আফ্রিকা মহাদেশে তুরস্কের অস্ত্রের চাহিদা তুঙ্গে কেন?
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বে অস্ত্রের রমরমা ব্যবসা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স, চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশ। তবে বেশ কয়েক দশক ধরে সেই তালিকায় আধিপত্য বিস্তার করছে তুরস্কা। এর মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশটির অস্ত্রের দিকে ঝুঁকেছে আফ্রিকা মহাদেশের বেশ কয়েকটি দেশ। ফ্রান্সের অস্ত্রের বাজার দখল করা তুরস্ক এখন বেশ উদ্যোমের সঙ্গে সমরাস্ত্র তৈরি করছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় তুরস্কের কাছ থেকে অস্ত্র কিনছে আফ্রিকার মহাদেশের দেশগুলো। তাই গত কয়েক বছর ধরে বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র তৈরির কাজ করছে দেশটি। বিশেষ করে- তুরস্কের তৈরি ড্রোন, যুদ্ধ হেলিকপ্টার, টার্বোপ্রপ বিমান আফ্রিকার দেশগুলোর চাহিদার তুঙ্গে রয়েছে।
আফ্রিকার দেশগুলোতে তুরস্কের অস্ত্রের চাহিদার বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এক প্রতিবেদনে জানায়, নিরাপদ, সাশ্রয়ীসহ বেশ কয়েকটি কারণে তুরস্কের যুদ্ধাস্ত্রের প্রতি আফ্রিকার দেশগুলোর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে- যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন সক্ষমতার প্রমাণ রাখায় তুরস্কের ড্রোনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
যুদ্ধাস্ত্র বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘নিউজলাইন ইনস্টিটিউট স্ট্র্যাটেজি এন্ড ইনোভেশনের’ পরিচালক নিকোলাস হেরাস বলেন, কয়েকটি কারণে তুরস্কের ড্রোন কেনার প্রতি আফ্রিকার ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। কারণ তুরস্কের ড্রোন রুক্ষ ও সহজে চালানো যায়। সেগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণও সহজ। ড্রোনগুলো আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংঘর্ষে ব্যবহার করা যায়।
তিনি আরো বলেন, রাশিয়ার মতো পরাশক্তির আকাশ প্রতিরক্ষার বিরুদ্ধে তুরস্কের ড্রোন এতটা কার্যকর না। তবুও ক্রেতা দেশগুলো বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত নয়।
অন্যদিকে, কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইবনে খালদুন সেন্টারের সহকারী অধ্যাপক ডক্টর আলী বাকির মিডল ইস্ট আইকে বলেন, আফ্রিকায় তুরস্কের সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা বাড়ার অনেক কারণ রয়েছে। কম দাম, উচ্চ কার্যকারিতা, সত্যিকারের যুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্র পাচ্ছে আফ্রিকার ক্রেতারা। এসব কারণে তুরস্কের অস্ত্রের চাহিদা বেড়েছে। এর মধ্যে আরেকটি অদৃশ্য কারণ আছে, সেটি হচ্ছে তুরস্কের কোনো ঔপনিবেশিক ইতিহাস নেই। এতে তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্যে জড়িত হতে সাহস পাচ্ছে আফ্রিকার দেশগুলো।
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডক্টর আলী বাকির আরো জানান, পরিমাণ, দাম, গুণমান বিবেচনা করলে আফ্রিকায় তুরস্কের অস্ত্র রফতানির বিষয়টি পুরোপুরি অভাবনীয়।
অস্ত্র বিশেষজ্ঞ নিকোলাস হেরাস বলেন, আফ্রিকাকে তুরস্কের প্রধান বাণিজ্যক্ষেত্র তৈরিতে গত কয়েক বছরে অনেক পরিশ্রম করেছেন দেশটির কূটনীতিকরা। তারা এখন এটির ফলাফলই পাচ্ছেন। তার মতে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর অস্ত্র তৈরিতে দক্ষতা দেখিয়েছে। এটিও তুরস্কের অস্ত্র শিল্পে বড় অবদান রেখেছে।
তিনি জানান, আফ্রিকায় তুরস্কের অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হলো— আফ্রিকার দেশগুলোর কাছে শর্ত ছাড়াই অস্ত্র বিক্রি করে তুরস্ক। এ ব্যাপারে এ বিশেষজ্ঞ বলেছেন, মানবাধিকারের সুতোয় বেঁধে তুরস্কের অস্ত্র আসে না। আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশগুলো চায়: টেকসই, যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত অস্ত্র। যেগুলো দ্রুত আসে কোনো লাল টেপ (শর্ত) ছাড়া।
এদিকে তার্কিস এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের (টিএআই) কাছে ১০টি আঙ্কা-এস যুদ্ধড্রোন কেনার চুক্তির দ্বারপ্রান্তে আছে উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া। এক বছর আগে আলজেরিয়ার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি ও প্রতিবেশী মরক্কো তুরস্কের অত্যাধুনিক ১৩টি বায়রেকতার টিবি২ ড্রোন কেনার চুক্তি করেছিল।
২০২১ সালে প্রথম দেশ হিসেবে আফ্রিকার নাইজার তুরস্ক থেকে হুকুস টার্বোটপ বিমান বা হালকা যুদ্ধবিমান কেনার অর্ডার করে। এরপর চাঁদ এবং লিবিয়াও একই বিমান কিনতে তুরস্কের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যাশা আফ্রিকার আরো দেশ তাদের বিমান কিনবে।
২০২১ সালে নৌবাহিনীর জন্য তুরস্কের তৈরি ডিয়াসান সমুদ্র জাহাজ কেনে নাইজেরিয়া। এরপর তুরস্কের কাছে ছয়টি টিএআই টি১২৯ হেলিকপ্টারের অর্ডার দেয় তারা।
২০২১ সালের দিকে তুরস্কের বায়রেকতার টিবি-২ ড্রোন কেনে আফ্রিকার আরেক দেশ ইথিওপিয়া। যেগুলো তাইগ্রে যুদ্ধে ব্যবহার করেছে তারা। এছাড়া তুরস্কের সেনাযান কেনার চুক্তি করেছে আফ্রিকার অন্তত ১০টি দেশ।