ঢাকা,  শুক্রবার   ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

দু’টি মহান নেয়ামত এবং তার প্রতি উদাসীনতা (পর্ব-১)

মাওলানা ওমর ফারুক
প্রকাশিত: ২০:০২, ১ আগস্ট ২০১৯
দু’টি মহান নেয়ামত এবং তার প্রতি উদাসীনতা (পর্ব-১)
ফাইল ফটো

প্রসিদ্ধ হাদিস যা হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত দু’টি নেয়ামত এমন যে, অনেক লোক এ বিষয়ে ধোকায় পড়ে আছে। তন্মধ্যে একটি নেয়ামত সুস্থতা এবং সুস্বাস্থ্য আর দ্বিতীয় নেয়ামতটি হলো অবসর সময় এবং সুযোগ।’

এ দু’টি নেয়ামত এমন যে, যতক্ষণ এই নেয়ামত অর্জিত থাকে, ওই সময় পর্যন্ত মানুষ এই ধোকায় পড়ে থাকে যে, এই নেয়ামত সর্বদা বাকি থাকবে। যেমন যতক্ষণ সুস্থতার ভেতর থাকে তখন এ খেয়ালও আসে না যে, কখনো অসুস্থতাও এসে পড়তে পারে। কিংবা অবসর সময় চলছে, তখন এ ধারণাও হয় না যে, কখনো কর্মব্যস্ততাও এসে যেতে পারে।

আরো পড়ুন>>> দোয়ার বহুবিধ ফায়দা

Advertisement

এজন্য আল্লাহ তায়ালা যখন সুস্থতা দান করেন অথবা অবসর দান করেন, তখন সে ধোকায় নিজের সময় অতিবাহিত করতে থাকে এবং ভালো কাজসমূহকে স্থানচ্যুত করতে থাকে এবং চিন্তা করতে থাকে যে, এখনো তো বহু সময় বাকি আছে। আর এর ফল এই দাঁড়াই যে, নিজের পরিশুদ্ধি থেকে সে বিরত থাকে। সরওয়ারে কায়েনাত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এই নেয়ামতের এ সময় মর্যাদা চিনে নাও, যখন তা অর্জিত হয়।

সুস্থতার কদর কর:
সুস্থতার নেয়ামত যার অর্জিত আছে। জানা নেই কবে পর্যন্ত এটি থাকবে। কেননা জানা নেই যে, কখন অসুস্থতা এসে যায়, কীভাবে অসুস্থতা এসে যায়! তাই সওয়াব এবং উত্তম কাজ করে নাও, নিজের সংশোধনের কাজ কর। আল্লাহ তায়ালার দিকে প্রত্যাবর্তনের কাজ, পরকালের চিন্তা ওই সময়ের মাঝেই গ্রহণ কর।

আরে! যখন অসুস্থতা আসে, তাতো প্রথমে নোটিশ দিয়ে আসে না। (আল্লাহ তায়ালা বাঁচান) ভাল সুস্থ সবল মানুষ; কিন্তু বসে  বসে প্যারালাইসেস আক্রান্ত হয়ে গেল, এখন চলাফেরার শক্তিও নেই। এজন্য চলমান সময় বাহানা করে অতিক্রম কর না; বরং যে নেক কাজ করার তা করে নাও, এই সুযোগ আল্লাহ তায়ালা এজন্য দান করেছেন যে, তাকে পরকালের জন্য ব্যবহার কর, যা মৃত্যুর পর অত্যাসন্ন; কিন্তু যদি তুমি তাকে কাটিয়ে দাও এবং অসুস্থতা আসে, তাহলে জীবনভর মাথা ধরে কাঁদবে এবং আফসোস অনুতাপে লিপ্ত হয়ে যাবে। হায়! এই সুস্থতার সময় কিছু করতে পারিনি। কিন্তু তখন অনুতাপ আক্ষেপ করার দ্বারা কোনো কিছুই লাভ হবে না। এজন্য ওই নেয়ামতসমূহের কদর কর।

