ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

নুসরাত হত্যা মামলার আদ্যোপান্ত

আব্দুল্লাহ আল মামুন, ফেনী
প্রকাশিত: ১১:৩৮, ২৪ অক্টোবর ২০১৯
নুসরাত হত্যা মামলার আদ্যোপান্ত
ফাইল ছবি

দেশ-বিদেশে আলোচিত ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসারছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। একইসঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেয়া হয়। 

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ এ রায় ঘোষণা করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজু রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের ২৭ মার্চ হয়। ওইদিন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন নিহত নুসরাতের মা শিরিন আখতার। সেই মামলায় অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তার অনুগত ক্যাডার সিরাজকে জেল থেকে বের করে আনতে জনমত গঠনের চেষ্টা করে। এরপর তারা সিরাজকে মুক্ত করতে সড়কে আন্দোলনও করে।

৩ এপ্রিল খুনিরা সিরাজের সঙ্গে কারাগারে পরামর্শ করে। ৪ এপ্রিল মাদরাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে খুনের পরিকল্পনা গ্রহন করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৬ এপ্রিল নুসরাত মাদরাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে খুনিরা পরিকল্পিতভাবে সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে নিয়ে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা চালায়।

ঘটনাস্থল থেকে নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। এরপর তাকে স্থানান্তর করা হয় ফেনী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। অবস্থা বেগতিক দেখায় সেখান থেকে নুসরাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে নিয়ে যাওয়া হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন নুসরাত।

এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল ৮ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত বোরকা পরা চারজনকে আসামি করে মামলা করেন। সে মামলাটি ১০ এপ্রিল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআইয়ে) হস্তান্তর করা হয়। সেদিন রাতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে নুসরাত। মৃত্যুর আগে ডাইং ডিক্লারেশন দিয়ে যায় সে- তার সেই ডিক্লারেশনের ক্লু ধরেই এগুতে থাকে মামলা। এক এক করে গ্রেফতার করা হয় আসামিদের।

১১ এপ্রিল নুসরাতের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। সোনাগাজী সাবের পাইলট হাইস্কুল মাঠে নামাজে জানাজার পর তার দাফন সম্পন্ন হয়। সেদিন নুসরাতের জানাযাটি ছিলো লোকে লোকারণ্য। লাখো মানুষ তার জানাজা অংশ নিয়ে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছিলো।  

এরপর একে একে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করা হয় ২১ জনকে। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় ১২ জন। ২৮ মে চার্জশিট দাখিল করা হয়। আদালত ৫ জনকে বাদ দিয়ে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করে ১৬ জনকে। নুসরাত হত্যায় পুলিশের অবহেলার অভিযোগে ১৩ মে প্রত্যাহার করা হয় ফেনীর তৎকালীন এসপি জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে। থানায় হেনস্থা হওয়া নুসরাতের ভিডিওটি প্রকাশ হওয়ার পর ৮ মে সোনাগাজী থানার ওসি মেয়াজ্জেমসহ পুলিশের দুই এসআইকে ৮ মে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তার নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। ১৬ জুন রাজধানীর শাহবাগ এলাকা থেকে বহিষ্কৃত ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতার করা হয়।

নুসরাত হত্যার মামলায় ১০ জুন অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুানালের বিচারক মামুনুর রশিদ। পরে ২০ জুন চার্জ গঠন হয়। ২৭ জুন থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়, ৯০ সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য দেয় মোট ৮৭ জন। দীর্ঘ ৪৭ দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছিলো যুক্তিতর্ক। চলে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত রায়ের জন্য ২৪ অক্টোবরকে নির্ধারণ করেন। মামলাটিতে মাত্র ৬১ কার্য দিবসে ৮৭ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তি তর্ক গ্রহণ করা হয়।

সাক্ষীদের সাক্ষ্য প্রমাণ ও পিবিআইয়ের তদন্তে প্রতীয়মান হয় ছাদে কিলিং মিশনে অংশ নেয় পাঁচজন। জেল থেকে হত্যার নির্দেশ দেয় মাদরাসার অধ্যক্ষ্য সিরাজ উদদৌলা। আর অর্থ যোগানদাতা ছিলেন তৎকালীন রহুল আমীন ও কাউন্সিলর মাকসুদ। গেইট ও সিঁড়ি পাহারায় ছিলো বাকি আসামিরা।

