো। কিন্তু তারপর থেকে দাম ক্রমেই কমে যাচ্ছে। গত বছর আবার পাটের দাম কিছুটা বেড়ে এক মণ পাট ২২০০ থেকে ২৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিলো। কিন্তু এ বছর আবার কমে গেছে। 

লাভ না হলে কেনো তারা পাট চাষ করে এ প্রশ্নের জবাবে হালিম শেখ জানান, কিছু কৃষক পাট চাষে অভ্যস্ত। তাই তারা এক ধরনের মোহ থেকেই পাট চাষে মনোনিবেশ করেন। যারা নিজস্ব জমিতে পাটের আবাদ করে তারা কিছুটা সুবিধা পেলেও অন্যের জমি বর্গা নিয়ে পাট চাষ করে গরিব চাষিরা লাভের মুখ দেখতে পায় না।

ফরিদপুর কৃষক সমিতির সভাপতি মানিক মজুমদার বলেন, কৃষকের ক্ষতি পূরণের স্বার্থে আমরা পাটের দাম তিন হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছি। এছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রোধের জন্য প্রতিটি ইউপিতে সরকারি পাট ক্রয় করে কেন্দ্র চালুরও দাবি জানিয়েছি। কিন্তু আমাদের এসব দাবির প্রতি কর্ণপাত না করায় কৃষকেরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। 

তিনি আরো বলেন, দেশের অন্যতম অর্থকরি ফসলের সঙ্গে এরূপ উদাসিনতা থাকা উচিত নয়।

ফরিদপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কার্তিক চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, এ বছর পাটের আবাদ সন্তোষজনক। তবে বৃষ্টির অভাবে খালে বিলে পানি জমেনি। পাট জাগ দিতে অনেক ঝঁক্কি পোহাতে হয়েছে কৃষকদের। ভালভাবে জাগ দিতে না পারায় পাটের রংও আসেনি। এজন্য সাধারণ কৃষকদের মাঝে পাটের দাম নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!