ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

[ শিক্ষা ]

নেপালের পথে প্রান্তরে পাঁচদিন 

শোয়াইব আহমেদ, ঢাবি 
প্রকাশিত: ১৩:১৯, ২১ মার্চ ২০২২
নেপালের পথে প্রান্তরে পাঁচদিন 
নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সামনে আমরা।

দিনটি ছিলো বৃহস্পতিবার। ২০২২ সালের ৩ মার্চ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (ডুজা) আয়োজনে নেপালে যাবো আমরা। ওইদিন পাখি জাগার আগেই জেগে উঠে পড়ি আমরা৷ নিজেকে তৈরি করে ব্যাগপত্র গুছিয়ে সবাই একত্রিত হই টিএসসিতে। 

তখন সবে রাতের অন্ধকার কেটে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। সেদিন সবার মধ্যে এক অন্যরকম আবেগ। ঘড়ির কাটা তখন ৭ ছুঁই ছুঁই। আমরা গাড়িতে রওনা হই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে। ৮টার মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই। 

আমাদের বিমান ছাড়বে সকাল ১০টা ১০ মিনিটে। এর আগে এখন আমাদের কাজ হচ্ছে বোর্ডিং পাস ও ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা। আমরা লাইনে দাড়িয়ে যাই বোর্ডিং পাসের জন্য। একে একে বোর্ডিং পাস, ইমিগ্রেশন শেষ করে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা পাড় হয়ে ওয়েটিং রুমে গিয়ে সবাই একত্রিত হই। এরপর শুধু অপেক্ষা বিমানে উঠার। ১০টার দিকে বিমানের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস’র বাস আসলো। বিমানবন্দরের মাঠ দিয়ে চক্কর দিতে দিতে আমরা আমাদের বিমানের কাছে পৌঁছালাম। বিমানে নিজের সিট খুঁজে বসে পড়লাম। বেলা ১১টার সময় একটু দেরি করে যাত্রা শুরু করলো আমাদের বিমান। 

প্রায় ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট যাত্রার পর আমরা নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামলাম। যাত্রার এই সময়টুকু কাটলো হিমালয়ে। নেপালের বড় বড় পাহাড় আর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে দেখে। বিমানবন্দর থেকে ভিসা কাজ সম্পন্ন করে বের হতে হতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা চলে গেলো। আমরা বের হয়ে দেখি বিমানবন্দরে আমাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দাড়িয়ে ছিলো জ্যোৎস্নাতরী নামের একটি এজেন্সি। 

নেপালে আমাদের গাইড করার জন্য ততক্ষণে বিমানবন্দরে দাড়িয়ে আছে বিকাশ সনী নামের নেপালি এক যুবক। পুরো ট্যুরে আমাদের ১৭ সদস্যের এই দলকে গাইড করবেন তিনি। 

বিমানবন্দরে আমাদের লাল উত্তরীয় পরিয়ে দিয়ে ‘নেপালি অভ্যর্থনা’ জানালো বিকাশ সনী। পরে আমরা একটি গ্রুপ ছবি নিয়ে আমাদের নির্ধারিত বাসে উঠে পড়লাম। গান গাইতে গাইতে নেপালের রাজধানীর পথ ধরে চলতে থাকলাম। কাঠমুন্ডুর থামেলের ‘আল-মদিনা’ হোটেলে আমরা দুপুরের খাবার সেড়ে নিলাম। এরপর আমাদের যাত্রা নাগরকোট। কাঠমুন্ডু থেকে ৩২ কি.মি. পূর্বে নাগরকোটের অবস্থান। ভক্তপুরের সবচেয়ে নৈসর্গিক স্থান এটি। যেখান থেকে হিমালয়ের জমকালো সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। 

নাগরকোটে আমরা গিয়ে পৌঁছালাম সন্ধ্যা নামার একটু আগে। সূর্য তখনো লাল বর্ণ থেকে আসতে আসতে মিশিয়ে যাচ্ছে। আমরা বাস থেকে নামলাম একটি পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি। বাসের ভেতর থেকে শৈত্যপ্রবাহ তেমন বুঝে উঠতে পারিনি। তাই শীতের পোশাক না পরেই বাস থেকে নেমে যাই। কিন্তু শীতল বাতাস এতটা কাবু করে ফেলছিলো যে আমাদের হাত পা নাড়ানোর শক্তি পাচ্ছিলাম না। পরে সবাই আবার বাসে উঠে নিজেদের মোটা পোশাক গায়ে জড়িয়ে বের হই। সেখানে সবাই ছবি তুললাম, উপভোগ করলাম প্রকৃতির অপরূপ রঙ। পরে সময় হলো হোটেলে যাওয়ার। 