মামলার এজহারনামীয় আসামি (এজহারের তালিকা অনুযায়ী)

১. এস.এম. সিরাজ উদদৌলা, অধ্যক্ষ
২. নুর উদ্দিন, সাবেক ছাত্র
৩. শাহাদাত হোসেন শামীম, মাদরাসার ছাত্র, ফাজিল
৪. মাকসুদ আলম, কাউন্সিলর, ৪ নং ওয়ার্ড, সোনাগাজী পৌরসভা
৫. জোবায়ের আহম্মেদ, সদস্য, অধ্যক্ষ মুক্তি পরিষদ
৬. জাবেদ হোসেন, মাদরাসার ছাত্র
৭. হাফেজ আবদুল কাদের, হেফজখানার শিক্ষক।
৮. আফসার উদ্দিন, প্রভাষক, ইংরেজী।

এজহারনামীয় গ্রেফতার

১.এস.এম. সিরাজ উদদৌলা, অধ্যক্ষ রিমান্ড-সাতদিন-আদালতে ১৬৪
২.আফসার উদ্দিন, প্রভাষক- রিমান্ড-পাঁচদিন
৩.জোবায়ের আহম্মেদ- রিমান্ড-সাতদিন-১৬৪ স্বীকারোক্তিমূলক
৪. মাকসুদ আলম, কাউন্সিলর, রিমান্ড- পাঁচদিন
৫. জাবেদ হোসেন- রিমান্ড-সাতদিন, দ্বিতীয় দফা তিনদিন। ১৬৪ স্বীকারোক্তিমূলক
৬. নুর উদ্দিন- ১৬৪ ধারা জবানবন্দি
৭. শাহাদাত হোসেন শামীম-১৬৪ ধারা জবানবন্দি, ২৫ এপ্রিল তিনদিনের রিমান্ড
৮. হাফেজ আবদুল কাদের-১৬৪ ধারা জবানবন্দি

আসামি ও রিমান্ড:

৯. আরিফুল ইসলাম- রিমান্ড-পাঁচদিন
১০. সাইদুল ইসলাম- রিমান্ড-পাঁচদিন
১১. কেফায়েত উল্যাহ- রিমান্ড-পাঁচদিন
১২. নুর হোসেন- রিমান্ড-পাঁচদিন
১৩. আলা উদ্দিন- রিমান্ড-পাঁচদিন
১৪. উম্মে সুলতানা পপি- রিমান্ড-পাঁচদিন
১৫. মো. শামীম-১৫ এপ্রিল গ্রেফতার- ১৮ তারিখ শুনানি
১৬. কামরুন নাহার মনি-১৫ এপ্রিল গ্রেফতার, পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর
১৭. আবদুর রহীম শরিফ- ১৭ এপ্রিল গ্রেফতার এবং ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি
১৮. রহুল আমিন, গ্রেফতার ২০ এপ্রিল, রিমান্ড-পাঁচদিন।
১৯. এমরান হোসেন মামুন সরাসরি কারাগারে।
২০. ইফতেখার উদ্দিন রানা। সরাসরি কারাগারে।
২১. মহিউদ্দিন শাকিল, গ্রেফতার ২৫ এপ্রিল, ফেনীর উকিল পাড়া থেকে।

আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে ১২ জন

১. নুর উদ্দিন- (এজহারনামীয়)
২. শাহাদাত হোসেন শামীম- (এজহারনামীয়)
৩.আবদুর রহীম শরিফ-(এজহারনামীয়)
৪. হাফেজ আবদুল কাদের-(এজহারনামীয়)
৫. উম্মে সুলতানা পপি- (সন্দিগ্ধ)
৬. জাবেদ হোসেন- (এজহারনামীয়)
৭. কামরুন নাহার মনি(সন্দিগ্ধ)
৮. জোবায়ের আহম্মেদ (এজহারনামীয়)
৯. অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা। (এজহারনামীয়)
১০. এমরান হোসেন মামুন
১১. ইফতেখার

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকেএ/টিআরএইচ/টিএএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!