শুধু একটি হাদিসের ওপর আমল কর:
এই হাদিস যা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন তা ‘জাওয়ামিউল কালিম’ এর অন্তর্ভুক্ত এবং সম্ভবত ইমাম আবু দাউদ (রহ.)  এর কথা, কিছু হাদিস এমন আছে, যদি মানুষ শুধু এই কয়েকটি হাদিসের ওপর আমল করে, তাহলে তার পরকালের নাজাতের জন্য যথেষ্ট হবে। এর মাঝে একটি হাদিস এটিও। ইমাম বুখারী (রহ.) তার সহীহ বুখারীতে ‘কিতাবুর রিকাক’-কে এই হাদিস দ্বারা শুরু করেছেন। এজন্য এ হাদিসের মাধ্যমে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে প্রথম থেকেই সতর্ক করে আসছিলেন। পরে তো সতর্ক নিজেই হয়ে যাবে। কিন্তু ওই সতর্কতা ওই সময় হয় যখন ক্ষতিপূরণের কোন পথই বাকী থাকে না।

এজন্য রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনি আমাদের প্রতি মাতা-পিতার চাইতেও অধিক দয়া পরবশ। আমাদের নিশ্বাস এবং রগরেশা সম্পর্কে অবহিত। তিনি বলেছেন যে, দেখ, ওই সময় যখন তোমরা সুস্থতা এবং অবসর এর সুযোগ সহজে পাও, পরে থাকুক বা না থাকুক। তার পূর্বেই যে, আক্ষেপের সময় এসে যাবে তাকে কাজে লাগিয়ে নাও।

এখন তো যুবক; এটি নিরেট একটি শয়তানি:
এই নফস মানুষকে ধোকা দিচ্ছে যে, মিয়া সাহেব! এখন তো মাত্র যুবক, এখনো অনেক সময় বাকি পড়ে আছে। আমরা দুনিয়াতে দেখলামই বা কী? এখন কিছু আনন্দ-ফূর্তি কর। পরে সময় এসে গেলে তখন সে সময় আল্লাহ তায়ালার দিকে প্রত্যাবর্তন করে নেব এবং ওই সময় সংশোধনের চিন্তা করে নেব, এখন ওসব রাখ।

রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নফস ও শয়তানের এ ধোকায় পড়বে না, যা করার করে ফেল। কেননা এই সময় যা আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন এটি বড়ই মূল্যবান বস্তু; এটা বড়ই দৌলত। জীবনের এই সময়গুলো যা এখন মানুষেরা সহজে পাচ্ছে, তার প্রতিটি মূহূর্ত বড়ই মূল্যবান। তাকে ধ্বংস এবং বিনষ্ট করবে না; বরং তাকে পরকালের জন্য ব্যবহার কর।

আমি কী তোমাকে এত বয়স দেইনি?
কোরআনুল কারিম ঘোষণা করছে, যখন মানুষ পরকালে আল্লাহ তায়ালার দরবারে পৌঁছবে, তখন আল্লাহ তায়ালাকে বলবে যে, আমাকে আবারো দুনিয়াতে পাঠিয়ে দিন, আমি নেক আমল করব। তখন আল্লাহ তায়ালা জবাবে বলবেন: ‘আমি কী তোমাকে এত বয়স দেইনি যে, যদি তাতে কোনো ব্যক্তি উপদেশ গ্রহণ করতে চাইত তাহলে উপদেশ গ্রহণ করে নিতে পারত। এটাই নয় যে, শুধু বয়স দিয়ে তোমাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে বরং তোমার কাছে ভয় প্রদর্শনকারী সাবধানকারী পাঠিয়েছি। এক লক্ষ চব্বিশ হাজার আম্বিয়া (আ.)-গণকে পাঠিয়েছি এবং শেষে সরওয়ারে দু’আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠিয়েছি এবং রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খলীফা এবং উত্তরাধিকারীগণ তোমাদেরকে ধারাবাহিকভাবে জাগ্রত করতে আসছেন এবং তোমাদের গাফলতি থেকে সচেতন করে আসছেন তারা বলেছেন যে, আল্লাহ জন্য এ সময়টাকে কাজে লাগাও।

