ঢাকা,  শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ আন্তর্জাতিক ]

শান্তি আলোচনায় আগামীকাল ইসলামাবাদে বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৫৫, ১০ এপ্রিল ২০২৬
শান্তি আলোচনায় আগামীকাল ইসলামাবাদে বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি ‘ভঙ্গুর’ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এখনো কাটেনি। বরং এই পদক্ষেপটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্থিতিশীলতা আনবে, নাকি এটি কেবল বড় সংঘাতের মাঝে একটি সাময়িক বিরতি—তা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

এমন পরিস্থিতিতে আগামীকাল (শনিবার ১১ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে উভয় পক্ষ সরাসরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা এই শান্তি আলোচনাকে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, আলোচনা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান অনেক বড়। উভয় পক্ষই নিজেদের ‘রেড লাইন’ থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

ওয়াশিংটন সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখে যুদ্ধবিরতি চুক্তি না মানলে আরও ভয়াবহ হামলার হুমকি দিয়ে এগোচ্ছে, অন্যদিকে তেহরান ভূরাজনৈতিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে সময় নেওয়ার কৌশল নিয়েছে। দুই পক্ষের অবস্থান এতটাই দূরে যে দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।

স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য উভয় পক্ষ যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই পরস্পরবিরোধী। ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। একইভাবে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়েও তেহরান কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের **১৫ দফা প্রস্তাব** মূলত ইরানের সামরিক সক্ষমতা খর্ব করা, উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন কমানোর ওপর জোর দিয়েছে। ফলে আলোচনার শুরুতেই ‘কমন গ্রাউন্ড’ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে হরমুজ প্রণালিয় চলে এসেছে। তেহরান স্থায়ী চুক্তির অংশ হিসেবে প্রণালিতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের দাবি জানিয়েছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো মুক্ত নৌচলাচল নিশ্চিত করতে চায়।

আলোচনা শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, এতে লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলাও জটিলতা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, লেবাননের সংঘাত এ চুক্তির বাইরে থাকবে। কিন্তু ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট জানিয়েছেন, লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ না হলে কোনো চুক্তিই সম্ভব নয়। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও লেবাননকে যুদ্ধবিরতির ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে গতকাল ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব’ লেবাননের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনও জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও সরাসরি আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ক্ষমতার ভারসাম্যও এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে শক্তিশালী হলেও ইরানের হাতে রয়েছে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ, যা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সুযোগ দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শুরুতে যে লক্ষ্য (ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস, পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ ও রেজিম চেঞ্জ) ঘোষণা করেছিল, তার কোনোটিই পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।

শনিবার সকালে ইসলামাবাদে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে থাকবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, সিনিয়র উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার ও সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। ইরানের প্রতিনিধিত্ব করবেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মজিদ তাখত-রাভানচি।

আয়োজক ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের পক্ষে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সেনাবাহিনী প্রধান আসিম মুনির, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও আইএসআই প্রধান আসিম মালিক।

ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান লেবাননে ইসরায়েলি হামলাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, এতে আলোচনা অর্থহীন হয়ে যাবে। অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স লেবানন ইস্যুকে ‘যৌক্তিক ভুল বোঝাবুঝি’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, ইরানিরা হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, চুক্তি না মানলে ‘আরও বড়, আরও ভয়াবহ ও আরও শক্তিশালী’ গোলাবর্ষণ শুরু হবে, যা আগে কেউ দেখেনি। তিনি আরও জানিয়েছেন, যতক্ষণ না চুক্তি পুরোপুরি মানা হচ্ছে, ততক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের সব জাহাজ, উড়োজাহাজ ও সামরিক সদস্য ইরানের আশপাশে অবস্থান করবে।

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য মাইন এড়াতে নতুন বিকল্প রুট ঘোষণা করেছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের নৌ শাখা।

আলোচনার ফলাফল কী হয়, তা দেখার জন্য আন্তর্জাতিক মহল উৎকণ্ঠিত।

সূত্রঃ বিবিসি 

ডেইলি-বাংলাদেশ/টিএএস
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!