জাহাঙ্গীরনগরে বেড়েছে দর্শনার্থীর উৎপাত, কমেছে অতিথি পাখি
প্রতি বছর শীত মৌসুমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) উড়ে আসে নানা প্রজাতির শত শত অতিথি পাখি। ছোট-বড় লেকে লাল শাপলার ফাঁকে অতিথি পাখির নয়ন জুড়ানো খুনসুটি দেখতে ক্যাম্পাসে ভিড় করেন দর্শনার্থীরা।
তবে এ ভিড়ই এখন কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে অতিথি পাখির জন্য। দর্শনার্থীর উৎপাতে প্রতি বছর ক্রমেই অতিথি পাখির সংখ্যা কমছে জাবিতে। এছাড়া বসবাসের স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট হওয়াও পাখির সংখ্যা কমার অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন পাখি বিশেষজ্ঞরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত তিন যুগের ধারাবাহিকতায় এবারও শীতের শুরুতেই জাবি ক্যাম্পাসে অতিথি পাখি আসা শুরু করে। গেল সেপ্টেম্বরের শেষদিকে ক্যাম্পাসে অতিথি পাখি আসতে শুরু করে। এরপর শীত বেড়েছে, কিন্তু দর্শনার্থীর উৎপাত ও উপযোগী আবাসস্থলের অভাবে পাখির সংখ্যা আশানুরূপ বাড়েনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, সাধারণত সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে আসতে শুরু করে পরিযায়ী পাখির দল। শীত যত বাড়ে পাখির সংখ্যাও বাড়তে থাকে। কিন্তু এ বছর ঘটেছে উল্টোটা। শুরুতে পাখিরা দল বেঁধে এলেও পরে তাদের দেখা মিলেছে কম। এ বছর সুইমিং পুল এলাকার জলাশয় এবং ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারের জলাশয়ে প্রথম পাখিদের দেখা মেলে। এরপর পরিবহন চত্বরসংলগ্ন জলাশয় এবং নতুন রেজিস্ট্রার ভবনের পেছনের জলাশয়ে পাখির দল স্থান করে নিলেও বর্তমানে এ দুটি জলাশয়ে পাখির সংখ্যা হাতেগোনা।
পাখি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ দুটি জলাশয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল সড়কের পাশে হওয়ায় দর্শনার্থীদের উৎপাত এখানে বেশি। তারা পাখি দেখতে গিয়ে জলাশয়ে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল ফেলেন। ফলে পাখির বসবাসের স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে। এছাড়া পাখিদের কাছাকাছি গিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা, সড়কে মোটরচালিত গাড়ির হর্ন এবং অতিরিক্ত কোলাহল পাখিদের বিরক্ত করে। সব মিলিয়েই পাখিরা স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন রেজিস্ট্রার ভবনের পেছনের জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি না থাকা এবং সুইমিং পুলসংলগ্ন জলাশয় সংস্কার না করাও পাখির সংখ্যা কমার কারণ বলে জানিয়েছেন পাখি বিশেষজ্ঞরা। সুইমিং পুল সংলগ্ন জলাশয়ে দর্শনার্থীরা পাখির দিকে ঢিল ছুঁড়ে বলেও জানা গেছে।
পাখি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দর্শনার্থীদের ভিড় ও কোলাহলের কারণে দুটি লেকে পাখি নেই বললেই চলে। এর বাইরে সুইমিং পুলসংলগ্ন জলাশয়ের কচুরিপানা সময়মতো পরিষ্কার করা হয়নি। পাখির জন্য জলাশয়ে স্বচ্ছ পানিরও প্রয়োজন আছে। কচুরিপানাভর্তি জলাশয়ে পাখিরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। যে কারণে পাখিরা অন্য জলাশয়ে চলে যাওয়ার পাশাপাশি ক্যাম্পাস ছেড়েও চলে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান বলেন, ‘পাখির সংখ্যা এবার তুলনামূলক কম। গেল বছর ক্যাম্পাসে বিপন্নসহ ১২ প্রজাতির সাত হাজারের বেশি পাখি এসেছিল। যা বিগত তিন দশকে সর্বোচ্চ। করোনার কারণে উৎপাত কম থাকায় সেবার অতিথি পাখি বেশি এসেছিল। কিন্তু এ বছর ক্যাম্পাসে দুটি প্রজাতির প্রায় চার হাজারের মতো পাখি এসেছে।’ অবশ্য আগামীতে পাখির সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেছেন এই পাখি বিশেষজ্ঞ।
১৯৮৬ সালে সর্বপ্রথম জাবিতে অতিথি পাখি আসে। এখন পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ১৯৫ প্রজাতির পাখি দেখা গেছে। এর মধ্যে পরিযায়ী পাখি ৬৯ প্রজাতির। বাকি সব দেশীয়।