ভীতি প্রদর্শনকারী কারা?
ভীতি প্রদর্শনকারী এর ব্যাখ্যায় মুফাসসীরিনগণ বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। কিছু সংখ্যক মুফাসসির বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নবী আলাইহিস সালামগণ এবং তাদের উত্তরাধিকারীগণ। যারা মানুষকে ওয়াজ নসীহত করেন। আর কিছু তাফসীরকারক বলেন যে, এর দ্বারা সাদাচুল উদ্দেশ্য; অর্থাৎ যখন সাদাচুল এসে গেল তখন বুঝে নাও যে, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শনকারী এসে গেছেন। এখন সময় ফুরিয়ে এসেছে, প্রস্তুত হয়ে যাও এবং এখনই স্বীয় বিগত জীবনের গুনাহ থেকে তাওবাকারী হও এবং নিজের অবস্থার সংশোধন করে নাও। কেননা এখন তো তোমার চুল সাদা হয়ে গেছে। কিছু সংখ্যক তাফসীরকার এর ব্যাখ্যা নাতি-পুতি দ্বারা করেছেন। অর্থাৎ যখন কারো নাতি-পুতি জন্ম হয়ে যায় এবং সে দাদা হয়ে যায়, তখন সে নাতি-পুতি ভীতি প্রদর্শনকারী ওই কথার যে, বড় মিয়া! তোমার সময় ফুরিয়ে এসেছে এখন আমাদের জন্য স্থান খালি করে দাও।

মৃত্যুদূতের সঙ্গে কথোপকথন:
মুফতী মুহাম্মদ শফী সাহেব (রহ.) থেকে একটি ঘটনা বলেছেন। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির মালাকুল মওত তথা মৃত্যুদূত ফেরেশতার সঙ্গে সাক্ষাত হয়ে গেল। তিনি মৃত্যুদূতের কাছে অভিযোগ করলেন যে, আপনার আদালতের একী বিস্ময়কর ব্যবস্থা! দুনিয়াতে কাউকে ধরে গ্রেফতার করলে দুনিয়ার আদালতের নিয়ম হলো এই যে, সর্বপ্রথম তার কাছে নোটিশ পাঠানো হয় যে, তোমার বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয়েছে। তুমি তার উত্তর দিতে প্রস্তুতি গ্রহণ কর। কিন্তু আপনার ব্যবস্থাটা বড়ই বিস্ময়কর। যখনই চান, নোটিশ ছাড়াই গিয়ে গ্রেফতার করে নিয়ে আসেন। বসতে বসতে পৌঁছে যান এবং প্রাণ কবজ করে নেন। এটি কেমন ব্যবস্থা?

মৃত্যুদূত জবাব দিলেন, মিয়া সাহেব! আমি তো এত নোটিশ পাঠাই যে, দুনিয়াতে কেউ এত নোটিশ পাঠান না। কিন্তু আমি কী করব? তোমরা আমার নোটিশকে নোটিশই মনে করছ না, তার পরোয়াই করছ না। আরে যখন তোমাদের জ্বর আসে এটি আমার নোটিশ হয়, যখন তোমাদের  কোনো রোগ হয়, এটি আমারই নোটিশ। যখন তোমাদের সাদাচুল এসে যায়, এটিও আমার নোটিশ, তোমাদের যখন পুতা-নাতির জন্ম হয় তখন এটি ও আমার নোটিশ। আমি তো এত নোটিশ পাঠাই যার কোনো সীমা ও পরিসংখ্যান নেই। কিন্তু তোমরা তা কানেই নেও না। যা হোক, এজন্য রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, ওই সময়ের আফসোস আসার আগেই আল্লাহর জন্য নিজেকে নিজে প্রস্তুত কর এবং ওই সুস্থতার সময়কে এবং ওই অবসর সময়কে কাজে লাগাও। আল্লাহই জানেন আগামীকাল কী অবস্থা তোমার প্রত্যাসন্ন!

