ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

[ ফিচার ]

যেভাবে মুখোমুখি হলেন রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩:৫৮, ৯ জানুয়ারি ২০২২
যেভাবে মুখোমুখি হলেন রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ
বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ। ছবি : সংগৃহীত

উনিশ শতকের কথা। তখন মানুষ জেগে উঠছে প্রাচীন বিশ্বাসের দীর্ঘদিনের নিদ্রা ছেড়ে। ধর্মীয় তত্ত্ব নিয়ে বাঙালি সমাজে দ্বন্দ্ব বেশ ভালোই ছিল। ঠাকুরবাড়িতে দ্বারকানাথের আমলে এই দ্বন্দ্বের মেঘ জমাট হতে শুরু করল। তবে দেবেন্দ্রনাথের আমলে তা আছড়ে পড়ে বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়ের মত।

রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম আবহাওয়াতেই বড় হয়েছেন। বাবার মতো বড় হওয়ার ইচ্ছেটা রবীন্দ্রনাথের একান্ত ব্যক্তিগত। যৌবনের প্রথম দিকে তিনি পৌত্তলিক ধর্ম সম্পর্কে বেশ উদাসীন ভাব দেখিয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণের দেবচর্চা সম্পর্কে মৌনই ছিলেন প্রায়। ১৮৮৩ সালের ২ মে নন্দনবাগানে ‘আদি ব্রাহ্ম সমাজ’-এর  কাশীশ্বর মিত্রের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ এবং শ্রীরামকৃষ্ণের দেখা হয়েছিল। পিয়ানো বাজিয়ে নিজের লেখা ব্রহ্মসঙ্গীত শুনিয়েছিলেন তরুণ রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রসাহিত্যে খুব সামান্য হলেও শ্রীরামকৃষ্ণ প্রসঙ্গ এসেছে। সে ‘মালঞ্চ’ উপন্যাসে নীরজার ঘরে শ্রীরামকৃষ্ণের আলোকচিত্রের মধ্য দিয়েই হোক অথবা রঘুপতির মাতৃসাধনার মধ্য দিয়েই হোক।

আরো পড়ুন : সেদিন কলেজের শৌচাগারও পরিষ্কার করছিলেন গান্ধিজি

শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ উনিশ শতকের আরেকজন মনীষী। এক সময় তিনিও উত্তর কলকাতার বাসিন্দা ছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ পরস্পরের মধ্যে তেমন কোনো ভাববিনিময় করেননি। সেই সময় উত্তর কলকাতার সিমুলিয়ার দত্তবাড়ি এবং জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মধ্যে কোনো সূত্রেই সংযোগ ছিল না। যদিও একথা ভাবলে অবাক লাগে। বিবেকানন্দ তখন খুব সরল গদ্যে বেশ কিছু লেখা লিখেছিলেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ এবং বিবেকানন্দের সাধনার ধারা পরম ভক্তিতে গ্রহণ করেছিলেন সিস্টার নিবেদিতা। অ্যালবার্ট হলে কালী এবং কালীপুজো সম্পর্কে নিবেদিতার প্রাঞ্জল বক্তৃতায় সেই সময় অনেকেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। এই বিদেশিনীর সঙ্গে কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গভীর সখ্য তৈরি হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ এবং আরো কিছু গল্প অনুবাদ করেছিলেন নিবেদিতা। ঠাকুর পরিবার আর রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের এবং বিবেকানন্দের সহজ সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছিলেন নিবেদিতা।

১৮৯৯ সালের ২৮ জানুয়ারি এক ঐতিহাসিক সন্ধ্যায় চা পানের আসরে মুখোমুখি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ। কিন্তু পরে নিবেদিতাই বলেছিলেন—'..there was some cloud..'

আরো পড়ুন : ভীম ভবানী : বুকে হাতি নেয়া এক শক্তিমান

তবে এই মেঘ রবীন্দ্রনাথ নিবেদিতার বন্ধুত্বকে প্রভাবিত করেনি। রবীন্দ্রনাথ মেয়েদের পড়াবার দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন নিবেদিতাকে। কিন্তু নিবেদিতা রাজি ছিলেন না। ‘ভগিনী নিবেদিতা’ প্রবন্ধে নিবেদিতাকে ‘সতী’ বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ ধর্ম সম্মেলন উনিশ শতকের এক যুগান্তকারী ঘটনা — একথা অস্বীকার করা যায় না। রোমা রোঁলা মনে করেছিলেন এই ঘটনা ছিল ত্রিশ কোটি নরনারীর দুহাজার বছরের আধ্যাত্মিক জীবনের এক চূড়ান্ত সার্থকতা। বাংলা সাহিত্যের দেবচর্চার ইতিবৃত্তে এই ঘটনার বিশেষ রেখাপাত  করেছিল। রবীন্দ্রসাহিত্যও আদৌ সেই প্রভাবমুক্ত ছিল না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে কালীবিরোধী আখ্যা দেওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনে এই কথা আংশিক সত্যি ছিল। ‘বিসর্জন’ নাটকে রঘুপতির ভূমিকায় অভিনয়ের সময় উত্তেজিত হয়ে স্টেজে রাখা কালী মূর্তি প্রায় ছুঁড়েই দিতে যাচ্ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর নিজেকে সামলে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে রবীন্দ্রসাহিত্যে স্বদেশ পর্যায়ের গান ও কবিতায় দেবী কালীর মূর্তি অতি যত্নে একেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

এই উদাসীনতা হয়তো পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের মনের দ্বিধা অথবা আবাল্যের ব্রাহ্ম সংস্কার।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!