পাহাড়ের উপরই এক নৈসর্গিক হোটেলে রাত্রিযাপন করি আমরা। সেখান থেকে সকালে এক অদ্ভুত সুন্দর সূর্যোদয় ও সকাল উপভোগ করে আমরা বের হলাম আরেক সুন্দরতম জায়গা চন্দ্রগিরির উদ্দেশে। 

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আমরা চন্দ্রগিরি পৌঁছালাম। সেখানে এক পাহাড় থেকে অপর পাহাড় পর্যন্ত চলে ক্যাবল কার। আমরা সেটিতে চড়ে পৌঁছালাম অন্য পাহাড়ে। সেখানে আধঘণ্টা উপভোগ করলাম হিমালয়ের দৃশ্য। সেই পাহাড়ের উপরে একটি মন্দিরও পরিদর্শন করলাম। এরপর ১টার দিকে আমরা ক্যাবল কারে চড়ে আবার পূর্বের জায়গায় চলে আসি। এরপর আমাদের যাত্রা শুরু হয় পোখরার দিকে। 

পোখরা নেপালের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ শহর যা নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে ২০০ কি.মি. পশ্চিমে অবস্থিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর পোখরা শহরকে ‘নেপালের ভূস্বর্গ’ ও ‘নেপাল রানী’ বলা হয়। 

পোখরা থেকে বিশ্বের দীর্ঘতম (১৪০ কিলোমিটার) সারিবদ্ধ হিমালয় পাহাড়ের সারি দেখি। পোখরাকে ‘মাউন্টেন ভিউ’র শহরও বলা হয়। এখান থেকে ‘অন্নপূর্ণা’ ও মাছের লেজের মতো দেখতে মচ্ছ পুছরে (৬, ৯৭৭ মিটার) পর্বতশৃঙ্গ দেখি, যা বিশ্বখ্যাত চারটি পর্বতশৃঙ্গের একটি। এই পোখরাতে আমরা দর্শন করি নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক লেক– ফেওয়া লেক। এরপর দেখি ছোট একটি ঝর্ণা ডেভিস ফল। যেটি পোখারার অন্যতম আকর্ষণ। ডেভিস ফলস-এর বিপরীতে রয়েছে চুনা পাথরের মহেন্দ্র গুহা। 

এসব দেখে সকাল সাড়ে ৯টায় যাই প্যারাগ্লাইডিং করার জন্য। প্যারাসুটে করে উপর থেকে পোখরার সৌন্দর্য দেখার এক অসাধারণ অ্যাডভেঞ্চার নেই আমরা। প্রায় ২০ মিনিট করে প্যারাগ্লাইডিং করি আমরা। এরপর আমরা নিজেদের মতো করে ঘুরে দেখি পোখরা শহর। পরের দিন (শেষের দিন) সকালে আমরা রওনা হই কাঠমুন্ডুর থামেল শহরের উদ্দেশে। 

সেদিন ৬ মার্চ সকালে আমাদের বাস পোখরা ছাড়ে। সারাদিন যাত্রার পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমরা কাঠমুন্ডুতে আমাদের হোটেল ‘দম হিমালয়া’য় পৌঁছাই। পরে রাতে হালকা কেনাকাটা করে পরের দিন দেশে ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে ঘুমাতে যাই। পরের দিন আমাদের বিমান ১২টা ১০ মিনিটে। আমরা হোটেল থেকে সকালের নাস্তা সেরে ৯টার মধ্যে বেরিয়ে যাই বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে। বিমান একটু বিলম্বে ছেড়ে ২টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। 

এভাবেই শেষ হয় আমাদের পাঁচ দিনের ছোট্ট সফর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি প্রতিবছর সদস্যদের নিয়ে শিক্ষা সফরের আয়োজন করে। নিজেদের গণ্ডি পেরিয়ে পৃথিবীকে দেখার তাড়না থেকে দেশের বাইরে ট্যুরের আয়োজন করার চেষ্টা করে। যদিও সেটি প্রতিবছর সম্ভব হয় না।

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেডএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!