যা করার এখনই করে নাও-

দুই রাকাতের আক্ষেপ হবে:
বর্ণিত আছে একবার হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.) সফরে তাশরীফ নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে একটি কবর দেখে সেখানে সওয়ারী থেকে নেমে পড়লেন এবং নেমে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়লেন এবং পরে সওয়ারীতে আরোহী হয়ে এগিয়ে চললেন। সঙ্গে যারা ছিলেন তারা বুঝলেন যে, হয়তো কোনো বিশেষ ব্যক্তির কবর হবে এজন্য এখানে নেমে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিলেন। তাই তারা জিজ্ঞেস করলেন যে, হজরত! ব্যাপার কী? আপনি এখানে অবতরণ করলেন কেন? তিনি জবাব দিলেন যে, মূলকথা হলো এই যে, যখন আমি এ স্থান অতিক্রম করছিলাম তখন আমার অন্তরে এ ধারণা আসল যে, যে ব্যক্তিগণ কবরে চলে গেছেন তাদের আমল বন্ধ হয়ে গেছে। যেমন হাদিস শরিফে আছে যে, ওই লোকেরা কবরের মাঝে এ কথার আক্ষেপ করে যে, আবার যদি এতটুকু সুযোগ পেতাম যে, আমি দুই রাকাত নামাজ পড়ব তাহলে আমার নেকির মাঝে, আমার আমলের মাঝে দুই রাকাত নফলের সওয়াব বেড়ে যাবে, যুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু এই আক্ষেপ সত্তেও তাদের জন্য নফল পড়ার সুযোগ নেই। আমার খেয়াল এলো, আল্লাহ তায়ালা তো আমাকে এই সুযোগ দিয়ে রেখেছেন। এজন্য চলো, এক্ষুণি দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিই। এজন্য আমি অবতরণ করে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিলাম। তাই আল্লাহ তায়ালা যাদেরকে এই চিন্তা-ফিকির দান করেছেন, তারা তাদের একেকটি মূহুর্তকে এভাবে কাজে লাগাতে পারেন।

নেকি দ্বারা আমলের পাল্লা ভারি কর:
এ সময়ের প্রতিটি মিনিট বড়ই মূল্যবান। এজন্য বলা হয়েছে যে, মৃত্যুর কামনা করবে না। কেননা জানা আছে কী যে, মৃত্যুর পর কী পরিণতি হবে?

যা কিছু সুযোগ আর অবসর আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দান করেছেন, এতেই সবকিছু পূর্ণ হওয়া চাই। আগে গিয়ে কিছুই হবে না। এজন্য এ দুনিয়াতে যে সময়টুকু আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন, তাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করবে। তাকে কাজে লাগাও। যেমন একটি মিনিটে যদি একবার ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে দাও। হাদিস শরিফে এসেছে যে, একবার ‘সুবহানাল্লাহ’ পড়ার দ্বারা আমলের আধা পাল্লা ভরে যায়। আর একবার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে নিন। তাহলে আমলের পুরা পাল্লাই ভরপুর হয়ে যাবে। দেখুন! এই মিনিটগুলো কতই না দামি মূল্যবান হয়েছে। কিন্তু তোমরা তা হিসাব আর গণনা করেই শেষ করবে। আল্লাহর জন্য তাকে এই কাজের মাঝে ব্যবহার করে নাও। (কানযুল, হাদিস নম্বর ২০১৮)। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!